প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউরোপিয়ান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের রাতটি ফুটবলভক্তদের জন্য ছিল নাটকীয়তা, উত্তেজনা এবং আলোচনার মিশেলে ভরপুর। বিশেষ করে পর্তুগাল ও আয়ারল্যান্ডের ম্যাচ ঘিরে তৈরি হওয়া আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। প্রথম লেগের পর আইরিশ ভক্তদের অভিযোগ, রেফারিদের ওপর রোনালদো অপ্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করেছেন। দ্বিতীয় লেগের আগে রোনালদো রসিকতা করে বলেছিলেন, তিনি এবার ‘গুড বয়’ হয়ে থাকবেন, আর তাঁকে যেন দুয়ো না দেওয়া হয়। কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা সম্ভব হলো না। বরং ম্যাচটি হয়ে উঠল তাঁর ক্যারিয়ারের স্মরণীয় এবং একইসঙ্গে হতাশার একটি রাত।
দ্বিতীয় লেগে শুরু থেকেই চাপ নিয়ে খেলতে থাকে পর্তুগাল। নিজেদের ছন্দ খুঁজে পেতে যেন বারবার ভুল করছিল দলটি। বিপরীতে আয়ারল্যান্ড ছিল অত্যন্ত সংগঠিত, দৃঢ় এবং আত্মবিশ্বাসী। ম্যাচের ১৭তম মিনিটে ট্রয় প্যারট দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে প্রথম গোলটি করেন। পর্তুগালের রক্ষণভাগ বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে থাকলেও আয়ারল্যান্ড তাদের পরিকল্পিত ফুটবলে এগিয়ে যেতে থাকে। এরপর ম্যাচের ৪৫তম মিনিটে আরেকটি সুনিপুণ আক্রমণ থেকে প্যারটই আবার জালের দেখা পান। দুই গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ে পর্তুগাল যখন ফিরে আসার চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই আসে সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
এক মুহূর্তের উত্তেজনা, প্রতিপক্ষের সঙ্গে ধাক্কা ও রেফারির সঙ্গে বাকবিতণ্ডা—সব মিলিয়ে রোনালদোর প্রতি প্রদর্শিত হয় লাল কার্ড। ক্যারিয়ারের ১৩তম লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার সময় আইরিশ দর্শকদের দুয়ো যেন আরও তীক্ষ্ণ হয়ে তাঁর কানে পৌঁছাচ্ছিল। রোনালদো হালকা অঙ্গভঙ্গিতে জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাঁর মুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট ছিল। পর্তুগালের কোচ ও সতীর্থরা সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি জানালেও রেফারি সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন। মাঠে একজন কম নিয়ে লড়াইয়ে ফিরে আসার পথ আরও কঠিন হয়ে পড়ে পর্তুগালের জন্য। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যবধান আর কমাতে পারেনি তারা এবং আয়ারল্যান্ড ২-০ গোলের ঐতিহাসিক এক জয় তুলে নেয়। ২০০৫ সালের পর এটাই পর্তুগালের বিপক্ষে তাদের প্রথম জয়, যা দলটির বিশ্বকাপে যাওয়ার ক্ষীণ আশা টিকিয়ে রাখল।
পর্তুগাল–আয়ারল্যান্ড ম্যাচের নাটকীয়তার পাশাপাশি ইউরোপের আরেক প্রান্তে চলছিল ফ্রান্সের শক্তিমত্তার প্রদর্শনী। ‘ডি’ গ্রুপে প্রাক ডে প্রিন্সের মাঠে ইউক্রেনের বিপক্ষে খেলতে নামে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। ম্যাচের শুরু থেকে একতরফা আধিপত্য ছিল ফরাসিদের। ধারাবাহিক আক্রমণ আর গোল মিসের হতাশা নিয়ে প্রথমার্ধ শেষ করলেও দ্বিতীয়ার্ধে এসে খুঁজে পায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য। ম্যাচের ৫৫তম মিনিটে কিলিয়ান এমবাপ্পে পেনাল্টি থেকে প্রথম গোল করেন। গোলের পর পুরো দল যেন আরও প্রাণ ফিরে পায়। ৭৬তম মিনিটে তরুণ ফরোয়ার্ড ওলিসে ব্যবধান বাড়ান। এরপর ৮৩ মিনিটে আবারও এমবাপ্পে গোল করে দলকে আরও এগিয়ে দেন। ম্যাচের শেষ দিকে লিভারপুলের ফুটবলার হুগো একিতিকে ফ্রান্সের চতুর্থ গোলটি করেন। শেষ পর্যন্ত ৪-০ গোলের বড় জয় নিশ্চিত হয় ফরাসিদের।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ৫ ম্যাচে ৪ জয় ও এক ড্র নিয়ে ১৩ পয়েন্ট সংগ্রহ করে ফ্রান্স নিশ্চিত করে ২০২৬ বিশ্বকাপের টিকিট। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সবচেয়ে ধারাবাহিক দলগুলোর একটি ফ্রান্স আবারও তাদের আধিপত্য প্রমাণ করল মাঠে।
এদিকে ‘আই’ গ্রুপে ইতালি এবং মলদোভার ম্যাচটিও ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। পুরো ম্যাচ জুড়ে বল দখলে, আক্রমণে ও মাঠ নিয়ন্ত্রণে ছিল আজ্জুরিরা, কিন্তু গোল আসছিল না কিছুতেই। ম্যাচের শেষ দিকে এসে ৮৮তম মিনিটে ডেডলক ভাঙেন জিয়ানলুকা মানচিনি। এর পর ইনজুরি সময়ে এস্পোজিতোর গোল নিশ্চিত করে ইতালির ২-০ ব্যবধানের জয়।
রাতের শেষ আকর্ষণ ছিল ‘কে’ গ্রুপে ইংল্যান্ড ও সার্বিয়ার ম্যাচ। ইংল্যান্ড শুরু থেকেই গোছালো ফুটবল খেলতে থাকে। ২৮তম মিনিটে বুকায়ো সাকা প্রথম গোল করেন। সার্বিয়া চেষ্টা করলেও ইংল্যান্ডের রক্ষণ ছিল অটল। ম্যাচের শেষদিকে, ৯০তম মিনিটে এবরশি এজে গোল করেন। তাতে ইংল্যান্ড ২-০ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এ পর্যন্ত বাছাইপর্বে ইংল্যান্ড এখনো একটিও গোল হজম করেনি। সাত ম্যাচে টানা এই সাফল্য টুখেলের দলের আত্মবিশ্বাসকে আরও উঁচুতে নিয়ে যাচ্ছে।
এ রাতের ম্যাচগুলো আবারও মনে করিয়ে দিল ফুটবলের অনিশ্চয়তা ও রূপকথার মতো গল্পের জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা। কোনো ম্যাচে অভিজ্ঞ সুপারস্টার লাল কার্ড দেখে হতাশ হয়ে মাঠ ছাড়ছেন, আবার অন্য ম্যাচে তরুণ ফুটবলাররা নিজের প্রতিভায় আলো ছড়াচ্ছেন। ইউরোপীয় বাছাইপর্বের এসব লড়াই ফুটবলপ্রেমীদের কাছে শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং আবেগ, উত্তেজনা ও আনন্দেরই আরেক ব্যঞ্জনা।