প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
চলমান যুদ্ধবিরতির মধ্যেই ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় নতুন করে তাণ্ডব চালিয়েছে ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। বুধবার ভোরের দিকে গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিস ও গাজা সিটির পূর্বাঞ্চলীয় শুজাইয়া ও জয়তুনে একাধিক ভবনকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়। হামলার কারণে অন্তত ২৮ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ৭৭ জন। নিহতদের মধ্যে কয়েকজন শিশু ও নারীও রয়েছেন। গাজার জনগণ এক বিরাট আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন, কারণ সাম্প্রতিক এই হামলা তাদের জীবন ও নিরাপত্তার ওপর যে বিপুল ঝুঁকি সৃষ্টি করেছে, তা অনস্বীকার্য।
আলজাজিরার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে জানা যায়, খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় একটি আবাসিক ভবনে বিমান হামলার সময় পুরো একটি পরিবার নিহত হয়েছে। বাবা, মা এবং তিন সন্তানসহ পরিবারের সব সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন। স্থানীয়রা জানান, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে অনেক মানুষ এখনও আটকে রয়েছেন এবং উদ্ধারকর্মীরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছেন তাদের উদ্ধার করতে। একাধিক আহতকে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, এই হামলা হামাসের লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত হয়েছে। তাদের দাবি, দক্ষিণ-পূর্ব গাজার খান ইউনিসে কর্মরত ইসরাইলি সেনাদের ওপর হামাসের সদস্যদের গুলি চালানোর পর এই প্রতিশোধমূলক অভিযান চালানো হয়েছে। আইডিএফের বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হামলার সব লক্ষ্যবস্তুই হামাসের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল এবং এই হামলা আন্তর্জাতিক যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গ করেনি। তবে ফিলিস্তিনি পক্ষ এই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। হামাসের মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেন, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে এবং এটি শুধুমাত্র নাগরিকদের ওপর আঘাত হানার উদ্দেশ্যে পরিচালিত হয়েছে।
গাজার রাজধানী ও অন্যান্য এলাকায় হামলার পরপরই আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে। সড়কগুলো ফাঁকা, দোকানপাট বন্ধ, আর মানুষ ছাদের ওপর থেকে নীচের এলাকা লক্ষ্য করে নিরাপত্তা যাচাই করছেন। বোমার বিস্ফোরণ ও আগুনের ফলে শহরের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। হাসপাতালগুলোতে ভিড় বেড়ে গেছে, রক্তদাতা সংকট দেখা দিয়েছে, এবং আহতদের চিকিৎসার জন্য সীমিত সম্পদ দিয়ে চিকিৎসকরা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন। স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে, ফলে শিশুদের পড়াশোনা স্থগিত হয়ে গেছে।
হানিমাহমুদ নামে একজন গাজা প্রতিনিধি বলেন, এই হামলার ফলে ফিলিস্তিনিরা আবারও মনে করছে যে তাদের শান্তি এবং নিরাপত্তা কোনোভাবেই নিশ্চিত নয়। তিনি বলেন, “জীবন যেন সব সময় ঝুঁকির মধ্যে। মানুষ ঘুম থেকে উঠেই আতঙ্কে, তাদের সন্তানদের জন্য চিন্তিত। এখন গাজার মানুষদের চোখে একমাত্র আশা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে মানু্ষিক সহায়তা ও ন্যায্য বিচার।”
ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী অবশ্য জানিয়েছে, এই অভিযান গাজার খান ইউনিস ও গাজা সিটিতে হামাসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মোট পাঁচটি লক্ষ্যবস্তুতে পরিচালিত হয়েছে। আইডিএফ বলেছে, তারা ভবিষ্যতেও এমন হামলা চালাতে প্রস্তুত থাকবে, যদি দেশের নিরাপত্তার জন্য এটি প্রয়োজন হয়। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইসরাইলের জন্য হুমকি হিসেবে দাঁড়ানো যেকোনো গোষ্ঠী বা কর্মকাণ্ড প্রতিরক্ষা বাহিনী ধ্বংস করবে।
তবে গাজার সাধারণ মানুষ এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁরা মনে করেন, হামলার মধ্যে সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে অসহায় বেসামরিক জনগণ, যারা রাজনৈতিক সংঘাতের অংশ নয়, তবুও রাশিয়ার মতো নির্দয়তার মুখোমুখি হচ্ছে। একাধিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এই হামলাকে যুদ্ধবিরতির অমান্য ও বেসামরিক জনগণের ওপর অযাচিত সহিংসতা হিসেবে নিন্দা জানিয়েছে।
এছাড়া, স্থানীয় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রতিনিয়ত বোমার বিস্ফোরণ ও আগুনের ফলে হাসপাতালে বিপুল চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। আহতদের মধ্যে অনেকের অবস্থা মারাত্মক, এবং বেশ কিছু পরিবার এখনো ধ্বংসস্তূপ থেকে তাদের প্রিয়জনের সন্ধান করছে। আহতদের জন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
এই হামলার প্রেক্ষিতে গাজা উপত্যকায় মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় নগরাঞ্চলের মানুষকে প্রতিদিনের জীবনে বহুমুখী সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। বাজার, দোকানপাট ও অন্যান্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও বন্ধ থাকায় মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় শূন্যে নেমে এসেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা ক্রমেই ভেঙে পড়ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরাইলের এমন হঠাৎ হামলা শুধু যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনের জনগণের ওপর মানসিক ও সামাজিক চাপ তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের তৎপরতা এবং মানবাধিকার সংস্থার তত্ত্বাবধানে এই হামলার তদন্ত করা অত্যন্ত জরুরি, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলার পুনরাবৃত্তি রোধ করা যায়।
গাজার প্রতিটি কোণে সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে। শিশুদের খেলাধুলা, স্কুলে যাওয়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো—এ সবই এখন আর নিরাপদ নয়। হাসপাতালগুলো ও উদ্ধারকেন্দ্রগুলো মানুষে পরিপূর্ণ। আহতদের চিকিৎসা এবং মৃতদের সৎকারের জন্য স্থানীয় জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন।
ফিলিস্তিনের জনগণ পুনরায় এক শোক ও আতঙ্কের ছায়ায় দিন কাটাচ্ছে। তারা জানে, যুদ্ধবিরতির মধ্যে এমন হামলা একদিকে শান্তির স্বপ্নকে অমর্যাদাকরভাবে ভেঙে দিচ্ছে, অন্যদিকে নিরাপদ জীবনের ওপর গভীর শঙ্কা তৈরি করছে। তবে মানুষের আশা এখনও জীবিত—শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে, নিরাপত্তা ফিরবে, এবং দারিদ্র্য ও ভয় দূর হবে—এই প্রত্যাশায় তারা প্রতিদিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।
গাজা উপত্যকায় এই বিমান হামলা মানবিক সংকটকে আরও তীব্র করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করা এবং যুদ্ধবিরতির শর্তাবলী মান্য করার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তিপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা ছাড়া এ অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা কখনো সম্ভব নয়।