ইসরাইলি হামলা ও বন্যায় গাজায় ভোগান্তি চরমে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ১৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪০ বার
ইসরাইলি হামলা ও বন্যায় গাজায় ভোগান্তি চরমে

প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি সেনাদের চলমান হামলা এবং টানা ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে সাধারণ মানুষ আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছে। সম্প্রতি ইসরাইলি বাহিনী যে হামলা চালিয়েছে, তাতে অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। একই সময়ে প্রবল বর্ষণের কারণে প্লাবিত হয়েছে হাজারো অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র, যেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য, পানি এবং চিকিৎসা সরঞ্জাম অভাবের কারণে দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

রোববার (১৪ নভেম্বর) কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে নাসের মেডিকেল কমপ্লেক্সের এক সূত্র জানিয়েছে, দক্ষিণ গাজার খান ইউনুসের পূর্বদিকের একটি এলাকায় ইসরাইলি বিমান ও স্থল বাহিনী যৌথভাবে হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত তিনজন ফিলিস্তিনি নিহত হন। একই দিনে গাজা সিটির জেইতুন এলাকা এবং রাফাহের নিকটবর্তী কিছু অঞ্চলও বিমান হামলার কবলে পড়ে। নিহতদের মধ্যে একজন স্থানীয় স্কুল শিক্ষক এবং একজন নারী বলে জানা গেছে। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা গুরুতর, এবং চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা সীমিত।

গাজা সিটি থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক ইব্রাহিম আল-খালিলি জানান, যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে বলে ইসরাইল দাবি করছে, তবুও তারা ‘ইয়োলো লাইন’-এর পেছনের এলাকায় নিয়মিত হামলা চালাচ্ছে। তিনি বলেন, “‘ইয়োলো লাইন’-এর আশেপাশের পরিবারগুলোর পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাড়িঘর ধ্বংস হচ্ছে, আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এবং প্রবল বৃষ্টিতে তাদের অস্থায়ী আশ্রয়ও প্লাবিত হচ্ছে। নিরাপত্তা নেই, আর মানবিক সহায়তা পৌঁছানোও কঠিন। প্রতিটি নতুন দিন তাদের জন্য জীবনযুদ্ধের মতো।”

ফিলিস্তিনি শরণার্থীদের জন্য কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, গত দুই বছরের নির্বিচার বোমাবর্ষণে গাজার প্রায় ১৩ হাজার পরিবার তাদের ঘরবাড়ি হারিয়েছে। এসব পরিবার তীব্র ঠান্ডা ও বন্যার মধ্যে আছেন, যেখানে খাবার, পানি, ওষুধ এবং নিরাপদ আশ্রয় যথেষ্ট নেই। ইউএনআরডব্লিউএ আরও জানিয়েছে, “এই পরিবারগুলো ইতিমধ্যেই মানবিক দুর্যোগের শিকার। এখনকার এই বন্যা তাদের দুর্ভোগকে আরও গভীর করছে। অনেক শিশু ও প্রবীণ ব্যক্তির জন্য জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে।”

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর গাজার মোট ভবন ও আবাসিক ইউনিটের ৮০ শতাংশের বেশি ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। যদিও যুদ্ধবিরতি কার্যকর, তবুও ইসরাইল এখনও গাজায় জরুরি সহায়তা সরবরাহে বাধা দিচ্ছে। বিশেষ করে তাঁবু, মোবাইল হোম, খাদ্য ও মেডিকেল কিট সরবরাহে নিয়মিত জটিলতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে সবচেয়ে দুর্বল মানুষদের জন্য জীবনযাপন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

এই অবস্থায় ফিলিস্তিনের মানুষদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান হতাশা এবং উদ্বেগ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের বরাতে জানা যায়, বন্যায় প্লাবিত হওয়া অস্থায়ী আশ্রয় কেন্দ্রগুলোতে খাবারের তীব্র ঘাটতি দেখা দিয়েছে। শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার স্থান নেই, তারা কাদায় ভিজে থাকা ত্রিপল এবং ছেঁড়া তাঁবুতে বসে থাকে। প্রাপ্ত শেল্টারগুলোও পুরোপুরি কার্যকর নয়।

স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, প্লাবিত আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে জলবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে। তারা সতর্ক করেছেন, যদি পানি এবং পরিচ্ছন্নতার ব্যবস্থা না করা হয়, তবে ডায়রিয়া ও অন্যান্য সংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাবে। “মানবিক সহায়তা এখন জীবন রক্ষার মতো জরুরি। আর যদি এটি পৌঁছানো না হয়, শিশু ও প্রবীণদের জন্য পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠবে,” এক স্থানীয় চিকিৎসক সাংবাদিকদের বলেন।

এই অবস্থায় আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা এবং কিছু স্বেচ্ছাসেবী দল ত্রাণ বিতরণে কাজ করছে, কিন্তু নিরাপত্তার সমস্যা এবং অবরোধের কারণে কার্যক্রম সীমিত। স্থানীয় ফিলিস্তিনি নাগরিকদের দাবি, “আমরা শুধু নিরাপদ আশ্রয় চাই। আমাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়েছে, আমরা ঘরে ফিরতে পারছি না। বৃষ্টি আসলে আমাদের স্থায়ী আশ্রয় নেই। হেলিকপ্টার বা বড় যানবাহন দিয়ে খাদ্য ও ত্রাণ পৌঁছানোও এখন অসম্ভব।”

গাজা থেকে প্রাপ্ত ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, টানা বৃষ্টিতে শহরের অনেক এলাকা জলমগ্ন। রাস্তায় পানি জমে থাকা এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত ভবনগুলোর মধ্যে দিয়ে মানুষ চলাচল করছে। শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় নেই, তারা কাদায় ভিজে থাকে, যা তাদের স্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক। একই সময়ে হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো অতিরিক্ত রোগী এবং আহতদের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) বলেছে, “গাজার মানুষ এখন দ্বিগুণ দুর্ভোগের মধ্যে রয়েছে। একদিকে অবিরাম হামলা, অন্যদিকে টানা বন্যা। এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছে।” সংস্থাটি তাদের প্রতিবেদনে আরও বলেছে, “অপর্যাপ্ত সহায়তা ও চলমান সংঘাত ফিলিস্তিনিদের জন্য জীবনকে দৈহিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত কঠিন করে তুলেছে।”

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে ত্রাণ পৌঁছানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, যদি বন্যার জল শুষ্ক না হয় এবং নিরাপদ আশ্রয় না পাওয়া যায়, তবে তীব্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে শীতজনিত অসুস্থতা এবং খাদ্য সংকট আরও বাড়বে।

পরিস্থিতি খুবই সংকটাপন্ন। গাজায় প্রতিদিনের জীবনযাপন এখন শুধুমাত্র বেঁচে থাকার লড়াই। শিশুরা শিক্ষার বাইরে চলে যাচ্ছে, হাসপাতালগুলোও সীমিত সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে, এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ধ্বংসপ্রাপ্ত বসতবাড়ি ও প্লাবিত আশ্রয়কেন্দ্রের কারণে বিপন্ন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে ফিলিস্তিনিদের জন্য তাত্ক্ষণিক সহায়তা এবং নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

এই পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, যে গাজার মানুষ শুধু সংঘাতের নয়, বর্ষার কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মধ্যেও ভোগান্তির মুখোমুখি। নিরাপদ আশ্রয়, খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহের অব্যাহত সংকট এবং তীব্র মানবিক দুর্দশা দ্রুত সমাধান ছাড়া এই অঞ্চলের মানুষদের জীবন আরো বিপজ্জনক হয়ে উঠবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত