প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গাজার পুনর্নির্মাণ ও শান্তি ফেরানোর নামে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে সম্প্রতি পাশ হওয়া আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী (আইএসএফ) প্রস্তাবকে রাশিয়া ‘উপনিবেশিক যুগের চিন্তাভাবনার প্রতিফলন’ হিসেবে অভিহিত করেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে উত্থাপিত এই পরিকল্পনা গাজায় শান্তি ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষার আশ্বাস দেয়ার কথা থাকলেও রাশিয়া এবং চীন ভোটদান থেকে বিরত থাকায় এটি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে।
১৭ নভেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে ভোটাভুটির সময় প্রস্তাবটির পক্ষে ১৩টি দেশ ভোট দেয়। কোনো দেশ বিপক্ষে না থাকায় এটি সহজেই পাশ হয়ে যায়, তবে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত ভাসিলি নেবেনজিয়া ভোটদানে অংশগ্রহণ না করে, সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেন। তিনি বলেন, প্রস্তাবটিতে স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের মতামত পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। তিনি আরও সতর্ক করেন, “এই দলিল যেন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো অজুহাত হয়ে না দাঁড়ায়। ইসরায়েল ও অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে তাদের যে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে, সেই পরিস্থিতিতে এটি যেন বাহিনীকে যুদ্ধপ্রবণ করে তোলে।”
নেবেনজিয়া বলেন, নতুন বাহিনীটি যতটা না শান্তি রক্ষাকারী হিসেবে কার্যকর হবে, তার চেয়ে বেশি এটি যুদ্ধপ্রবণ দল হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। তিনি নিরাপত্তা পরিষদকে জানান, প্রস্তাব অনুযায়ী আইএসএফ কীভাবে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে, তা স্পষ্ট নয়। প্রকৃতপক্ষে, নতুন বাহিনী রামাল্লার অবস্থান বা মতামতকে পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে স্বায়ত্তশাসিতভাবে কাজ করবে বলে মনে হচ্ছে।
নতুন বাহিনীর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, কাতার ও মিসর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। যদিও এর উদ্দেশ্য হিসেবে গাজার পুনর্নির্মাণ এবং নিরাপত্তা রক্ষা উল্লেখ করা হয়েছে, বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি আঞ্চলিক রাজনৈতিক ভারসাম্যকে প্রভাবিত করতে পারে। বিশেষ করে গাজার ভেতরের রাজনৈতিক দলগুলোর স্বতন্ত্র নীতি এবং তাদের নিরাপত্তা সংক্রান্ত অবস্থানকে উপেক্ষা করে বাহিনী কার্যকর হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভোটাভুটির পর এটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে উদযাপন করেছেন। তিনি তার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, “এটি কেবল শুরু, আরও উত্তেজনাপূর্ণ ঘোষণা সামনে আসছে।” তবে ট্রাম্পের এই আশ্বাসকে ফিলিস্তিনি সংগঠন হামাস প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা এটিকে চাপিয়ে দেওয়া ‘আন্তর্জাতিক অভিভাবকত্ব ব্যবস্থা’ হিসেবে অভিহিত করে বলে জানিয়েছে যে, তারা কখনোই অস্ত্র ত্যাগ করবে না।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছে যে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতার অধিকার, যুদ্ধাপরাধের দায়বদ্ধতা এবং ক্ষতিপূরণের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে উপেক্ষা করছে। তাদের মতে, আইএসএফ বাহিনী যদি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যৌথভাবে কার্যকর না হয়, তাহলে এটি শুধু নিরাপত্তা বাহিনী হিসেবে নয়, রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করার হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হতে পারে।
রাশিয়ার সতর্কবার্তা এ প্রস্তাবকে আন্তর্জাতিক নীতির মানদণ্ডের দিক থেকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। নেবেনজিয়ার মতে, “এই পরিকল্পনা উপনিবেশিক যুগের চিন্তাভাবনার মতো, যেখানে স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হতো না। গাজার বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি প্রয়োগ করা হলে ফিলিস্তিনিদের স্বতন্ত্র অধিকার ক্ষুণ্ণ হবে।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, আইএসএফ বাহিনীর কার্যক্রম কেবল গাজার পুনর্নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকবেনা, বরং অঞ্চলটির রাজনৈতিক ভারসাম্য এবং ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতের গতিপথকেও প্রভাবিত করবে। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, কাতার ও মিসরের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ এই বাহিনীকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। তবে এই অংশগ্রহণ স্বতন্ত্র নীতির কারণে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথেষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে।
মার্কিন পরিকল্পনার সমালোচকরা বলছেন, গাজার রাজনৈতিক ও মানবিক পরিস্থিতি এমনিতেই চরম সংকটাপন্ন। সেখানে আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েন করা হলে তা স্থানীয় জনগণের আস্থাকে প্রভাবিত করতে পারে এবং অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে। এছাড়া বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থাকায় অঞ্চলটি রাজনৈতিকভাবে আরও সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে।
ফিলিস্তিনি জনগণ, বিশেষ করে গাজার অভ্যন্তরীণ বাসিন্দারা, নতুন এই বাহিনীকে স্বাগত জানাচ্ছেন না। তাদের মতে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী স্থানীয় সমস্যা সমাধানের জন্য যথাযথ সমাধান নয়, বরং এটি ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রগুলোর কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। মানবাধিকার সংস্থা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই পরিস্থিতি তীব্রভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, কারণ এই বাহিনী কার্যকর হলে আন্তর্জাতিক ন্যায় এবং স্থায়ী শান্তি বাস্তবায়নের পথে বড় চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হবে।
বিশ্ব রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে এই ইস্যুতে রাশিয়ার সতর্কবার্তা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এটি শুধু গাজার জন্য নয়, মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। নেবেনজিয়ার বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা একপেশে এবং স্থানীয় জনগণের স্বার্থকে উপেক্ষা করে কার্যকর হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।
এছাড়া, নিরাপত্তা পরিষদে চীনের বিরতি এবং রাশিয়ার সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এই বাহিনীর কার্যকারিতা ও বৈধতা নিয়ে সন্দেহ বাড়িয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, গাজায় শান্তি রক্ষার নামে গঠিত এই বাহিনী যদি স্থানীয় জনগণের মতামতকে অন্তর্ভুক্ত না করে কার্যকর হয়, তাহলে এটি কেবল রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি করবে এবং মানবিক সংকট আরও গভীর করবে।
গাজার পুনর্নির্মাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী কার্যকর হোক বা না হোক, স্পষ্ট হলো যে, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক নীতির মধ্যে ভারসাম্য না থাকলে এই উদ্যোগ সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। রাশিয়ার সতর্কবার্তা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতিক্রিয়া আন্তর্জাতিক মহলকে মনে করিয়ে দিচ্ছে, যে কোনো পদক্ষেপের মানবিক ও রাজনৈতিক প্রভাব সমানভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।