ভারতের দ্বিধা, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে নতুন উত্তেজনা

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩৬ বার
ভারতের দ্বিধা, শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডে নতুন উত্তেজনা

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ড দুই দেশের সম্পর্কে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশে পরিবর্তনের ঢেউ ওঠে ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর। ছাত্ররা তখন কোটা পুনঃপ্রবর্তনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মাঠে নামে। আন্দোলন দ্রুত বড় গণঅসন্তোষে পরিণত হয়। মানুষ দীর্ঘদিনের দমননীতি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। নিরাপত্তা বাহিনী আন্দোলন দমনে কঠোর শক্তি ব্যবহার করে। এতে বহু মানুষ হতাহত হয়। দেশজুড়ে ক্ষোভ আরও বাড়ে। এসব ঘটনা মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে।

এই পরিস্থিতিতে ২০২৫ সালের নভেম্বর আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল রায় ঘোষণা করে। আদালত শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। আদালতের অভিযোগ ছিল দমন ব্যবস্থায় তার ব্যর্থতা। তারা বলে তিনি সহিংসতা ঠেকাতে পারেননি। তারা উল্লেখ করে তিনি বহু ঘটনায় উসকানিমূলক ভূমিকা রেখেছিলেন। রায়টি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন বিতর্ক তোলে।

শেখ হাসিনা দিল্লি থেকে রায়কে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলেন। তিনি দাবি করেন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ ছিল না। তিনি আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার চান। তিনি নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ বলেন। তার সমর্থকেরা রায়কে প্রতিশোধমূলক বিচার বলে মনে করে। তারা বলে সরকারের পরিবর্তন ছিল অস্বাভাবিক পরিস্থিতি। তারা একে বেআইনি ক্ষমতায়ন বলে দাবি করে।

রায় ঘোষণার পর ঢাকা দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ায়। বাংলাদেশ শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরত চাইছে। তারা বলে প্রত্যর্পণ চুক্তি এ ক্ষেত্রে যথেষ্ট। ঢাকা মনে করে দণ্ডিত ব্যক্তিকে আশ্রয় দেওয়া বন্ধুত্বের বিরোধী। ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। সেই সিদ্ধান্তেই দুই দেশের সম্পর্কে নতুন জটিলতা তৈরি হয়।

ভারত বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কভাবে দেখছে। তারা বলে রায়ের দিকে নজর রেখেছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। কিন্তু তারা কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি। ভারতের আইনজ্ঞরা বলছেন চুক্তিতে কিছু ব্যতিক্রম আছে। তারা বলেন রাজনৈতিক মামলায় প্রত্যর্পণ বাধ্যতামূলক নয়। তারা আরও বলেন প্রাণহানির ঝুঁকি থাকলে ফেরত পাঠানো যায় না। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই দুই বিষয়ই আলোচনায় রয়েছে। ভারতের কূটনৈতিক মহল তাই দোটানায় আছে।

২০১৩ সালের প্রত্যর্পণ চুক্তি পরে সংশোধন করা হয়। সংশোধনে বলা হয় সুনির্দিষ্ট অপরাধে দণ্ডিত কাউকে ফেরত দিতে হবে। কিন্তু যদি মামলা রাজনৈতিক হয় তবে ব্যতিক্রম থাকবে। বাংলাদেশ বলছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ স্পষ্ট। তাই তাকে ফেরত দেওয়া উচিত। তারা মনে করে আন্তর্জাতিক আইনের স্বার্থেও এটি জরুরি। তারা সতর্ক করে যে দেরি করলে সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ভারত অবশ্য বিষয়টি অন্যভাবে দেখছে। শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘ সম্পর্ক ছিল। তিনি ভারতের নীতিতে বহুবার সহায়তা করেছিলেন। উগ্রপন্থি দমন তার সময়ে সহজ হয়েছিল। সীমান্ত ও পানি ইস্যুতেও তিনি সহযোগিতামূলক ছিলেন। তাই তাকে ফেরত পাঠানো ভারতের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করতে পারে। ভারতের কিছু বিশেষজ্ঞ এ নিয়ে সতর্ক করছে।

বাংলাদেশের নতুন সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খুব উষ্ণ নয়। নতুন সরকার ভারতের আগের প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তোলে। তারা বলছে ভারত বাংলাদেশে অতিরিক্ত প্রভাব খাটিয়েছিল। দিল্লি মনে করছে নির্বাচন পর্যন্ত অস্থিরতা থাকতে পারে। তাই তারা এখন অপেক্ষার কৌশল নিচ্ছে।

বাংলাদেশের অনেক মানুষ রায়কে ন্যায়বিচারের অংশ মনে করে। তারা আন্দোলনে নিহত মানুষের কথা স্মরণ করে। তারা মনে করে দায়ী নেতাকে বিচারের মুখোমুখি করা উচিত। তারা ভারতের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি তুলছে। তাদের ধারণা ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ভারত ভূমিকা রাখতে পারে।

ভারত মানবাধিকার ইস্যুও বিবেচনা করছে। তারা জানে মৃত্যুদণ্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনা উঠতে পারে। তারা মনে করে বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালতেও যেতে পারে। তাই তারা খুব হিসাব করে পদক্ষেপ নিচ্ছে। দুই দেশের স্বার্থ তাই এখন সংঘাতে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাসও এই পরিস্থিতিকে সংবেদনশীল করেছে। বাংলাদেশ আগে মুজিব হত্যার দায়ীদের ফেরত চেয়েছিল। কিন্তু কয়েক দেশ মৃত্যুদণ্ডের কারণে তা মানেনি। এবার পরিস্থিতি উল্টো। বাংলাদেশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে চায়। ভারত দণ্ডিত ব্যক্তিকে আশ্রয় দিয়েছে। তাই অনেকেই ভারতের নৈতিকতার প্রশ্ন তুলছে।

শেখ হাসিনা বিশ্বের বিরল নেতাদের একজন যিনি ক্ষমতাচ্যুত হয়ে মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন। ইতিহাসে এমন আরও কয়েকজন নেতা ছিলেন। তারা ক্ষমতার অপব্যবহার বা দমননীতির কারণে দণ্ডিত হন। তাই রায়টি বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনা তুলেছে।

বর্তমান পরিস্থিতি দেখে মনে হয় শেখ হাসিনা ভারতে দীর্ঘদিন থাকতে পারেন। বাংলাদেশ চাপ বাড়াতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলেও এ নিয়ে আলোচনা বাড়তে পারে। তবে ভারত এখনো অপেক্ষার পথেই আছে। তারা কৌশলগত স্বার্থ সামনে রেখে সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে।

এই ঘটনা তাই শুধু একটি বিচারের গল্প নয়। এটি দুই দেশের নৈতিকতা ও কূটনীতির পরীক্ষা। বাংলাদেশের ন্যায়বোধ এবং ভারতের দ্বিধা এখন মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। এই দ্বন্দ্বই ভবিষ্যতে সম্পর্ক কোনদিকে যাবে তা নির্ধারণ করবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত