প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
নিউ ইয়র্ক সিটির নবনির্বাচিত মেয়র জোহরান মামদানি এই সপ্তাহে আবারও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যদি নিউ ইয়র্ক শহরে প্রবেশ করেন, তবে তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) কর্তৃক জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা মানবেন। এ ঘোষণা তার নির্বাচনের পূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতির পুনর্ব্যক্তি হিসেবে এসেছে, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের নজর কাড়েছে।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঠিক এই সময়ে বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামস নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় তাকে মামদানির অভিষেক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। মামদানি এবিসি৭-এ সরাসরি সম্প্রচারে নিউ ইয়র্ক সিটিকে ‘আন্তর্জাতিক আইনের শহর’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শহরটি আইসিসির ২০২৪ সালের গ্রেফতারি পরোয়ানা—যেখানে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে বেসামরিক লোকদের ওপর ইচ্ছাকৃত হামলা এবং যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে অনাহার ব্যবহারের অভিযোগ আনা হয়েছে—সম্মান করবে।
মামদানি বলেন, “আমি বারবার বলেছি, এটি আন্তর্জাতিক আইনের শহর। আর আন্তর্জাতিক আইনের শহর বলতে আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করা বোঝায়। এর মানে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানা রক্ষা করা তা সে নেতানিয়াহু হোক বা ভ্লাদিমির পুতিন।” তিনি আরও বলেন, “নিউ ইয়র্কবাসী যা চায় তা হলো আমাদের মূল্যবোধের ধারাবাহিকতা এবং তার বাস্তবায়ন। তাই আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের এই গ্রেফতারি পরোয়ানাগুলো সম্পূর্ণভাবে পরীক্ষা করা এবং বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য সব আইনি সম্ভাবনা খুঁজে দেখা জরুরি।”
নির্বাচিত হওয়ার আগে অক্টোবর মাসে ফক্স নিউজের ‘দ্য স্টোরি’ অনুষ্ঠানে মামদানি মার্থা ম্যাকক্যালামের কাছে বলেছিলেন, আইনি সুযোগ পেলে তিনি নেতানিয়াহুকে গ্রেফতার করবেন, কারণ নিউ ইয়র্ক ‘এ ধরনের নীতিকে সমুন্নত রাখতে চায়।’ তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, তিনি নতুন কোনো আইন তৈরি করবেন না এবং বিদ্যমান আইনের সীমার মধ্যে থেকে কাজ করবেন। “ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো আমি নিরক্ষর নই। আমি সব আইনি সম্ভাবনা ব্যবহার করব, কিন্তু নিজস্ব আইন তৈরি করব না।”
মামদানি স্বীকার করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্র আইসিসি চুক্তির স্বাক্ষরকারী নয়, তবে শহরটির উচিত আইসিসির গ্রেফতারি পরোয়ানা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা, যতক্ষণ তা দেশের বিদ্যমান সব আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমরা আন্তর্জাতিক শহর, তাই আন্তর্জাতিক দায়িত্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা অপরিহার্য।”
বিদায়ী মেয়র এরিক অ্যাডামস এই সময়ই নেতানিয়াহুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ইজরায়েল হায়োম-এ সাক্ষাৎকারে অ্যাডামস বলেন, “আমি বিশ্বাস করি প্রধানমন্ত্রীকে এই শহরে আসা উচিত। মামদানির অভিষেক অনুষ্ঠানে সিটি কাউন্সিলের সামনে ১ জানুয়ারি উপস্থিত হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বৃহত্তম ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য শক্তিশালী বার্তা দেবেন।”
এবিসি৭-এ সাক্ষাৎকারে মামদানি নিউ ইয়র্কের ইহুদি সম্প্রদায়কে সুরক্ষা ও সমর্থনের প্রতিশ্রুতিও পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, “ইহুদি নিউ ইয়র্কবাসীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং তাদের উদ্যাপন ও সম্মান করা আমার দায়িত্ব, যা আমি পালন করব।”
মামদানির এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ইতিমধ্যেই উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি কেবল নিউ ইয়র্ক বা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীন রাজনীতির জন্য নয়, বরং ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এই পদক্ষেপ আইনি ও নীতিগতভাবে একটি পরীক্ষণ হতে পারে যে, কোনো দেশের স্থানীয় প্রশাসন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের গ্রেফতারি পরোয়ানার প্রতি কতটুকু আনুগত্য দেখাতে পারে, যদিও কেন্দ্রীয় সরকার সেই চুক্তির অংশ নয়।
মামদানির অভিষেক অনুষ্ঠানের পর তিনি নিউ ইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম এবং দক্ষিণ এশীয় মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। তার ঘোষণা, যা আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্ব বহন করে, তা নিউ ইয়র্ককে একটি বৈশ্বিক নীতি-প্রণয়নকারী শহরের মর্যাদা প্রদান করবে।
মামদানির বক্তব্য স্পষ্ট: আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আনুগত্য এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ—এই দুটি বিষয় তিনি সমানভাবে গুরুত্ব দেবেন। নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আইসিসি গ্রেফতারি পরোয়ানার বাস্তবায়ন কেবল আইনি দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক দিকনির্দেশও বটে। নিউ ইয়র্কের জন্য এটি একটি পরীক্ষণমূলক পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক পর্যায়েও নজর কাড়ছে।
এই রায় এবং মামদানির প্রতিশ্রুতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরে এসেছে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ও মানবাধিকার সংস্থার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে। শহরবাসীর জন্য এটি একটি সংকেত যে, নিউ ইয়র্কের প্রশাসন আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার বিষয়ক নীতির সঙ্গে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।