প্রকাশ: ১৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দীর্ঘদিন ধরে নানা চাপের মধ্যে নিম্নমুখী ছিল। আমদানি ব্যয়, ঋণের কিস্তি, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ, রপ্তানি আয় কমে যাওয়া এবং প্রবাসী আয়ে ধারাবাহিক ওঠানামা—সব মিলিয়ে গত কয়েক বছর ধরে রিজার্ভের ওপর চাপ ছিল প্রবল। এমন পরিস্থিতিতে রোববার (১৬ নভেম্বর) দেশের রিজার্ভ পরিস্থিতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের খবর জানাল বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান গণমাধ্যমকে জানান, রিজার্ভের সর্বশেষ পরিসংখ্যান আগের অবস্থান থেকে সামান্য হলেও উন্নতি হয়েছে। যা অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ১৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশের গ্রস রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ হাজার ১০৯ দশমিক ৭৯ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে পরিমাপ করা রিজার্ভ বা নিট রিজার্ভ এখন ২৬ হাজার ৪০৫ দশমিক ৫৫ মিলিয়ন ডলার। কয়েক দিন আগেই, ১০ নভেম্বর, গ্রস রিজার্ভ ছিল ৩১ হাজার ১০৩ দশমিক ৪৮ মিলিয়ন ডলার এবং নিট রিজার্ভ বিপিএম-৬ অনুযায়ী ছিল ২৬ হাজার ৩৯৫ দশমিক ২১ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ অল্প সময়ের মধ্যেই রিজার্ভ কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পেয়েছে।
রিজার্ভের এই সামান্য উর্ধ্বগতি পুরো অর্থনীতির জন্য স্বস্তিদায়ক হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ গত দুই বছরে রিজার্ভের দ্রুত পতন দেশের বৈদেশিক লেনদেন, ব্যাংকিং খাত, আমদানি কার্যক্রম, এমনকি সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বেও বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। বাজারে ডলারের সংকট তৈরি হওয়ায় আমদানি ব্যয় বেড়ে যায়, ফলে নিত্যপণ্যের দামে অস্থিরতা বাড়ে। ব্যাংকিং খাতে ডলার সংকটের প্রভাব পড়ে এলসি খোলায়, যা সরাসরি নগরজীবনসহ শিল্প ও ব্যবসায় প্রভাব ফেলেছিল। এসব কারণে রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে জনসাধারণের মধ্যে উদ্বেগ ছিল তীব্র।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংকের দেওয়া সামান্য উন্নতির খবর মানুষকে আশার সঞ্চার করছে। অর্থনীতির বিশ্লেষকদের অনেকে মনে করেন, সংকটময় বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতিতে রিজার্ভ ধরে রাখতে সরকারের নীতি-পরিবর্তন, আমদানি নিয়ন্ত্রণ, রপ্তানি আয় বাড়ানোর প্রচেষ্টা এবং প্রবাসী আয়ে স্থিতিশীলতা কিছুটা হলেও ফল দিতে শুরু করেছে। যদিও রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থার উন্নতির পথ এখনো দীর্ঘ, তবুও ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে আগামী মাসগুলোতে আরও ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা যেতে পারে।
অধিকাংশ অর্থনীতিবিদ মনে করেন, আইএমএফের বিপিএম-৬ পরিমাপ পদ্ধতিতে রিজার্ভ গণনা করা দেশের জন্য সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য নির্দেশক। কারণ এতে প্রকৃত রিজার্ভ থেকে স্বল্পমেয়াদি দায় বা বাধ্যতামূলক ব্যয় বাদ দিয়ে নিট রিজার্ভ গণনা করা হয়। এই নিট রিজার্ভই দেশের প্রকৃত সক্ষমতা নির্দেশ করে। সাম্প্রতিক সময়ে রিজার্ভ কমে যাওয়ায় আইএমএফের ঋণচুক্তির শর্ত পূরণ নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়, তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য সেই উদ্বেগ কিছুটা কমিয়ে দিয়েছে।
রিজার্ভে উন্নতির পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ গত কয়েক মাসে স্থিতিশীল রয়েছে। নতুন প্রবাসী কর্মীরা বিদেশে যাওয়ার কারণে রেমিট্যান্স আয়ের চাপ কমেছে এবং অনেক প্রবাসী এখন হুন্ডির পরিবর্তে ব্যাংকের মাধ্যমে টাকা পাঠাতে উৎসাহিত হয়েছেন। একই সঙ্গে দেশের রপ্তানি খাত বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্প আবারও কিছুটা গতি পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে বাজারের চাহিদা আগের তুলনায় ভালো হওয়ায় রপ্তানি আয়ে ইতিবাচক ধারা দেখা গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর নীতি গ্রহণ করে অপ্রয়োজনীয় পণ্য ও বিলাসপণ্য আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ কমেছে। একই সঙ্গে ডলার বাজারে স্থিতিশীলতা আনতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিত নজরদারি করছে। এসব মিলিয়েই রিজার্ভে ধীরে ধীরে ইতিবাচক অবস্থান তৈরি হচ্ছে।
তবে রিজার্ভ বৃদ্ধির এই ক্ষুদ্র অগ্রগতি দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে আরও কিছু নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, আমদানি নিয়ন্ত্রণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতির জন্য ভালো নয়। বরং রপ্তানি খাতের বৈচিত্র্যকরণ, প্রবাসী আয়ের প্রবাহ আরও সহজ করা, বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাতে প্রণোদনা বৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং নতুন শ্রমবাজার খুঁজে বের করার দিকে আরও মনোযোগ দেওয়া উচিত।
বাস্তবে সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনৈতিক সূচকের হিসাব-নিকাশের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাজারের স্থিতিশীলতা। রিজার্ভের উন্নতি পণ্যের দাম, ডলার বাজার, ব্যাংকিং লেনদেন এবং আমদানিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে জনজীবনে কিছুটা স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। এরই মধ্যে অনেক ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, এলসি খোলার প্রক্রিয়া আগের তুলনায় কিছুটা সহজ হয়েছে। ডলারের বাজারেও অস্থিরতা কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেছেন, রিজার্ভের এই সামান্য উন্নতি অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সবসময়ই বৈদেশিক লেনদেন পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজনীয় নীতি প্রয়োগ করে যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সামনে রিজার্ভ আরও শক্তিশালী অবস্থানে যাবে।
অর্থনীতির এই বাস্তবতা সাধারণ মানুষের কাছে অনেক সময় জটিল মনে হলেও এর প্রভাব প্রত্যেকের জীবনেই প্রতিফলিত হয়। রিজার্ভ বৃদ্ধি মানে দেশের বৈদেশিক লেনদেনে আস্থা ফিরে আসা, আমদানি স্বাভাবিক হওয়া, পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। এ কারণেই একটি দেশের রিজার্ভকে কেন্দ্র করে উদ্বেগ বা আশার সৃষ্টি হয়।
সময়ের সঙ্গে যদি রিজার্ভের এই উন্নতি অব্যাহত থাকে, তবে অর্থনীতি আবারও ঘুরে দাঁড়ানোর আশা জাগতে পারে। তবে এখনই বড় কোনো প্রত্যাশা তৈরি না করে সতর্কতা ও দূরদর্শিতা নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়াই হবে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। অর্থনীতির পুনরুদ্ধার শুধু সংখ্যার বিষয় নয়; এটি দেশের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা, মানুষের আস্থা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করার সার্বিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
বাংলাদেশ ব্যাংক যে দিকনির্দেশনা দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে তারা রিজার্ভ পরিস্থিতি নিয়ে সম্পূর্ণ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সময়মতো নীতির পরিবর্তন, স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া হলে অর্থনীতি দ্রুত পুনরুদ্ধার হতে পারে। দেশের সাধারণ মানুষও আশা করছে, রিজার্ভে এই সামান্য অগ্রগতি সামনে আরও ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে এবং জীবনযাত্রায় স্থিতিশীলতা ফিরবে।