প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজা উপত্যকা এক মাস আগে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পরও এখনও শূন্য নয় নিরাপত্তা। প্রতিদিন নতুনভাবে ভেঙে যাচ্ছে শান্তির স্বপ্ন। অবরুদ্ধ গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর ধারাবাহিক হামলায় গত এক মাসে অন্তত ২৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও ৬৩২ জন। এই হতাহতের খবর গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত হয়েছে, যা একদিকে যুদ্ধবিরতির ধারাবাহিক ব্যর্থতাকে প্রমাণ করে, অন্যদিকে স্থানীয় মানুষদের ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকটের চিত্র ফুটিয়ে তোলে।
স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার, ১৩ নভেম্বর, বেইত লাহিয়া, গাজা সিটির পূর্বাঞ্চল এবং দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিস শহরে বিমান হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। প্রতিটি হামলা স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনকে সরাসরি বিপন্ন করেছে এবং ঘরবাড়ি, স্কুল ও হাসপাতালের মতো বেসামরিক স্থাপনাগুলোতে ভয়াবহ ক্ষতি করেছে। গাজা শহরের স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামলায় নিহতদের মধ্যে শিশু ও নারীও রয়েছে।
পশ্চিমতীরও অবস্থা তেমনই ভয়াবহ। হেবরনের উত্তরাঞ্চলীয় বেইত উমর শহরে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে কয়েকজন শিশু নিহত হয়েছেন। আনতাবা শহরে ইসরাইলি বাহিনী ও স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের মধ্যে সংঘর্ষের সময় আরও কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। জেরুজালেমে অভিযান চলাকালীন গুলিতে আহত হয়েছেন বহু সাধারণ মানুষ। এই সংঘাত স্থানীয়দের জীবনে নিরাপত্তাহীনতার মাত্রা বাড়িয়েছে।
একদিকে হামলার ধাক্কা সহ্য করতে গিয়ে ফিলিস্তিনি জনগণ মানবিক সংকটে পড়েছে, অন্যদিকে তাদের মুক্তির আশা চূর্ণ হয়েছে। তবে গাজা থেকে ইতোমধ্যেই আরও একটি জিম্মির মরদেহ ইসরাইলের কাছে হস্তান্তর করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, তারা যত দ্রুত সম্ভব সব জিম্মির মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে কাজ করছে। এই পদক্ষেপ মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ হলেও যুদ্ধবিরতির পরও সামরিক সহিংসতা কমেনি, যা জনগণের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য বড় ধাপের চ্যালেঞ্জ।
এদিকে, শীতকাল নেমে আসার কারণে আশ্রয়হীন ফিলিস্তিনিদের জন্য মানবিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গাজার রাফা শহরের ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স সতর্ক করেছে যে, হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘর বা সাময়িক তাঁবুতে অবস্থান করছে। শীত ও বৃষ্টির কারণে জীবনধারণের চরম ঝুঁকি রয়েছে। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তা গুরুতর মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে। শিশু, নারী ও বয়স্কদের জন্য পরিস্থিতি বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ তাঁরা আবহাওয়ার প্রভাব থেকে সুরক্ষা পায় না।
সামাজিক ও মানবিক সংগঠনগুলোও ইতিমধ্যেই বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারা খাবার, পানি ও জরুরি চিকিৎসা সরবরাহের চেষ্টা চালাচ্ছে, কিন্তু এ ধরনের সংক্ষিপ্ত পদক্ষেপ পূর্ণাঙ্গ সমাধান দিতে সক্ষম নয়। শীত ও বৃষ্টির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বসবাসের উপযুক্ত নিরাপদ আশ্রয় এবং মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এখন সবচেয়ে জরুরি।
অন্যদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা অব্যাহত। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, যিনি নেতানিয়াহুকে দুর্নীতি মামলায় ক্ষমা দিতে ইসরাইলের প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি পাঠিয়েছিলেন। তবে নেতানিয়াহু নিজে দোষ স্বীকার করতে অস্বীকার করেছেন এবং শুধুমাত্র ক্ষমা গ্রহণ করেছেন। এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাত এবং মানবিক সংকট আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। জাতিসংঘ, রেড ক্রস ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা বারবার ইসরাইল ও ফিলিস্তিনিদের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের রক্ষার জন্য তৎপর হতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তবে বাস্তবে এই আহ্বান প্রায়শই কার্যকর হচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গাজার অবরুদ্ধ অবস্থা এবং চলমান হামলা শুধু স্থানীয় মানুষদের নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় হুমকি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপ এবং মানবিক সহায়তার ব্যর্থতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। পাশাপাশি, গাজার অন্তত ৫০ শতাংশ পরিবার এখনও শীত ও বৃষ্টির আড়াল থেকে নিরাপদ নয়। এই বাস্তবতা রাজনৈতিক সমাধান এবং তাত্ক্ষণিক মানবিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তাকে আবারও প্রমাণ করছে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও সতর্ক করেছে যে, গাজার পরিস্থিতি যদি এমন চলতে থাকে, তা এক অনিবার্য মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নেবে। সংস্থা বলেছে, নিরীহ মানুষদের ওপর হামলা এবং মৌলিক সেবার অভাব আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের সমতুল্য। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি সহিংসতা আন্তর্জাতিকভাবে কঠোর নিন্দার বিষয়।
উল্লেখ্য, গাজার সাধারণ মানুষরা শীতের মৌসুমকে সামনে রেখে নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে দিনরাত চেষ্টা চালাচ্ছে। তাঁরা জানেন, মৌলিক চাহিদার অভাব, খাদ্য সংকট এবং চিকিৎসার অপ্রতুলতা একত্রিত হয়ে জীবন বিপন্ন করতে পারে। তাই স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক মানবিক সাহায্য এখন তাদের একমাত্র আশ্রয়।
সংক্ষেপে বলা যায়, যুদ্ধবিরতির এক মাস পার হলেও গাজায় শান্তি প্রতিষ্ঠা হয়নি। ইসরাইলি হামলায় নিহত ও আহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা উদ্বেগজনক। জিম্মি মুক্তির প্রচেষ্টা চলছে, তবে মানবিক বিপর্যয় তীব্র হচ্ছে। শীত ও আবহাওয়ার কারণে হাজার হাজার বাস্তুচ্যুত মানুষ বিপন্ন। রাজনৈতিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে গাজার সাধারণ মানুষ প্রতিদিন বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। মানবিক সহায়তা, আন্তর্জাতিক চাপ এবং রাজনৈতিক সমাধান ছাড়া গাজার পরিস্থিতি ক্রমেই আরও ভয়াবহ হয়ে উঠার আশঙ্কা রয়েছে।
এই সংকট আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, মানবতার মূল্য ও নিরাপত্তা কোনো রাষ্ট্রীয় বা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের বাইরে থাকা উচিত। গাজার মানুষের চোখে জীবনযুদ্ধ চলছেই, এবং তাদের পাশে দাঁড়ানো আন্তর্জাতিক দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।