পাকিস্তানে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বাড়াতে বিতর্কিত সংশোধনী পাস

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৮ বার
পাকিস্তানে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বাড়াতে বিতর্কিত সংশোধনী পাস

প্রকাশ: ১৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

পাকিস্তানের রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সামরিক বাহিনীর প্রভাব বাড়ানোর উদ্দেশ্যে সংবিধানের ২৭তম সংশোধনী পাস। বুধবার (১২ নভেম্বর) দেশটির নিম্নকক্ষ ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে এই সংশোধনীটি ২৩৪ ভোটে পাস হয়, যেখানে বিপক্ষে ভোট পড়ে মাত্র চারটি। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা ও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই সংশোধনী দেশটিতে সামরিক আধিপত্যের ভবিষ্যৎকে আরও পোক্ত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

পাকিস্তানের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যত সেনাবাহিনী দেশটির রাজনীতি, প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থায় অভূতপূর্ব প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। সংশোধনীর মূল ধারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে “প্রতিরক্ষা প্রধান” নামে একটি নতুন পদ সৃষ্টি, যা সেনাপ্রধানকে আজীবন সুরক্ষা ও বিশেষাধিকার দেবে।

নতুন পদ অনুযায়ী, বর্তমান সেনাপ্রধান একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করবেন এবং তার অধীনে থাকবে নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনী। সংশোধনীর আওতায় প্রতিরক্ষা প্রধান দায়িত্বে থাকাকালীন কোনো ধরনের ফৌজদারি মামলায় দায়মুক্তি পাবেন। এই বিধানটি শুধু তার দায়িত্বকালীন সময়েই নয়, বরং পরবর্তীতেও কার্যকর থাকবে বলে জানা গেছে।

এমন সিদ্ধান্ত পাকিস্তানে গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে “গণতন্ত্রের প্রতি আঘাত” বলে উল্লেখ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, “এই সংশোধনী সামরিক বাহিনীকে কার্যত সংবিধানের ঊর্ধ্বে স্থান দিচ্ছে। এটি শুধু ক্ষমতার ভারসাম্য ভেঙে দেবে না, বরং নাগরিক অধিকার ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতাকেও বিপন্ন করবে।”

বুধবারের ভোটাভুটিতে সরকারপন্থী দল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) এবং তাদের মিত্ররা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সংশোধনীটি সহজেই পাস করায় বিরোধীদের কোনো দৃশ্যমান প্রতিরোধ দেখা যায়নি। এর আগে সোমবার বিরোধীদলগুলোর বয়কটের মধ্যেই বিলটি উচ্চকক্ষ সিনেটে পাস হয়। নিয়ম অনুযায়ী, বিলটি এখন আবার সিনেটে পাঠানো হবে যেখানে কিছু শব্দচয়ন ও আইনি ভাষার পরিমার্জন শেষে পুনরায় ভোটাভুটি হবে। এরপর প্রেসিডেন্ট স্বাক্ষর করলেই এটি সংবিধানের অংশ হয়ে যাবে।

এই পুরো প্রক্রিয়াকে “গণতন্ত্রের জন্য কালো অধ্যায়” হিসেবে বর্ণনা করেছে পাকিস্তানের অন্যতম বিরোধী দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। দলটির মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, “এটি একটি সাংবিধানিক ছদ্মবেশে সামরিক শাসনের প্রতিষ্ঠা। জনগণের ইচ্ছা ও প্রতিনিধি সংসদের মর্যাদা এখানে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর প্রভাব ঐতিহাসিকভাবে গভীর হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসামরিক প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন বেড়েই চলেছে। এই সংশোধনীর মাধ্যমে সেই ভারসাম্য পুরোপুরি সেনাবাহিনীর দিকে ঝুঁকে পড়বে। ইসলামাবাদের রাজনৈতিক গবেষক হামিদ উল্লাহ খান বলেন, “পাকিস্তানের রাজনীতিতে সেনাবাহিনী সবসময়ই এক নীরব শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এই সংশোধনীর মাধ্যমে সেটি আর নীরব থাকবে না, বরং সাংবিধানিকভাবে সর্বোচ্চ কর্তৃত্বে পরিণত হবে।”

আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও এসেছে নিন্দা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন কূটনৈতিক দপ্তর সংশোধনী নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। ওয়াশিংটনের এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেছেন, “আমরা পাকিস্তানে গণতন্ত্র ও বেসামরিক শাসনব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু এই পদক্ষেপ দেশটির গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে দুর্বল করতে পারে।”

অন্যদিকে, সরকারপক্ষ দাবি করছে, এই সংশোধনী দেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও প্রতিরক্ষা কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্য অপরিহার্য। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আজিজ খান বলেন, “বর্তমান বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধানকে আরও ক্ষমতা দেওয়া প্রয়োজন ছিল। এটি সামরিক নয়, বরং কৌশলগত সিদ্ধান্ত।”

তবে মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের নেতারা এই যুক্তি মানতে নারাজ। তারা বলছেন, সামরিক শৃঙ্খলার নামে গণতন্ত্রের মূল কাঠামো ভেঙে দেওয়া হচ্ছে। ইসলামাবাদ মানবাধিকার ফোরামের চেয়ারম্যান নাসরিন জাফর বলেন, “যখন একজন সেনাপ্রধানকে আজীবন সুরক্ষা ও দায়মুক্তি দেওয়া হয়, তখন আদালতের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার হুমকির মুখে পড়ে।”

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই সংশোধনীর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে পড়তে শুরু করেছে। সিন্ধ ও বেলুচিস্তানের কয়েকটি প্রাদেশিক দল ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে যে তারা এ সংশোধনীর বিরুদ্ধে আদালতে যাবে। কিছু আইনজীবী সংগঠনও বলছে, সংবিধানে এমন সংশোধনী আনা রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটি আদালতে চ্যালেঞ্জযোগ্য।

বিলটির অনুমোদনের পর রাজধানী ইসলামাবাদ, করাচি ও লাহোরে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থী সংগঠন, মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের সদস্যরা রাস্তায় নেমে “নো টু মিলিটারি ল” এবং “ডেমোক্রেসি ফর পাকিস্তান” স্লোগান দিচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে তুমুল বিতর্ক। অনেকেই লিখছেন, “১৯৭৭ সালের মতো পাকিস্তান আবারও সামরিক ছায়ায় ফিরে যাচ্ছে।”

অর্থনীতিবিদরাও বলছেন, এই আইন বিনিয়োগ ও বৈদেশিক আস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এক অর্থনৈতিক বিশ্লেষক জানান, “বিনিয়োগকারীরা এমন দেশেই আস্থা রাখে যেখানে প্রশাসন স্থিতিশীল এবং বেসামরিক কাঠামো শক্তিশালী থাকে। কিন্তু সামরিক কর্তৃত্ব বাড়লে সেই আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”

দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীলতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জর্জরিত পাকিস্তানের জন্য এই সংশোধনী তাই একটি নতুন মোড়। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এটি দেশটিকে গণতন্ত্র থেকে এক ধাপ দূরে ঠেলে সামরিক আধিপত্যের এক নতুন যুগে প্রবেশ করাবে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম ‘ডন’ তাদের সম্পাদকীয়তে লিখেছে, “২৭তম সংশোধনী পাকিস্তানের ইতিহাসে এমন একটি দাগ রেখে যাবে, যা মুছে ফেলা কঠিন হবে।”

এখন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন তাকিয়ে আছে প্রেসিডেন্টের দিকে। তার স্বাক্ষরের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে, পাকিস্তান কি গণতন্ত্রের পথে থাকবে, নাকি সামরিক শাসনের ছায়ায় প্রবেশ করবে। এর মধ্যেই আন্তর্জাতিক মহল থেকে আহ্বান উঠেছে—দেশটির রাজনীতিতে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনার, যাতে পাকিস্তান আরেকটি অন্ধকার অধ্যায়ে প্রবেশ না করে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত