প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্যোগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতির জন্য প্রণীত নতুন ২৮ দফা খসড়া প্রস্তাব আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। প্রস্তাবটি রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত সমন্বয়ে তৈরি করা হয়েছে এবং এরইমধ্যে ইউক্রেনের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে বলে একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। ইউক্রেনকে ভূখণ্ড ছাড় দিতে হবে—এমন শর্ত যুক্ত থাকায় বিশ্বরাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে নতুন করে। সমালোচকদের মতে, এই প্রস্তাব মেনে নেওয়া মানে ইউক্রেনের জন্য তিক্ত পরাজয় স্বীকার করা, অন্যদিকে সমর্থকদের মতে, দীর্ঘদিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ বন্ধের এটি হতে পারে একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।
টিআরটি ওয়ার্ল্ড জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের এই উদ্যোগটি ওয়াশিংটন ও মস্কোর যৌথ সমন্বয়ে প্রণীত এক বিরল খসড়া, যাকে যুদ্ধের শুরু থেকে সবচেয়ে বিস্তৃত ও কাঠামোবদ্ধ শান্তি-প্রস্তাব হিসেবে দেখা হচ্ছে। এতে রাশিয়ার বেশ কিছু দাবি অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় ইউক্রেনের অবস্থান নড়বড়ে হয়ে পড়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
খসড়া অনুযায়ী, ইউক্রেনকে তার পূর্বাঞ্চলের কিছু অংশ রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে দিতে হতে পারে। একই সঙ্গে দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হবে যে তারা ভবিষ্যতে ন্যাটো জোটে যোগদানের আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করছে। এর বিনিময়ে ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে খসড়া তৈরির সঙ্গে যুক্ত মার্কিন ও রুশ প্রতিনিধিরা। চুক্তিতে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, রাশিয়া ভবিষ্যতে আর কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক আগ্রাসন চালাবে না, এবং ন্যাটো সামরিক জোটও আর পূর্বমুখী সম্প্রসারণ করবে না।
ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের গ্যারান্টি যুক্ত করা হয়েছে প্রস্তাবে। এতে বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে কোনো সংঘাত দেখা দিলে নির্দিষ্ট কিছু দেশ ইউক্রেনকে সরাসরি প্রতিরক্ষায় সহায়তা করবে। তবে এই নিরাপত্তা গ্যারান্টির শর্ত হিসেবেই ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর আকার কমিয়ে ছয় লাখে নামিয়ে আনতে হবে। এই সীমাবদ্ধতা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের আত্মরক্ষার সক্ষমতায় বড় ধাক্কা তৈরি করবে বলে বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
ন্যাটোকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এমন একটি ধারা—যাতে বলা থাকবে, ভবিষ্যতে ইউক্রেনকে কখনোই সদস্যপদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে না। এই শর্ত আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের একাধিক কূটনীতিক জানিয়েছেন, এটি ন্যাটোর নীতিগত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দীর্ঘমেয়াদে ইউরোপের ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য ভেঙে পড়তে পারে।
খসড়ায় আরও উল্লেখ আছে, রাশিয়া-ইউক্রেন সাম্প্রতিক তিন দশকে যেসব ভৌগোলিক ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট ইস্যু নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে, সেগুলোর সবই এই চুক্তির মাধ্যমে নিষ্পত্তি হয়েছে বলে গণ্য করা হবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে উভয়পক্ষই এসব বিষয় নিয়ে আর দাবি বা অভিযোগ তুলতে পারবে না।
ইউক্রেন এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে দেশটির রাজনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ পাচ্ছে। ইউক্রেনের কিছু সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, ভূখণ্ড ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া সম্ভব নয়। তারা বলছেন, যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনকে সমর্থনকারী পশ্চিমা শক্তিগুলো যদি এমন একটি চুক্তিকে সমর্থন করে, তবে তা হবে ‘ঐতিহাসিক বিশ্বাসঘাতকতা’। অন্যদিকে জনসাধারণের মধ্যে এই প্রস্তাব নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের ক্লান্তি ও মানবিক বিপর্যয় জনগণের একটি বড় অংশকে শান্তির দিকে ঝুঁকিয়ে দিচ্ছে, যদিও দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়টি এখনও অধিকাংশ নাগরিকের কাছে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
রাশিয়া এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে খসড়াটি প্রকাশ না করলেও মস্কো ঘনিষ্ঠ সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে যে প্রস্তাবের বেশ কয়েকটি শর্ত রাশিয়ার দীর্ঘদিনের দাবি। ক্রেমলিন বিবৃতিতে জানায়, “দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বাস্তববাদী সমাধান প্রয়োজন, এবং নতুন প্রস্তাবে সেই দিকটিই প্রাধান্য পেয়েছে।”
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই খসড়া নিয়ে প্রতিক্রিয়া মিশ্র। জার্মানি, ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যের কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির জন্য শান্তি-প্রস্তাব অবশ্যই প্রয়োজন, তবে ইউক্রেনের ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ক্ষুণ্ণ করে এমন সমাধান পশ্চিমা বিশ্ব সহজে মেনে নেবে না। ন্যাটো মহাসচিবের অফিস থেকেও জানানো হয়, যেকোনো শান্তি চুক্তি অবশ্যই ইউক্রেনের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হতে হবে, বাহ্যিক চাপ নয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও রাজনৈতিক বিতর্ক তীব্র হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসনের সমর্থকরা বলছেন, এটি যুদ্ধ থামানোর জন্য সাহসী ও বাস্তবসম্মত উদ্যোগ। কিন্তু সমালোচকরা মনে করেন, রাশিয়ার শর্ত মেনে নেওয়ার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে দুর্বল করে ফেলছে এবং পশ্চিমা গণতন্ত্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিপদের মুখে ফেলছে।
এই প্রস্তাব কার্যকর হলে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আসবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। ইউক্রেন ন্যাটো থেকে ছিটকে গেলে ইউরোপে সামরিক ভারসাম্য রাশিয়ার পক্ষে ঝুঁকে পড়তে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়ার আঞ্চলিক প্রভাব আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে যুদ্ধ থেমে গেলে মানবিক বিপর্যয় কমবে এবং দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনের পথে significant অগ্রগতি ঘটবে বলে অনেকে আশাবাদী।
সারা বিশ্বের দৃষ্টি এখন ইউক্রেন সরকারের দিকে। যুদ্ধের মধ্যে বিধ্বস্ত, ক্লান্ত জনগণ কি এই প্রস্তাবকে শান্তির সুযোগ হিসেবে দেখবে, নাকি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আরও কঠোর অবস্থান নেবে—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। সামনে কয়েকদিনের মধ্যেই যে কোনো সময় প্রস্তাবটি নিয়ে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হতে পারে বলে কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির অস্থির এই মুহূর্তে ট্রাম্পের ২৮ দফা খসড়াটি বিশ্বকে একটি মোড় নেওয়ার সুযোগ করে দিতে পারে। তবে সেই মোড়টি শান্তির দিকে যাবে, না কি আরও জটিল সংঘাতের দিকে—তা এখনো অনিশ্চিত।