বিহারে আবারও বাজিমাত করতে যাচ্ছে নীতিশ-বিজেপি জোট

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৪ বার
বিহারে আবারও বাজিমাত করতে যাচ্ছে নীতিশ-বিজেপি জোট

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারতের রাজনীতি আবারও উত্তাল বিহারকে ঘিরে। নির্বাচনী উত্তেজনার এই আবহে বুথফেরত জরিপে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলছে—বিহারে আবারও গেরুয়া শিবিরের জয়গান শোনা যেতে পারে। নীতীশ কুমারের জনতা দল ইউনাইটেড (জেডিইউ) এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোট এগিয়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া। ফলাফল এখনও ঘোষিত না হলেও, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সব দিক বিবেচনায় এই জোটই সম্ভবত আবারও বিহারের ক্ষমতার চাবিকাঠি হাতে পেতে যাচ্ছে।

বিহারের ২৪৩ আসনের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ১২২টি আসন। প্রাথমিক জরিপের তথ্য অনুযায়ী, এনডিএর অন্তর্ভুক্ত পাঁচটি দল—জেডিইউ, বিজেপি, লোক জনশক্তি পার্টি (রামবিলাস), হিন্দুস্তানি আওয়াম মোর্চা এবং রাষ্ট্রীয় লোক মোর্চা—একসঙ্গে সহজেই এই সংখ্যা অতিক্রম করতে পারে। বিগত দুই বছর ধরে বিহারের রাজনৈতিক মাঠে একাধিক মোড় ঘোরানো ঘটনা ঘটেছে, তবে শেষ পর্যন্ত নীতীশ কুমারের অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং বিজেপির সাংগঠনিক শক্তি মিলেই পরিস্থিতি তাদের অনুকূলে ফিরিয়ে এনেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

এবারের নির্বাচনকে অনেকেই বিহারের ইতিহাসে একটি ‘রেকর্ড-ব্রেকিং ভোটযুদ্ধ’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। ৭ দশকের মধ্যে এবারই সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে—প্রায় ৬৭ শতাংশ। ১৯৫১ সালের পর এই রাজ্যে এত বেশি ভোটার একসঙ্গে ভোট দিয়েছেন, যা নির্বাচনী বিশ্লেষকদের জন্যও বিস্ময়ের বিষয়। বিশেষ করে নারী ভোটারদের অংশগ্রহণ এবার নজিরবিহীন ছিল। দুই দফা ভোটে নারীদের উপস্থিতি পুরুষদের চেয়েও বেশি দেখা গেছে। অন্যদিকে পুরুষ ভোটারদের হার ছিল ৬২ দশমিক ৮ শতাংশ।

বিহারে মোট ভোটার সংখ্যা সাড়ে সাত কোটিরও বেশি, যার মধ্যে তরুণ ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ। এই তরুণ প্রজন্মকেই এবার নির্বাচনের ভাগ্যনির্ধারক হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নীতীশ কুমারের উন্নয়নমুখী প্রচার এবং বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ক্যাম্পেইন এই তরুণদের আকৃষ্ট করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। মোদি সরকারের সাম্প্রতিক সময়ে গরিবদের জন্য বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মসূচি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং নারী স্বনির্ভরতা প্রকল্পগুলো বিহারের ভোটারদের মধ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলোর জোট, বিশেষ করে তেজস্বী যাদবের নেতৃত্বাধীন আরজেডি এবং কংগ্রেসের জোট রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুললেও তাদের প্রচারণায় স্পষ্ট কৌশলগত দুর্বলতা ছিল। স্থানীয় ইস্যুর চেয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনাতেই বেশি মনোযোগ দেওয়ায় ভোটারদের একাংশের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে এনডিএর উন্নয়ন বার্তা বেশি প্রভাব ফেলেছে বলে ধারণা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

বিহারের রাজনীতিতে নীতীশ কুমার দীর্ঘদিন ধরেই একজন কৌশলী খেলোয়াড় হিসেবে পরিচিত। একসময় বিজেপির সঙ্গে জোট ভেঙে কংগ্রেস ও আরজেডির সঙ্গে হাত মিলিয়েছিলেন, আবার পরে বিজেপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হয়েছেন। এই রাজনৈতিক দোলাচল সত্ত্বেও তার জনপ্রিয়তা খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বরং অনেক ভোটারই তাকে স্থিতিশীলতার প্রতীক হিসেবে দেখেন। এবারও সেই ভাবমূর্তিই তার পক্ষে কাজ করছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বুথফেরত জরিপের পর রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচনা—নীতীশ কুমার কি আবার মুখ্যমন্ত্রী হবেন, নাকি বিজেপি নিজস্ব প্রার্থীকে সামনে আনবে? বিজেপির রাজ্য নেতৃত্ব এখনই কোনো মন্তব্য করতে রাজি নয়, তবে দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, মুখ্যমন্ত্রী পদ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে ফলাফল ঘোষণার পর এনডিএর অভ্যন্তরীণ বৈঠকে।

রাজ্যের সাধারণ মানুষও ফলাফলের অপেক্ষায়। পাটনা, গয়া, ভাগলপুরসহ বিভিন্ন শহরের চায়ের দোকান থেকে শুরু করে বাজার-হাটে একটাই আলোচ্য বিষয়—নীতীশ ফিরবেন কি না। স্থানীয়রা বলছেন, বিহারের রাজনীতিতে উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নীতীশ সরকার কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে পেরেছে, বিশেষ করে সড়ক ও শিক্ষা খাতে। তবে বেকারত্বের হার ও শিল্পায়নের ধীরগতি নিয়ে ক্ষোভও রয়েছে তরুণ ভোটারদের মধ্যে।

বিহারের রাজনৈতিক ইতিহাসে জোট সরকার কোনো নতুন ঘটনা নয়। স্বাধীনতার পর থেকে রাজ্যে কখনোই দীর্ঘস্থায়ী একক দলীয় শাসন দেখা যায়নি। নীতীশ কুমারের জেডিইউ এবং বিজেপির এই দীর্ঘমেয়াদি জোটকেও অনেকেই ‘বাস্তববাদী রাজনীতির ফসল’ বলে উল্লেখ করছেন। কারণ, দুই দলের রাজনৈতিক দর্শন ভিন্ন হলেও ক্ষমতায় টিকে থাকা এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখার স্বার্থে তারা একত্রে কাজ করছে।

নির্বাচনের আগে থেকেই বিজেপি ও জেডিইউর নেতারা একে অপরের প্রতি আস্থা রেখে প্রচারণায় ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেও একাধিক জনসভায় অংশ নিয়ে বিহারবাসীর উদ্দেশে বার্তা দেন—“বিহারকে উন্নয়নের পথে নিয়ে যেতে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সমন্বয় অপরিহার্য।” এই বার্তাটি ভোটারদের কাছে যথেষ্ট কার্যকর প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

যদিও চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আগে কিছুই নিশ্চিত নয়, তবুও সব দিক থেকে এনডিএর জয়ের সম্ভাবনা প্রবল। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার যদি নীতীশ-বিজেপি জোট আবারও ক্ষমতায় আসে, তাহলে সেটি হবে বিহারের রাজনীতিতে ‘স্থিতিশীল জোট রাজনীতির’ নতুন অধ্যায়।

এদিকে বিরোধীরা অবশ্য এখনও আশা ছাড়ছে না। তারা বলছে, বুথফেরত জরিপ সবসময় সঠিক চিত্র তুলে ধরে না। প্রকৃত ফলাফল ঘোষণার সময় পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। তবে জনগণের ভোটের মুড, ভোটের হার ও মাঠ পর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়—নীতীশ ও বিজেপির জোটই আপাতত বিহারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে মুখ্য ভূমিকা রাখতে চলেছে।

সবশেষে বলা যায়, বিহারের এই নির্বাচন শুধু একটি রাজ্যের ক্ষমতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, উত্তর ভারতের রাজ্যগুলোতে বিজেপির প্রভাব ও সংগঠনশক্তি পুনরায় প্রমাণিত হলে তা আগামী লোকসভা নির্বাচনের দিকনির্দেশক হিসেবে কাজ করবে। সেই প্রেক্ষাপটেই বলা যায়—বিহারের মাটিতে নীতীশ-বিজেপি জোটের বাজিমাত এবার হয়তো ভারতের রাজনীতিতে নতুন বার্তা নিয়ে আসতে চলেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত