প্রকাশ: ১০ নভেম্বর সোমবার । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দক্ষিণ এশিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর দেশ পাকিস্তান কি আবারও সেনাশাসনের দিকে ধাবিত হচ্ছে—এই প্রশ্ন উঠেছে সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীকে ঘিরে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে পাকিস্তানে সেনাপ্রধানকে দেওয়া হচ্ছে অতিরিক্ত ক্ষমতা, যা দেশটির গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগের সঙ্কেত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি এটি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ আরও শক্তিশালী হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যকারিতা হারাতে পারে।
বর্তমানে পাকিস্তানে সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির। প্রতিরক্ষা বিষয় ছাড়াও বিদেশ নীতিতেও তার বিস্তর প্রভাব রয়েছে। হোয়াইট হাউসে পাক সেনাপ্রধান ও মার্কিন প্রেসিডেন্টের একান্ত বৈঠক এই প্রভাবের নিদর্শন। সংবিধানের ২৭তম সংশোধনীর মাধ্যমে এই ক্ষমতা আরও বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে, নতুন সৃষ্ট পদে তিন বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব আসিম মুনিরের হাতে থাকছে এবং তাকে আজীবন দায়মুক্তি দেয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রতিরক্ষা প্রধানের এই ক্ষমতার ফলে পাকিস্তানের ভঙ্গুর গণতন্ত্র থেকে পূর্ণ সামরিক শাসনের দিকে ঝুঁকির সৃষ্টি হতে পারে। সেনাশক্তির প্রভাব বৃদ্ধি পেলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কার্যত অচল হয়ে যেতে পারে। পাকিস্তানের সাবেক প্রতিরক্ষা সচিব লেফটেন্যান্ট জেনারেল আসিফ ইয়াসিন মালিক (অব.) বলেন, “বিমান ও নৌবাহিনীর ওপরও কর্তৃত্বপ্রাপ্ত একজন সেনা কর্মকর্তাকে প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবে নিয়োগ করা প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্যহীনতা এবং সম্ভাব্য বিপর্যয় ছাড়া কিছু নয়। এটি প্রতিরক্ষা কাঠামো শক্তিশালী করার পরিবর্তে নির্দিষ্ট ব্যক্তির জন্য সুবিধা সৃষ্টি করছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে জয়েন্ট চিফদের এমন অতিরিক্ত ক্ষমতা নেই। সেখানে সেনাদের কার্যক্রম বেসামরিক কর্তৃপক্ষের অধীনে সীমিত। পাকিস্তানের এই সংশোধনী দেশের সংবিধান ও বেসামরিক কর্তৃত্বের নীতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
এই সংশোধনী শুধুমাত্র সেনাপ্রভাবকে বৈধতাই দিচ্ছে না, বরং এটি পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাশাসনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্ত করছে। ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রেই সেনাবাহিনী নাক গলাতে পারবে, এমন শঙ্কা রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ নতুন নয়। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকেই দেশের রাজনীতি সেনা ছায়ায় আচ্ছন্ন। আইয়ুব খান থেকে জিয়াউল হক ও পারভেজ মুশারফের মতো সেনা কর্মকর্তারা কখনো প্রত্যক্ষভাবে, কখনো পরোক্ষভাবে ক্ষমতায় ছিলেন। ইতিহাস দেখায়, সামরিক হস্তক্ষেপ পাকিস্তানে রাজনৈতিক অচলাবস্থা এবং গণতন্ত্রহীন পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ক্ষমতা বৃদ্ধিকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখার বাইরে, এটি দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের সেনাপ্রভাব বৃদ্ধি পেলে দেশটির নীতি নির্ধারণ ও কূটনৈতিক সম্পর্কগুলিতেও সামরিক দিকের প্রাধান্য বৃদ্ধি পাবে। ফলে কার্যত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সীমিত হবে এবং গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।
এই পরিস্থিতি পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ। রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম সীমিত হতে পারে, বেসামরিক নীতি গ্রহণে সেনাবাহিনী সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারে। ফলে গণতন্ত্রের মূল কাঠামো, যেটি সংবিধান দ্বারা রক্ষিত, তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেছেন, এমন সংবিধান সংশোধনী দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে রাজনৈতিক অসন্তোষ তৈরি করতে পারে।
অতীতে পাকিস্তান সেনাশাসনের কারণে রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অচলাবস্থার মুখোমুখি হয়েছে। তাই এই ২৭তম সংশোধনী শুধু সেনাশক্তিকে বৈধতা দিচ্ছে না, বরং দেশের রাজনৈতিক কাঠামোকে পুনর্গঠনের দিকেও প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করবে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।
সারসংক্ষেপে, সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী পাকিস্তানের গণতন্ত্রের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি, আজীবন দায়মুক্তি, তিন বাহিনীর সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব—এগুলো দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করবে। পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপের ইতিহাসের আলোকে এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সামরিক প্রভাবকে বৈধতা দিয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার আশঙ্কা তৈরি করছে।