মঙ্গলের অলিম্পাস মন্স: সৌরজগতের বিশাল আগ্নেয়গিরি

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৪ বার
মঙ্গলের অলিম্পাস মন্স: সৌরজগতের বিশাল আগ্নেয়গিরি

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

মঙ্গল গ্রহ, যার লালচে আভা সৌরজগতের এক রহস্যময় সৌন্দর্য উপস্থাপন করে, মানবজ্ঞানকে চ্যালেঞ্জ দেয় এমন অজানা ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যে পূর্ণ। তার মধ্যে অন্যতম হল অলিম্পাস মন্স—একটি দৈত্যাকার আগ্নেয়গিরি, যা পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতগুলোর চেয়ে বহুগুণ বড়। সম্প্রতি ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ইএসএ) মঙ্গলের এই বিশাল আগ্নেয়গিরির পাদদেশের নতুন ছবি প্রকাশ করেছে, যা বিজ্ঞানীদের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি করেছে।

অলিম্পাস মন্স প্রায় ২৭ কিলোমিটার উঁচু এবং এর ভিত্তি ৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত। এটি শুধু মঙ্গলের নয়, বরং পুরো সৌরজগতের বৃহত্তম আগ্নেয়গিরি হিসাবেও স্বীকৃত। এই আগ্নেয়গিরিটি ১৯৭১ সালে নাসার মেরিনার ৯ মহাকাশযান দ্বারা প্রথম আবিষ্কৃত হয়। ইএসএ-এর সম্প্রতি প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, আগ্নেয়গিরি থেকে প্রবাহিত লাভা কঠিন শিলা হয়ে জমে রয়েছে। গবেষকরা ধারণা করছেন, মঙ্গলের প্রাথমিক ভূতাত্ত্বিক যুগে, প্রায় ৩৫০ কোটি বছর আগে অলিম্পাস মন্স গঠিত হয়েছিল। বর্তমান সময়ে এটি সুপ্ত অবস্থায় রয়েছে এবং সাম্প্রতিককালে কোনো অগ্ন্যুৎপাত ঘটেনি।

মঙ্গলের পৃষ্ঠতলের তুলনায় অলিম্পাস মন্স-এর ঢাল খুবই মৃদু এবং পৃষ্ঠে উল্কাপিণ্ডের আঘাত বা বড় ধ্বংসাবশেষের অভাব দেখা যায়। এ থেকে অনুমান করা যায়, আগ্নেয়গিরির পৃষ্ঠভাগ তুলনামূলকভাবে নতুন। মঙ্গল এক্সপ্রেস অরবিটারের তোলা ছবিতে দেখা যায়, আগ্নেয়গিরির দক্ষিণ-পূর্ব দিকে লাভা প্রবাহের স্তর, খাড়া পর্বতখণ্ড এবং প্রাচীন ধসের চিহ্ন। এই ছবি মঙ্গলের ভূ-তাত্ত্বিক ইতিহাসকে আরও গভীরভাবে বোঝার সুযোগ দিচ্ছে।

ইএসএ জানিয়েছে, অলিম্পাস মন্স-এর ঢাল প্রায় ৯ কিলোমিটার পর্যন্ত উঁচু এবং এটি মূলত বিশাল ভূমিধসের কারণে গঠিত হয়েছে। এই ঢালের কারণে লক্ষ লক্ষ টন ধ্বংসাবশেষ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাথমিকভাবে লাভা প্রবাহ ঢালের উপর দিয়ে নেমে একটি বিশাল ফ্যান বা পাখা-আকৃতিতে ছড়িয়ে পড়েছিল। ধীরে ধীরে ঠান্ডা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখানে খাল ও নলের মতো কাঠামো তৈরি হয়। কিছু লাভা প্রবাহ সমতল ভূমিতে পৌঁছানোর আগে মসৃণ, গোলাকার জিহ্বার মতো আকার ধারণ করেছিল। এর নিচে সমভূমিতে একটি ঘোড়ার নালের আকৃতির চ্যানেল রয়েছে, যা একসময় লাভা এবং পানি বহনের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।

এ ধরনের ভূ-তাত্ত্বিক কাঠামো মঙ্গলের অতীতের জটিল পরিবেশের ইঙ্গিত দেয়। বিশেষত, লাভার ফ্যান আকৃতি, খাল ও নল, এবং প্রাচীন ধসের চিহ্নগুলো নির্দেশ করে যে মঙ্গল গ্রহের ভূ-প্রকৃতি সময়ের সাথে অনেক পরিবর্তিত হয়েছে। এছাড়াও, পৃষ্ঠের সামান্য কিছু ছোট গর্ত থেকে অনুমান করা যায় যে এই এলাকা ভূ-তাত্ত্বিকভাবে নতুন হতে পারে, সম্ভবত মাত্র কয়েক কোটি বছরের পুরোনো।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইএসএ-এর পোস্ট প্রকাশের পর পাঠকরা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। একজন ব্যবহারকারী লিখেছেন, “আমি এখানে আমার সকালের দৌড়টি দিতে চাই,” আরেকজন মন্তব্য করেছেন, “আমি অবাক হয়ে ভাবছি এই বিশাল লাভা প্রবাহের কারণে মঙ্গল তার চৌম্বকক্ষেত্র হারিয়েছে কি না?” তৃতীয় একজন মন্তব্য করেছেন, “পরিষ্কার করা হলে এই ধাপে একটি ভালো শহর ও আগ্নেয়গিরিতে প্রবেশের পথ তৈরি করা যেতে পারত।” এই প্রতিক্রিয়াগুলো প্রমাণ করে যে মানুষ শুধুমাত্র বৈজ্ঞানিক নয়, কল্পনাপ্রসূত ভাবনাতেও মঙ্গলের প্রতি আগ্রহী।

অলিম্পাস মন্স গবেষকদের জন্য শুধু একটি আগ্নেয়গিরি নয়, বরং মঙ্গলের ভূ-তাত্ত্বিক ইতিহাস, আগ্নেয়গিরির প্রাথমিক গঠন, লাভার প্রবাহের আচরণ এবং সম্ভাব্য জ্যোতিষ্কীয় প্রভাব বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক ল্যাব। মঙ্গলের পৃষ্ঠে এই বিশাল কাঠামো আমাদের সৌরজগতের অন্যান্য গ্রহের তুলনায় তুলনামূলকভাবে ভিন্ন গঠন এবং গতি সম্পর্কে ধারণা প্রদান করছে।

মঙ্গল গ্রহে মানবের বসতি স্থাপনের সম্ভাবনা এবং আগ্নেয়গিরির আশেপাশের অঞ্চলে যাত্রা ও গবেষণা পরিচালনার ক্ষেত্রে এই ধরনের ছবি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত, ধলানী লাভা প্রবাহ এবং সমতল এলাকা ভবিষ্যতে মানব অভিযানের জন্য নিরাপদ পথ নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে। বিজ্ঞানীরা এই ছবি বিশ্লেষণ করে মঙ্গলের পৃষ্ঠের কাঠামোর বিবর্তন, আগ্নেয়গিরির কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য ভূ-প্রকৃতিক ঝুঁকি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করছেন।

ইএসএ-এর এই প্রকাশিত ছবি ও তথ্য শুধুমাত্র গবেষকদের জন্য নয়, সাধারণ পাঠক ও মহাকাশ প্রেমীদের জন্যও একটি শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা। এটি আমাদের সৌরজগতের বৃহত্তম আগ্নেয়গিরি এবং মঙ্গলের ভূ-প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান বৃদ্ধি করছে। অলিম্পাস মন্স আমাদের সৌরজগতের বিস্ময় ও রহস্যের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে উপস্থিত হয়েছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত