প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইউক্রেনের পশ্চিমাঞ্চলে রাশিয়ার চালানো ভয়াবহ হামলায় অন্তত ২৬ জনের মৃত্যু—এর মধ্যে তিনজন শিশু—আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র স্পষ্ট করে তুলেছে। বুধবার ভোরের নিস্তব্ধতা ভেদ করে বিধ্বংসী বিস্ফোরণের শব্দে কেঁপে ওঠে টার্পোনিল শহর। রাতভর চলা হামলায় আহত হয়েছেন অন্তত ৯৩ জন। যুদ্ধ শুরুর প্রায় তিন বছর পরও এ ধরনের প্রাণঘাতী হামলা থামার কোনো লক্ষণ নেই। বরং নতুন মাত্রায় সহিংসতার বিস্তার ইউক্রেনের সাধারণ মানুষের জীবনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়া শুধু টার্পোনিলেই নয়, পশ্চিমাঞ্চলের লভিভ, ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্ক এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় খারকিভ অঞ্চলেও একযোগে আঘাত হেনেছে। একের পর এক বিস্ফোরণে ভবনগুলো দুলে ওঠে, আগুন ছড়িয়ে পড়ে বহু এলাকায়। বিশেষ করে খারকিভের তিনটি জেলায় ড্রোন হামলায় আহত হয়েছেন ৩০ জনেরও বেশি মানুষ। হামলার মাত্রা ও বিস্তৃতি যুদ্ধের নতুন পর্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ইউক্রেনের বিমান বাহিনী জানিয়েছে, রাশিয়ার নিক্ষেপ করা এক্স-১০১ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র সরাসরি টার্গেট করে আবাসিক ফ্ল্যাটে আঘাত হানে। সাধারণ বেসামরিক মানুষের ঘুম ভাঙার আগেই সেই বহুতল ভবন এক চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। ভোরের আলো ফোটার আগে থেকেই উদ্ধারকর্মীরা হাতুড়ি, বেলচা আর খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরাতে শুরু করেন। ধসে পড়া দেয়ালের ফাঁক দিয়ে ভেসে আসছিল আহত মানুষের আর্তচিৎকার। অনেকে সন্তানকে খুঁজে পাচ্ছিলেন না, কেউ আবার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের খোঁজে মরিয়া হয়ে ধ্বংসস্তূপের এক কোণ থেকে আরেক কোণে ছুটছিলেন।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি হামলাকে “অমানবিক ও অন্ধকার রাতের প্রতিচ্ছবি” উল্লেখ করে বলেছেন, টার্পোনিলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ঘটেছে। বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়েছেন এবং উদ্ধার তৎপরতা চলছে। তাঁর দাবি, রাশিয়া এ হামলায় ৪৭০টির বেশি ড্রোন ও ৪৭টির বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে, যা শুধু সামরিক উদ্দেশ্যে নয়, বরং বেসামরিক জনপদকে লক্ষ্য করে ইচ্ছাকৃতভাবে পরিচালিত হয়েছে।
লভিভ ও ইভানো-ফ্রাঙ্কিভস্কেও একই ধরনের দৃশ্য দেখা গেছে। শান্ত ও পর্যটকপ্রিয় লভিভ শহরে আগুনের লেলিহান শিখা রাতের অন্ধকারে লম্বা দাগ টেনে দেয়। শহরের অনেক অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, থেমে যায় ট্রাম চলাচল, হাসপাতালের জেনারেটরে নির্ভর করতে হয় ডাক্তারদের। স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, আবাসিক ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং একটি শিশু চিকিৎসাকেন্দ্রের আশেপাশেও আঘাত হানায় সাধারণ মানুষের আতঙ্ক আরও বেড়ে গেছে।
এদিকে খারকিভে ড্রোন হামলায় আহতদের বেশিরভাগই সাধারণ পথচারী। কেউ বাজারে যাচ্ছিলেন, কেউবা অফিসের উদ্দেশে ঠিক বেরোতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে তাদের জীবনজুড়ে নেমে আসে বিভীষিকার ছাপ। স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, হামলার শব্দে শিশুরা ঘুম থেকে চিৎকার করে উঠে পড়ে। অনেক পরিবার নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে রাতেই বাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
ইউক্রেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে সমন্বিত এ হামলা যুদ্ধের কৌশলগত দিক থেকেও সন্দেহের জন্ম দিচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া নতুন করে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে এমন অঞ্চলগুলোতে, যেগুলো এ পর্যন্ত তুলনামূলকভাবে কম আক্রমণের মুখে ছিল। এর ফলে পশ্চিম ইউক্রেনের জনগণ, যারা পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের মতো দীর্ঘদিন যুদ্ধের প্রভাব ভোগ করেনি, তারাও এখন সরাসরি হামলার শিকার হচ্ছেন। ক্রমবর্ধমান হামলা দেশটিকে আরও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ইউক্রেন সরকার জানিয়েছে, হামলা মোকাবিলা ও উদ্ধার তৎপরতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী ও জরুরি সেবা বিভাগ দিনভর ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধারে কাজ করে যাচ্ছে। রেলস্টেশন, স্কুল ও সরকারি ভবনগুলোতে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। আশেপাশের শহরগুলো থেকে চিকিৎসক দল এসে উদ্ধার কার্যক্রমে সহায়তা দিচ্ছেন। হাসপাতালগুলোতে রক্তের ঘাটতি দেখা দেওয়ায় স্থানীয় জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে রক্তদান করছেন।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ এ ধরনের বেসামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলাকে যুদ্ধাপরাধ হিসেবে উল্লেখ করেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন বলেছে, যুদ্ধের তৃতীয় বছরে এসে সাধারণ মানুষের ওপর হামলা আরও উদ্বেগজনক মাত্রা পেয়েছে এবং প্রতিটি ঘটনার স্বাধীন তদন্ত প্রয়োজন। তবে রাশিয়া এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেই হামলা চালিয়েছে, বেসামরিক হতাহতের জন্য ইউক্রেনকেই দায়ী করেছে।
তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। টার্পোনিলের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে কান্নারত এক বৃদ্ধা বলেন, তাঁর ছেলে, পুত্রবধূ এবং দুই নাতি একই সঙ্গে হামলার শিকার হয়েছেন। পরিবারের চার সদস্যের মধ্যে তিনজন ঘটনাস্থলেই মারা গেছেন, আরেকজন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। এই এক পরিবারের ট্র্যাজেডি যেন পুরো ইউক্রেনের গল্প—একটি যুদ্ধ যা থামছে না, আর যার মুখোমুখি হচ্ছে প্রতিদিনের সাধারণ মানুষ।
ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোও বড় ক্ষতির মুখে পড়েছে। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শীতের এই শুরুতে মানুষকে ঠাণ্ডায় কষ্ট সহ্য করতে হচ্ছে। রাস্তায় আলো না থাকায় নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি বেড়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও এর প্রভাব পড়েছে ব্যাপকভাবে। দোকানপাট খুলতে পারছে না, ব্যাংকিং কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে, যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ছে।
যুদ্ধের প্রভাব এখন শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। বাচ্চারা স্কুলে যেতে পারছে না, হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ, পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে, আর মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়ছে পরবর্তী দিনগুলো আরও ভয়াবহ হতে পারে ভেবে। রাশিয়ার ক্রমাগত চাপ এবং ইউক্রেনের প্রতিরোধের মধ্যে এই সংঘাত যেন আরও গভীর আকার ধারণ করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের হামলা যুদ্ধের মোড় ঘোরাবে না বরং মানবিক বিপর্যয়কে আরও জটিল করে তুলবে। দুই পক্ষের লড়াই চলমান থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক মহল যে একটি স্থায়ী সমাধানের দিকে এগোতে চায়, তার তেমন কোনো দেখা মিলছে না। বরং প্রতিটি নতুন হামলা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
টার্পোনিলসহ বিভিন্ন অঞ্চলে হামলার পর ইউক্রেনজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রীয়ভাবে শোক দিবস পালনেরও প্রস্তুতি চলছে। শহরের চারদিকে লম্বা কিউ দেখা গেছে হাসপাতালে আহতদের খোঁজে মানুষের ভিড়ে। অস্থায়ী মরচুয়ারি কক্ষগুলোতে স্বজনদের ভিড়, কেউ হতাশ হয়ে মাটিতে বসে পড়ছেন, কেউ মৃতদেহ শনাক্ত করে কান্নায় ভেঙে পড়ছেন।
যুদ্ধের তৃতীয় বছরে এসে এই হামলা ইউক্রেনের জন্য এক নিষ্ঠুর বাস্তবতা তুলে ধরেছে—মানুষের জীবন এখানে শুধু একটি সংখ্যা নয়, প্রতিটি মৃত্যু একটি পরিবারের স্বপ্নের অবসান, ভবিষ্যতের ধ্বংস আর দেশজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ব্যথার আরেকটি নতুন অধ্যায়। রাশিয়ার হামলা থেমে না থাকলে এই ব্যথার ধারাবাহিকতা হয়তো সামনের দিনগুলোতে আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
একদিকে ইউক্রেন প্রতিরোধের শপথ পুনর্ব্যক্ত করছে, অন্যদিকে রাশিয়া নিজের সামরিক আগ্রাসন অব্যাহত রাখছে। এই সংঘাতের শেষ কোথায়, তা কেউ জানে না। তবে যে সত্যটি বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে টার্পোনিলের এই হামলা—এ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মূল্য দিচ্ছে সাধারণ মানুষ, যারা কখনো যুদ্ধ চায়নি, তবুও যুদ্ধের বোঝা বইতে বাধ্য হচ্ছে। ইউক্রেনের আজকের এই বেদনাবিধুর চিত্র তাই বিশ্বের কাছে নতুন করে শান্তির ডাক তুলে ধরছে, যেন এ রক্তপাত থামে এবং মানুষ ফিরে পায় স্বাভাবিক জীবনের আশা।