কুমিল্লা ইপিজেডে ভূমিকম্পে অজ্ঞান ৮০ নারী শ্রমিক

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৭ বার
কুমিল্লা ইপিজেডে ভূমিকম্পে অজ্ঞান ৮০ নারী শ্রমিক

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কুমিল্লা ইপিজেডে শুক্রবার সকালে অনুভূত ভূমিকম্পের প্রভাবে অন্তত ৮০ নারী শ্রমিক অজ্ঞান হয়ে পড়েছেন। এই অঘটনের সময় দৌড়ে বের হওয়ার সময় আরও পাঁচজন নারী শ্রমিক আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে ৫০ জনকে কুমিল্লা বেপজা হাসপাতালে এবং ৩০ জনকে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যেখানে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।幸

কুমিল্লা ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মো. সাইফুল ইসলাম জানান, “ভূমিকম্পের প্রাথমিক কম্পনের সময় দু’টি কোম্পানির নারী শ্রমিকরা আতঙ্কে দৌড়াতে শুরু করেন। ভয় এবং আতঙ্কের প্রভাবে অনেকেই প্যানিক অ্যাটাকের শিকার হন এবং অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তবে কেউ গুরুতর আহত হননি, প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সকলেই স্বাভাবিক অবস্থায় বাসায় ফিরেছেন।”

কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. তানভীর আহমেদ জানান, “প্রাথমিকভাবে ৩০ জন নারী শ্রমিককে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের মধ্যে কেউই গুরুতর অবস্থায় নেই। শারীরিকভাবে সবাইকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে।”

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিটে কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হঠাৎ কম্পন অনুভূত হয়। অচেনা ঝাঁকুনি ও স্থির না থাকা ভবনের কারণে নারী শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়। অনেকে হঠাৎ দৌড়াতে গিয়ে পড়ে যান, কেউ কেউ অফিসের মেঝেতে অজ্ঞান হয়ে পড়েন। পরে সহকর্মীরা ও নিরাপত্তা বাহিনী তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দেন।

ভূমিকম্পের মাত্রা ছিল ৫ দশমিক ৭, যার কেন্দ্রস্থল নরসিংদীর মাধবদী এলাকায়। ভূমিকম্পটি স্থানীয়ভাবে কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হয় এবং কুমিল্লা ইপিজেডে কম্পনের তীব্রতা অনুভূত হয়। গুগল আর্থকোয়াক অ্যালার্ট সিস্টেম জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তি নরসিংদীর ঘোড়াশাল থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে।

ইপিজেডের একাধিক কোম্পানির শ্রমিকরা জানান, “হঠাৎ ঝাঁকুনি অনুভূত হলে প্রায় সবাই আতঙ্কে পড়ে গেল। কেউ কেউ দৌড়াতে শুরু করেন, কেউ মেঝেতে বসে কাঁপতে কাঁপতে পড়ে ছিলেন। সহকর্মীরা দ্রুত এগিয়ে এসে আমাদের উদ্ধার করেন। পরিস্থিতি দেখলে মনে হয়েছিল যেন পুরো এলাকা হেলে যাচ্ছে।”

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উচ্চ-ঘনত্বের শিল্পাঞ্চল, বিশেষ করে যেখানে বড় বড় কারখানা ও বহুতল ভবন রয়েছে, সেখানে ভূমিকম্পের প্রভাবে দ্রুত আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তে পারে। কুমিল্লা ইপিজেডের মতো এলাকা যেখানে হাজার হাজার শ্রমিক একসাথে কাজ করেন, সেখানে সঠিকভাবে জরুরি প্রস্থান পরিকল্পনা না থাকলে এই ধরনের প্যানিক অ্যাটাক ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারে।

এদিকে স্থানীয় প্রশাসন এবং ইপিজেড কর্তৃপক্ষ জানান, “আমরা জরুরি পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেছি। শ্রমিকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরানো হয়েছে। আহতদের চিকিৎসা প্রদান করা হয়েছে এবং কারখানার কার্যক্রম ধাপে ধাপে স্বাভাবিক করা হচ্ছে।”

ভূমিকম্পের সময় কুমিল্লার সাধারণ মানুষও আতঙ্কিত হয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন। স্কুল, কলেজ, অফিস ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান থেকে মানুষ বাইরে বের হন। অনেকেই বলেন, “কম্পন অনুভূত হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, যেন পুরো পৃথিবী কাঁপছে। এভাবে হঠাৎ ঝাঁকুনি আসলে যে কারোই আতঙ্কিত হওয়া স্বাভাবিক।”

ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প সাধারণত ৫ থেকে ৬ রিখটার স্কেলে অনুভূত হয়। তবে শিল্পাঞ্চল এবং বহু মানুষ একত্রে থাকা এলাকা, যেমন ইপিজেড বা ঘনবসতি শহরের কেন্দ্র, সেখানে আতঙ্কের প্রভাবে আহত বা অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা তুলনামূলকভাবে বেশি ঘটে। কুমিল্লা ইপিজেডের ঘটনা এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করছে।

স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, “এ ধরনের পরিস্থিতিতে কেউ আতঙ্কিত হলে শান্ত থাকা গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত দৌড়ানো বা হঠাৎ ওঠার কারণে আহত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ জন্য শ্রমিকদের নিয়মিত জরুরি প্রস্থান প্র্যাকটিস করানো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা আবশ্যক।”

এছাড়া বিশেষ মনোবিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করান, ভূমিকম্পের প্রভাবের কারণে প্যানিক অ্যাটাক এবং অজ্ঞান হওয়া খুব স্বাভাবিক, বিশেষ করে যেখানে মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। এই ধরনের মানসিক চাপ মোকাবেলার জন্য সচেতনতা এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।

কুমিল্লা ইপিজেড কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের আতঙ্কজনক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ এবং জরুরি পরিকল্পনা আরও জোরদার করা হবে। এতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা কমানো সম্ভব হবে।

এই ঘটনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে গেছে, শুধুমাত্র ভূমিকম্পের মাত্রা বা সময় নয়, মানুষের সঠিকভাবে পরিচালনা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে পরবর্তী ক্ষতি এবং আতঙ্ক বৃদ্ধি পেতে পারে। এই ঘটনাটি কুমিল্লা ইপিজেডের শ্রমিকদের জন্য একটি স্মরণীয় দিন হয়ে রইল, যেখানে মানবিক সহায়তা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং হাসপাতালের জরুরি চিকিৎসা তাদের প্রাণ রক্ষা করেছে।

কুমিল্লার বাসিন্দারা এবং শ্রমিক সমাজের প্রতিনিধিরা আশা প্রকাশ করেছেন, ভবিষ্যতে কারখানা ও শিল্পাঞ্চলে ভূমিকম্প মোকাবেলার জন্য আরও সচেতনতা, প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা নেওয়া হবে। তারা মনে করেন, এটি কেবল একটি শারীরিক নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, মানসিক ও সামাজিক নিরাপত্তারও গুরুত্বপূর্ণ পাঠ দেয়।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত