প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চীন ও জাপানের মধ্যে কূটনৈতিক উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সম্প্রতি দেওয়া মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বেইজিংয়ের কর্তৃপক্ষ শুক্রবার জাপানের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছে এবং কড়া বার্তা দিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাপানের এই মন্তব্য ‘চীনের অভ্যন্তরীণ বিষয়’ হিসেবে দেখা হচ্ছে এবং এতে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি হুমকি রয়েছে।
গত সপ্তাহে জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সংসদে একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, “তাইওয়ানে যদি সশস্ত্র হামলা হয়, তবে সমষ্টিগত আত্মরক্ষা নীতির আওতায় জাপান সেখানে সেনা পাঠাতে পারে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, “যদি তাইওয়ানে জাহাজ, সামরিক শক্তি বা যেকোনো যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে তা জাপানের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে।” এই মন্তব্যের মাধ্যমে জাপান স্পষ্টতই প্রতিরক্ষা নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্কট মোকাবেলায় আঞ্চলিক সক্রিয় ভূমিকার সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দ্রুত জবাব দিয়েছে। বৃহস্পতিবার চীনের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সানেয়ে ওয়েইডং বেইজিংয়ে জাপানের রাষ্ট্রদূত কেনজি কানাসুগিকে তলব করে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির বক্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর আপত্তি জানিয়েছেন। মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “চীনের ঐক্য প্রক্রিয়ায় কেউ হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করলে চীন তা কখনো সহ্য করবে না। আমরা জাপানকে অবিলম্বে এই বক্তব্য প্রত্যাহারের আহ্বান জানাচ্ছি।”
চীনের এই পদক্ষেপকে কেবল কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং এটি পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে ধরা হচ্ছে। তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে চীন ও জাপানের মধ্যে রাজনৈতিক এবং সামরিক উত্তেজনা বহু বছর ধরে বিদ্যমান, কিন্তু এবার পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। বিশেষত, জাপানের ২০১৫ সালের নিরাপত্তা আইন অনুযায়ী, সমষ্টিগত আত্মরক্ষা নীতির প্রয়োগের সুযোগ থাকায় জাপান নিজ দেশের অস্তিত্ব বা সশস্ত্র হামলার ঝুঁকির মুখে এমন পদক্ষেপ নিতে পারে।
প্রসঙ্গত, জাপানের সংসদে প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি স্পষ্ট করেছেন যে, তার বক্তব্য টোকিওর পূর্বের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং তিনি এটি প্রত্যাহার করবেন না। তবে তিনি বলেছেন, ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির উদাহরণ না দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এই অবস্থান জাপানের পক্ষ থেকে কূটনৈতিক শক্তি প্রদর্শনের সঙ্গে সঙ্গে চীনের প্রতি সতর্ক বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জাপানের এই পদক্ষেপ কেবল তাইওয়ানকে সশস্ত্র হুমকি মোকাবেলায় সমর্থন দেয়ার সূচক নয়, বরং এটি চীনের প্রতি আঞ্চলিক রাজনৈতিক প্রভাবের পরীক্ষা। বিশেষ করে, পূর্ব এশিয়ার শক্তি সমীকরণে জাপান ও চীনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উত্তেজনা নতুন মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশ্লেষকরা আরও বলেন, “তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে জাপান এবং চীনের মধ্যে কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে, যা পুরো পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করবে।”
চীনের রাষ্ট্রদূতকে তলবের ঘটনা কেবল কূটনৈতিক শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নয়। এটি চীনের পক্ষ থেকে জাপানকে সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে কোনো হস্তক্ষেপ সহ্য করা হবে না। এই তলবের মাধ্যমে চীন জাপানকে সরাসরি জানিয়ে দিয়েছে যে, তারা একতরফা পদক্ষেপের সুযোগ নেবে এবং প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
অন্যদিকে, জাপানকে সমর্থনকারী দেশগুলোর প্রতিক্রিয়াও নজরকাড়া। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি এশিয়ান রাষ্ট্র জাপানের প্রতিরক্ষা নীতি ও তাইওয়ানকে সমর্থনের কথা স্বাগত জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, এটি চীনের সঙ্গে জাপানের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও জটিল করতে পারে এবং ভবিষ্যতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, তাইওয়ান নিজেই জাপানের এই মন্তব্যকে সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে। দেশটি চীনের সঙ্গে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে পরিস্থিতি আরও ভীতিকর হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাইওয়ান সরকার জানিয়েছে, তারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের চেষ্টা করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জাপানের নতুন প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে জাপানের সক্রিয় ভূমিকার সংকেত দিয়েছেন। তাঁর মন্তব্য চীনের জন্য সরাসরি হুমকি হিসেবে ধরা হচ্ছে, কারণ এটি চীনের জাতীয় নিরাপত্তা এবং তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের প্রকাশ। ভবিষ্যতে এই দ্বন্দ্ব কেবল কূটনৈতিক নয়, বরং সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
চীনের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে, তাইওয়ান চীনের অংশ এবং এই অঞ্চলে বিদেশি হস্তক্ষেপ কোনভাবেই সহ্য করা হবে না। অন্যদিকে, জাপান চাইছে, তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সমষ্টিগত আত্মরক্ষা নীতি নিশ্চিত করতে সক্ষম হোক। এই দ্বিপাক্ষিক অবস্থান দুই দেশকেই নতুন কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছে।
সংক্ষেপে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচির মন্তব্যের পর চীনের রাষ্ট্রদূতকে তলব করা কূটনৈতিক উত্তেজনার নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে। চীন জাপানের পদক্ষেপকে হুমকি হিসেবে দেখছে এবং জাপান সতর্কতা অবলম্বন করে বলেছে, তার বক্তব্য পূর্বের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামরিক প্রস্তুতি এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের এই জটিলতা ভবিষ্যতে পূর্ব এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে প্রভাবিত করবে।