এফ-৩৫ কেনায় আগ্রহী সৌদি আরব: আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ১৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৪ বার
এফ-৩৫ কেনায় আগ্রহী সৌদি আরব: আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন সমীকরণ

প্রকাশ: ১৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের মধ্যে সাম্প্রতিক প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটনে সৌদি যুবরাজের সফরের সময় যুক্তরাষ্ট্র ভবিষ্যতে সৌদি আরবকে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান সরবরাহে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে। বহু বছর ধরে এই বিমানটি শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশগুলো পেয়ে এসেছে। তাই রিয়াদকে এফ-৩৫ বিক্রি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাড়ছে নানা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।

এফ-৩৫ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমান বিশ্বের অন্যতম উন্নত ও প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক প্ল্যাটফর্ম। এটি পঞ্চম প্রজন্মের এক আসনবিশিষ্ট ও এক ইঞ্জিনচালিত মাল্টি-রোল স্টেলথ ফাইটার, যা একই সঙ্গে আকাশে প্রাধান্য বিস্তার, দূরপাল্লার আঘাত, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, নজরদারি এবং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে সক্ষম। এর স্টেলথ বৈশিষ্ট্য এতটাই উন্নত যে শত্রুর রাডারে ধরা পড়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। বিমানটিতে থাকা ৩৬০-ডিগ্রি ক্যামেরা স্যুট ও উন্নত সেন্সর ব্যবস্থা সরাসরি পাইলটের কাছে তথ্য পাঠায়, যা বাস্তবসম্মত পরিস্থিতি মূল্যায়নে অন্য সব বিমানকে পেছনে ফেলে। নির্মাতা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন এফ-৩৫-কে বিশ্বের “সবচেয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধবিমান” বলে বর্ণনা করে থাকে।

সৌদি আরব বহুদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ অস্ত্রগ্রাহক দেশ। রিয়াদ তার বিমান বাহিনীকে আধুনিক করে তুলতে এবং মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্যে এগিয়ে থাকতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। ফলে পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান কেনার আগ্রহ সেই পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশটি গত কয়েক দশকে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে, যেখানে বিমান শক্তির ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও বর্তমানে সংঘাত অপেক্ষাকৃত শান্ত, তবে অস্থির অঞ্চলে ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে পারে—এমন বাস্তবতা মাথায় রেখেই সৌদি আরব তার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে চায়।

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি সৌদির জন্য রাজনৈতিকভাবেও তাৎপর্যপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে নতুন কূটনৈতিক বিন্যাসের আলোচনার মধ্যে এফ-৩৫ কেনার অনুমতি রিয়াদের অবস্থানকে অনেকটাই শক্তিশালী করবে। বিশেষত, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি-ইরান সম্পর্কের উন্নতি হলেও আঞ্চলিক প্রতিযোগিতা এখনো পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। তাছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদির সম্ভাব্য সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, এই চুক্তিকে অনেকে সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ বলেও মনে করছেন।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে এ নিয়ে কিছু দ্বিধা-উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। স্টেলথ প্রযুক্তি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় পেন্টাগনের কিছু বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন, সৌদির সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে বিমানটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। যদিও সৌদি আরব বারবার জানিয়েছে যে তাদের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও সুরক্ষিত, তবুও যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহলে আপত্তি রয়ে গেছে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তির ভারসাম্য নতুন করে রূপ নেবে কি না, সেটিও এখন আলোচনার কেন্দ্রে। ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে অঞ্চলে একমাত্র দেশ হিসেবে এফ-৩৫ ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে এসেছে। সৌদি আরব একই সক্ষমতা অর্জন করলে আঞ্চলিক নিরাপত্তা হিসাব বদলে যেতে পারে বলে অনেক বিশ্লেষকের মত। সেই কারণে যুক্তরাষ্ট্রও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে।

সৌদি আরবের সামরিক আধুনিকায়নের এই প্রক্রিয়া শুধু প্রতিরক্ষা খাতে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার অংশ। তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে সরে গিয়ে নতুন বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণ, আঞ্চলিক নেতৃত্ব বজায় রাখা এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক তৈরি—এমন বিস্তৃত পরিকল্পনার সঙ্গে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি জড়িত। ফলে এফ-৩৫ কেনার সিদ্ধান্ত আধুনিক সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে পারে।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রও এই চুক্তির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে তার কৌশলগত অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চাইছে। চীন ও রাশিয়ার বাড়তি প্রভাব ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র তার ঐতিহ্যগত মিত্রদের সঙ্গে আবারো ঘনিষ্ঠ হতে চাইছে। আর সৌদি আরবের মতো গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ব বাড়ানো সেই বৃহত্তর কূটনৈতিক ও সামরিক কৌশলের অংশ।

শেষ পর্যন্ত এফ-৩৫ সংক্রান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হলে, এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক সাম্যাবস্থাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে। তবে এর সঙ্গে রয়েছে টানাপোড়েন, নিরাপত্তা সংশয়, প্রযুক্তিগত ঝুঁকি এবং কূটনৈতিক জটিলতা। একদিকে সৌদি আরব আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় নতুন যুগে প্রবেশ করবে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রকে সামাল দিতে হবে নানা অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সমালোচনা।

ফলে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান কেনার সিদ্ধান্ত শুধু সামরিক উন্নয়ন নয়—এটি এক জটিল কূটনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অধ্যায়ের সূচনা, যা আগামী কয়েক বছর ধরে বিশ্ব রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত