মার্কিন হামলায় নিহত ইরানি নাবিকদের মরদেহ ফেরত

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬
  • ৪৯ বার
মার্কিন সাবমেরিন হামলায় ডুবে যাওয়া ইরানি ফ্রিগেটের ৮৪ নাবিকের মরদেহ শ্রীলঙ্কা থেকে দেশে ফেরত নিচ্ছে ইরান, চলছে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া।

প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৬ । একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ভারত মহাসাগরের উত্তাল জলরাশিতে সংঘটিত এক মর্মান্তিক সামরিক ঘটনার পর নিহত ইরানি নৌসেনাদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে শ্রীলঙ্কা। যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিনের টর্পেডো হামলায় ডুবে যাওয়া ইরানি যুদ্ধজাহাজের ৮৪ নাবিকের মরদেহ শুক্রবার ইরানে পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই ঘটনা কেবল একটি সামরিক দুর্ঘটনার সীমায় আবদ্ধ নয়, বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।

গত ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কার উপকূলের কাছে ভারত মহাসাগরের জলসীমায় ইরানের নৌবাহিনীর একটি ফ্রিগেট ডুবে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাবমেরিন থেকে নিক্ষেপ করা টর্পেডোর আঘাতে ইরানের আইআরআইএস ডেনা নামের ফ্রিগেটটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ডুবে যায়। এই ঘটনায় জাহাজে থাকা বহু নাবিক প্রাণ হারান।

ঘটনার পরপরই শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী এবং উদ্ধারকারী দলগুলো দ্রুত তৎপর হয়ে ওঠে। ভারত মহাসাগরের সেই দুর্ঘটনাস্থলে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে তারা বেশ কিছু নাবিককে জীবিত উদ্ধার করতে সক্ষম হয়। তবে অনেক নাবিকের দেহ উদ্ধার করা হয় সমুদ্র থেকে, যাদের অধিকাংশই ডুবে যাওয়ার সময় প্রাণ হারান।

শ্রীলঙ্কার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তুষারা রদ্রিগো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, নিহত নাবিকদের মরদেহ স্বদেশে পাঠানোর জন্য প্রয়োজনীয় সব প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বলেন, ইরান সরকার মরদেহ গ্রহণের জন্য একটি বিশেষ চার্টার্ড বিমান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা শ্রীলঙ্কা থেকে মরদেহগুলো নিয়ে যাবে।

শ্রীলঙ্কার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উদ্ধার করা মরদেহগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং সেগুলো সিল করা কফিনে করে দক্ষিণাঞ্চলের মাত্তালা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নেওয়া হচ্ছে। সেখান থেকে বিশেষ কার্গো বিমানে করে মরদেহগুলো ইরানে পাঠানো হবে, যাতে নিহত নাবিকদের পরিবারের কাছে সেগুলো দ্রুত পৌঁছে দেওয়া যায়।

প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেলের মধ্যেই প্রথম দফায় অন্তত ৪৬টি মরদেহ বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছে। বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমে সেখানে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। মরদেহ গ্রহণের জন্য ইরানের একটি চার্টার্ড কার্গো বিমান প্রস্তুত রয়েছে বলে জানা গেছে।

দুর্ঘটনার পর সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা মরদেহগুলো শ্রীলঙ্কার দক্ষিণাঞ্চলের গলের কারাপিতিয়া হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা প্রতিটি মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন এবং পরিচয় শনাক্ত করার কাজ করেন। এই প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর স্থানীয় আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী মরদেহগুলো কলম্বোয় অবস্থিত ইরানি দূতাবাসের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হয়।

স্থানীয় এক ম্যাজিস্ট্রেট আনুষ্ঠানিকভাবে নির্দেশ দেন, যাতে মরদেহগুলো ইরানের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং যথাযথ মর্যাদায় স্বজনদের কাছে পাঠানো যায়। কর্মকর্তারা জানান, পুরো প্রক্রিয়াটি আন্তর্জাতিক নিয়ম ও মানবিক বিবেচনা অনুসরণ করেই সম্পন্ন করা হয়েছে।

এই ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ৩২ জন নাবিককে শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী উদ্ধার করেছিল। তারা বর্তমানে শ্রীলঙ্কাতেই অবস্থান করছেন এবং তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। শ্রীলঙ্কা সরকার জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের উত্তেজনা ভারত মহাসাগরের বিস্তৃত জলসীমা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে এবং বিভিন্ন দেশের নৌবাহিনীর মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এমন একটি ঘটনা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিতে পারে। বিশেষ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন এবং সামরিক কর্মকাণ্ডের সীমারেখা নিয়ে বিভিন্ন দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে।

এদিকে নিহত নাবিকদের পরিবারগুলো গভীর শোকের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে বলে ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। অনেক পরিবার এখনও প্রিয়জনের মৃত্যুর খবর পুরোপুরি মেনে নিতে পারছেন না। তারা আশা করছেন, মরদেহ দেশে ফিরে এলে যথাযথ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানাতে পারবেন।

শ্রীলঙ্কা সরকারও পুরো ঘটনার প্রতি মানবিক সহানুভূতি প্রকাশ করেছে। দেশটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং মানবিক দায়িত্ববোধ থেকেই তারা উদ্ধার কার্যক্রম ও মরদেহ সংরক্ষণের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করেছে।

ভারত মহাসাগরের এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দিল যে আন্তর্জাতিক জলসীমায় সামরিক উত্তেজনা কতটা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। নিহত নাবিকদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে অন্তত তাদের পরিবারের কাছে শেষ বিদায়ের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এই ঘটনার প্রভাব আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে কতটা গভীর প্রভাব ফেলবে, তা সময়ই বলে দেবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত

Theme Dwonload From ThemesBazar.Com