ক্যামেরন হাইল্যান্ডে অভিযানে ৪৬৮ বিদেশি আটক

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৭ বার
ক্যামেরন হাইল্যান্ডে অভিযানে ৪৬৮ বিদেশি আটক

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় পাহাড়ি পর্যটন এলাকা ক্যামেরন হাইল্যান্ডে অভিবাসন বিভাগের পরিচালিত বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন ৪৬৮ বিদেশি শ্রমিক। বৃহস্পতিবার সকাল ১১টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টার এই অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়াদের মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৭৪ জনই বাংলাদেশি নাগরিক। বহুদিন ধরে স্থানীয় কমিউনিটির অভিযোগ এবং দীর্ঘ পর্যবেক্ষণের পর পরিকল্পিত এই অভিযান সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে পরিচালিত সবচেয়ে বড় ধরপাকড় কার্যক্রমগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

মালয়েশিয়ার সরকারি বার্তা সংস্থা বারনামা জানায়, এই অভিযানে অংশ নেয় অভিবাসন বিভাগের ৫৪৭ জন সদস্য। পাহাড়ি অঞ্চলের চারটি জোনজুড়ে বিস্তৃত অভিযানে তল্লাশি চালানো হয় ব্যবসায়িক এলাকা, বাজার, নির্মাণস্থল, আবাসনকেন্দ্র ও সবজিখামারে। ক্যামেরন হাইল্যান্ডস মালয়েশিয়ার অন্যতম প্রধান কৃষি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত, যেখানে বিপুল পরিমাণ সবজি দেশের বাজারে যায়। এ কারণে এখানে বিদেশি শ্রমিকদের উপস্থিতি বহু বছর ধরে প্রচলিত। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের সংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ এবং নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

অভিযানের সময় বহু শ্রমিক সবজি বাছাই বা প্যাকেট করার কাজে ব্যস্ত ছিলেন। অভিবাসন কর্মকর্তারা হঠাৎ করে অভিযান শুরু করায় তারা পালাতে পারেননি। ইমিগ্রেশন মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাআবান জানান, কমিউনিটির অভিযোগের ভিত্তিতে প্রায় এক মাস ধরেই অভিযানটি সাজানো হয়েছিল। প্রস্তুতির সময় গোয়েন্দা বিভাগ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করে জানতে পারে যে এই পাহাড়ি জেলা আশেপাশের এলাকা থেকে আসা বিদেশিদের জন্য একটি কর্মকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কৃষিকাজ, হোটেল ব্যবসা এবং নির্মাণশিল্পে বিদেশি শ্রমিকদের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।

জাকারিয়া শাআবান বলেন, “গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণে আমরা বুঝতে পারি যে ক্যামেরন হাইল্যান্ডে বিদেশি শ্রমিকের উপস্থিতি এখন অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। স্থানীয় জনগণ অভিযোগ করেছিলেন যে অনেক বিদেশি বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই কাজ করছেন এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্থাপনায় প্রায় পুরো কর্মী বাহিনীই অস্থায়ী বিদেশি শ্রমিক।” তিনি আরও বলেন, “পাহাড়ি এলাকা এবং শহর থেকে দূরবর্তী অবস্থান হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি আগে তুলনামূলকভাবে কম ছিল, আর এই সুযোগে অনেক শ্রমিক এই এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।”

অভিযানে আটক হওয়া ৪৬৮ বিদেশির মধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাদেশির পাশাপাশি রয়েছে মিয়ানমারের ১৭৫ জন, ইন্দোনেশিয়ার ৬৭ জন, নেপালের ২০ জন, পাকিস্তানের ১৬ জন, ভারতের ১১ জন এবং ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, চীন ও কম্বোডিয়ার ১ জন করে। গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে পুরুষ ৩৮৮ জন, নারী ৭৬ জন এবং ৪ জন শিশু রয়েছে। আটকরা সবাই ২০ থেকে ৫৪ বছর বয়সী। তাদের কাগজপত্র যাচাইয়ের পর কেলান্তান, পেরাক ও সেলাঙ্গর রাজ্যের ইমিগ্রেশন ডিটেনশন ডিপোতে পাঠানো হবে।

অভিবাসন বিভাগ জানিয়েছে, অভিযানে মোট ১ হাজার ৮৮৬ বিদেশির কাগজপত্র পরীক্ষা করা হয়। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ পাস, ভ্রমণ নথির অভাব, অনুমোদিত কর্মক্ষেত্র পরিবর্তন এবং জাল বা সন্দেহজনক অস্থায়ী কর্মপাস প্রদর্শন। কর্তৃপক্ষ বলছে, কিছু শ্রমিক এমন পাস দেখিয়েছেন যা যাচাই করতে গিয়ে বড় ধরনের জালিয়াতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এ ধরনের অপরাধ সাধারণত মানবপাচার চক্র এবং বিভিন্ন এজেন্ট গোষ্ঠীর সাহায্য ছাড়া ঘটানো সম্ভব নয়।

স্থানীয়রা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছিলেন যে সবজিখামারগুলোতে কর্মরত অনেক শ্রমিক বৈধ নন এবং তারা নিয়মকানুন মানছেন না। পাহাড়ি এলাকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন এবং শ্রমবাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় স্থানীয় জনগণ অসন্তুষ্ট হয়ে ওঠেছিল। স্থানীয় কিছু ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে তারা সস্তা শ্রম পাওয়ার আশায় নিয়মবহির্ভূতভাবে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ দিয়েছেন, যা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। অভিবাসন মহাপরিচালক জাকারিয়া জানান, প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও তদন্ত করা হবে।

বাংলাদেশি শ্রমিকদের গ্রেপ্তার হওয়ার সংবাদ পরিবারগুলোতে দুশ্চিন্তা তৈরি করেছে। মালয়েশিয়া প্রবাসী একাধিক বাংলাদেশি জানিয়েছেন যে, সম্প্রতি বৈধতা যাচাই প্রক্রিয়া কঠোর হওয়ায় অনেক শ্রমিক কাজ হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। ক্যামেরন হাইল্যান্ডস এমন এলাকা যেখানে শ্রমিকরা সাধারণত কম নজরদারিতে কাজ করতেন। জাকারিয়ার বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে ভবিষ্যতে এ ধরনের দূরবর্তী অঞ্চলও কঠোর পর্যবেক্ষণের আওতায় আসবে।

অভিযানের পর মানবাধিকারকর্মীরা বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া শ্রমিকদের অধিকার নিশ্চিত করতে মালয়েশিয়া সরকারকে সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে যাদের শিশু বা পরিবার রয়েছে, তাদের আটককেন্দ্রে অবস্থানের সময় মানবিক দিকটি গুরুত্বসহকারে দেখতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম)-এর মালয়েশিয়া কার্যালয় অভিযানের পর জানিয়েছে, যেসব শ্রমিক বৈধ হওয়ার সুযোগ পেয়েও পাননি, তাদের বিষয়ে সরকার যেন পুনর্বিবেচনা করে।

মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ জানায়, চলতি বছরের শুরু থেকে ১৮ নভেম্বর পর্যন্ত দেশজুড়ে বিভিন্ন অভিযানে মোট ৮৩ হাজার ৯৯৪ বিদেশিকে আটক করা হয়েছে। এসব অভিযান দেশটির শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রিত রাখা এবং বেআইনি অভিবাসন দমন করার সরকারের উদ্যোগের অংশ। জাকারিয়া শাআবান বলেন, “আমরা বিদেশিদের বিরুদ্ধে নয়, বরং বেআইনি কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে অভিযান চালাচ্ছি। যারা বৈধভাবে কাজ করছেন তাদের নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।”

ক্যামেরন হাইল্যান্ডের এই অভিযান শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজার নয়, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার শ্রমবাজারে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মরত বিদেশি শ্রমিকদের একটি বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো থেকে আসায় গ্রেপ্তারের খবর দ্রুত বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশি প্রবাসী এবং তাদের পরিবার এখন অপেক্ষায় রয়েছেন—গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশিদের বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো সহায়তা বা তথ্য প্রদান করা হয় কি না।

বিশ্বায়নের যুগে শ্রমবাজার অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাদের নিরাপত্তা, বৈধতা এবং মানবিক অধিকার রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। ক্যামেরন হাইল্যান্ডের অভিযানে ধরা পড়া শত শত শ্রমিকের গল্পও সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে নিয়ে এল।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত