মানবতাবিরোধী অপরাধ অস্বীকার করলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৮ বার
মানবতাবিরোধী অপরাধ অস্বীকার করলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

বাংলাদেশের গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। গত বছরের জুলাই মাসে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের সময় সংঘটিত দমন-পীড়নকে কেন্দ্র করে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে চলমান মামলার রায় ঘোষণার অপেক্ষায় আছে দেশ। রায়ের ঠিক কয়েকদিন আগে বিবিসিকে দেওয়া এক ইমেইল সাক্ষাৎকারে তিনি অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং “ক্যাঙ্গারু কোর্টের সাজানো প্রহসন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দেশত্যাগের পর এটি তার প্রথম প্রকাশ্য বক্তব্য। তিনি দাবি করেছেন, তার অনুপস্থিতিতে চলছে “পূর্বনির্ধারিত দোষী সাব্যস্ত করার বিচারিক নাটক”, যার ফলাফল আগেই ঠিক করা। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ ইতোমধ্যে তার মৃত্যুদণ্ডের আবেদন করেছে, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গন ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ব্যাপক আলোচনা চলছে।

ঢাকায় বিশেষ ট্রাইব্যুনালের সামনে এখন কঠোর নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। রায়কে কেন্দ্র করে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিতে পারে—এমন আশঙ্কায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। আদালতপাড়া ও আশপাশের এলাকায় টহল, চেকপোস্ট ও নজরদারি কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে।

শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ—২০২৪ সালের জুলাই মাসে তার সরকারের পতন ডেকে আনা দেশব্যাপী ছাত্র-যুব আন্দোলনের সময় শতাধিক মানুষকে হত্যার নির্দেশ তিনি দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপক বলপ্রয়োগ করে, যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করেন, দমন-পীড়ন ছিল পরিকল্পিত, সুসংগঠিত এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের ফল।

বিবিসিকে দেওয়া নিজের প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, “আমি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের চক্রান্তের শিকার। তারা গণতন্ত্রের নামে প্রতিহিংসার রাজনীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। যে আদালতে আমাকে বিচার করা হচ্ছে, সেটি স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নয়। সেখানে ন্যায়বিচার পাওয়া সম্ভব নয়।”

তার এই বক্তব্যে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহতদের পরিবারের ক্ষোভ আরও ঘনীভূত হয়েছে। নৃশংস সেই দমন-পীড়নে হারানো সন্তানদের ছবি বুকে নিয়ে তারা প্রতিদিন আদালতপাড়ায় ভিড় করছেন। তাদের মনোভাব পরিষ্কার—বিচার চাই, এবং তা কঠোর ও দৃশ্যমান হতে হবে। তাদের জন্য আসন্ন রায় শুধু আইনি প্রক্রিয়ার শেষ ধাপ নয়; এটি তাদের দীর্ঘদিনের বেদনা, অপেক্ষা এবং প্রতীক্ষার ফলাফলের মুহূর্ত।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিহতদের স্বজনরা জানান, শেখ হাসিনার দেওয়া অস্বীকারোক্তি তাদের জন্য নতুন আঘাতের মতো। এক শিক্ষার্থীর মা বলেন, “আমরা তো চোখের সামনে সন্তান হারিয়েছি। এতগুলো লাশ পড়ল—সবই কি মিথ্যা? রাজনীতি নিয়ে কিছু জানি না, কিন্তু অন্যায় করলে শাস্তি হওয়া উচিত। নিজের সন্তান হারানোর বিচার চাই—এটাই আমার কথা।”

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, মামলার রায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। দেশে নতুন নেতৃত্বের উত্থান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিবর্তনের প্রক্রিয়ায় এই রায়ের প্রতিক্রিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। অতীতে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল বা রাজনৈতিক মামলার রায় যেমন সামাজিক বিভাজন ও রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে, এবারও সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক মহলও মামলাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো যে প্রশ্নগুলো তুলেছে—সেগুলোর প্রধান দুটি হলো: বিচার কি পর্যাপ্ত প্রমাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে, এবং আসামির অনুপস্থিতিতে এমন দণ্ড কি আন্তর্জাতিক বিচারনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? অন্যদিকে বাংলাদেশের নতুন শাসনব্যবস্থা দাবি করছে—আইন অনুযায়ী বিচার চলছে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে।

শেখ হাসিনার নিকটজনরা বলছেন, তিনি বর্তমানে একটি নিরাপদ দেশে অবস্থান করছেন। তবে কোন দেশে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন, তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তার ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে নানা জল্পনা রয়েছে। সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, তিনি ফিরে এসে আবারও রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হবেন। সমালোচকেরা বলছেন, এই মামলা এবং রায় তার রাজনৈতিক অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে দিতে পারে।

আসন্ন রায়কে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে যে উত্তেজনা বিরাজ করছে, তা আরো তীব্র হতে পারে ফলাফল ঘোষণার পর। আদালত সূত্র জানিয়েছে, প্রমাণ উপস্থাপন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তি-তর্ক শেষ হওয়ায় রায় প্রস্তুত। দিনক্ষণ ঘোষণা করা হবে শিগগিরই।

বাংলাদেশের ইতিহাসে রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এই মামলা প্রথমবারের মতো গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার—যা দেশের বিচারপ্রক্রিয়ায় এক নজিরবিহীন অধ্যায়।

নিহতদের স্বজনদের আশা একটাই—রায় যেন তাদের যন্ত্রণা ও ক্ষতকে স্বীকৃতি দেয়, এবং দায়ীদের শাস্তির মাধ্যমে দেশের সামনে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়। অন্যদিকে শেখ হাসিনার বক্তব্য মামলাকে নতুন রাজনৈতিক বিতর্কের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যা আগামী দিনের রাজনীতিকে আরও জটিল আকার দিতে পারে।

দেশবাসী তাকিয়ে আছে আসন্ন রায়ের দিকে—যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মধ্যে এক নতুন মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত