যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর মাদক কার্টেল লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে: ট্রাম্প

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোর মাদক কার্টেল লক্ষ্য করে হামলা চালাতে পারে: ট্রাম্প

প্রকাশ: ১৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও ল্যাটিন আমেরিকার মাদক কার্টেলকে কেন্দ্র করে উত্তেজনাপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক হামলার পর এবার মেক্সিকোতেও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে হামলা চালানো হতে পারে। তবে মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউডিয়া শেইনবাম ইতিমধ্যেই স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, তার দেশের ভেতরে কোনো বিদেশি হামলাকে তিনি সমর্থন করবেন না এবং কোনো ধরনের বাহ্যিক হস্তক্ষেপ বরদাস্ত করা হবে না।

সোমবার (১৭ নভেম্বর) ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “মাদকপাচার ঠেকাতে মেক্সিকোতে হামলার বিষয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আমি মেক্সিকোর সঙ্গে কথা বলেছি—তারা জানে আমি কী ভাবছি।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রে মাদকের কারণে লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন প্রভাবিত হচ্ছে এবং মৃত্যুর মুখোমুখি হচ্ছে। নৌপথে মাদক পরিবহন আটকানো সম্ভব হলেও, অন্য রুটগুলো এখনো সক্রিয় এবং এই সমস্যা মোকাবিলার জন্য কড়া পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।

যদিও ট্রাম্প স্পষ্টভাবে বলেননি কখন বা কীভাবে এই ধরনের হামলা চালানো হতে পারে, কিন্তু তিনি এই বিষয়ে দৃঢ় সঙ্কল্পের ইঙ্গিত দিয়েছেন। অন্যদিকে, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট শেইনবাম জানান, তার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য বিদেশি হামলার কোনো অনুমতি দেওয়া হবে না।

অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাটিন আমেরিকান স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক জেফ গারমানি বলেন, “মেক্সিকোর আপত্তি ট্রাম্পের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নাও হতে পারে। আন্তর্জাতিক আইন এবং কূটনৈতিক প্রোটোকল ট্রাম্প সাধারণত মানেন না। তিনি চাইলে মেক্সিকোর অনুমতি ছাড়াই সামরিক অভিযান চালাতে পারেন।”

দুই সপ্তাহ আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি জানিয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্র মেক্সিকোতে যৌথ গোয়েন্দা অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করছে। এই অভিযানে ড্রোন হামলার মাধ্যমে মাদক ল্যাব ও কার্টেল সদস্যদের লক্ষ্য করা হতে পারে। সোমবার ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, “আমরা প্রতিটি রুট, প্রতিটি মাদকসর্দারের ঠিকানা জানি। আমরা জানি কারা মাদকের মাধ্যমে লাখ লাখ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।”

ট্রাম্প এই পরিস্থিতিকে ‘যুদ্ধের মতো’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার দাবি, মাদক কার্টেল কোকেন, হেরোইন, মেথ এবং ফেন্টানিলের মতো নাশক পদার্থের মাধ্যমে লাখ লাখ আমেরিকানকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তিনি মনে করেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে শক্ত পদক্ষেপ নিতে হবে।

বিশেষজ্ঞ জেফ গারমানি মনে করেন, মেক্সিকোর কার্টেলগুলো বিশ্বের সবচেয়ে সংগঠিত ও শক্তিশালী অপরাধচক্র। তাদের বিরুদ্ধে সীমিত সামরিক হামলা মূলত একটি ‘পাবলিক রিলেশনস স্টান্ট’ ছাড়া কিছুই হবে না। তিনি উল্লেখ করেন, গত ২০ বছর ধরে মেক্সিকো নিজেই মাদকবিরোধী যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে এবং কার্টেলগুলো এখনো শক্ত অবস্থানে।

ট্রাম্প প্রশাসনের চলমান নীতি অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে তিনি নির্বাহী আদেশ এবং আইনি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কংগ্রেস ছাড়াই সামরিক অভিযান চালানোর পথ তৈরি করেছেন। ছয়টি মাদক কার্টেলকে ‘বিদেশি সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং এই ঘাটতি ব্যবহার করে অভিযানকে জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তিতে বৈধতা দিচ্ছেন।

যাহোক, এই ধরনের অভিযান নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে বিভিন্ন জাহাজে অতর্কিত হামলা ন্যায়সঙ্গত নয় এবং এগুলো মানবতাবিরোধী হত্যাকাণ্ডের শামিল হতে পারে। সংস্থাগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার নামে অযথা বেসামরিক লোকের ওপর আঘাত প্রয়োগ করা অনৈতিক।

হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর থেকে ক্যারিবীয় এবং প্রশান্ত মহাসাগরে অন্তত ২০টি হামলা চালানো হয়েছে, যার ফলে ৮০ জনেরও বেশি নিহত হয়েছেন। যদিও প্রশাসন এই হামলাগুলোকে মাদক কার্টেলের সঙ্গে যুক্ত করেছে, কিন্তু এখনও প্রকাশ্য প্রমাণ দেখাতে পারেনি।

মেক্সিকোর সরকারি কর্মকর্তারা ইতিমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছেন। তারা বলেছেন, যেকোনো হস্তক্ষেপ দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্য হুমকি স্বরূপ হতে পারে। তবে ট্রাম্প প্রশাসন স্পষ্ট করে জানিয়ে দিয়েছে, মাদক কার্টেলের বিরুদ্ধে কোনও আপস করা হবে না এবং প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য অভিযান শুধু ল্যাটিন আমেরিকার নিরাপত্তার জন্য নয়, বিশ্বব্যাপী মাদকপাচারের চেইনে প্রভাব ফেলতে পারে। তবে এর ফলে স্থানীয় জনগণের জীবন, মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক সম্পর্কের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

এই পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিশেষ উদ্বেগ তৈরি করেছে। ল্যাটিন আমেরিকার বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি মেক্সিকোর অনুমতি ছাড়া হামলা চালায়, তবে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে এবং এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। বিশেষ করে, মাদক কার্টেলের সঙ্গে যুক্ত সাধারণ মানুষদের ওপর যে প্রভাব পড়বে, তা নিয়েও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্কতা জারি করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকোর মধ্যে এই উত্তেজনা কেবল রাজনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব অর্থনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী এলাকা এবং মাদক কার্টেলের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চলগুলোতে সম্ভাব্য সংঘাত গভীর মানবিক সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

এভাবে, ট্রাম্পের মন্তব্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য পদক্ষেপ শুধু ল্যাটিন আমেরিকার নয়, সমগ্র আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মেক্সিকো সরকার ইতিমধ্যেই কূটনৈতিক চ্যানেল ব্যবহার করে এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন এক উত্তেজনার সূচনা করেছে।

মোটের উপর, যুক্তরাষ্ট্রের এই সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা, মাদক কার্টেলের সঙ্গে লড়াই এবং মেক্সিকোর প্রতিক্রিয়া, আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রে একটি জটিল ও সংবেদনশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে সাম্প্রতিক সময়ে ল্যাটিন আমেরিকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মনোযোগ আরও কেন্দ্রীভূত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত