প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বহুদিন ধরে চলমান উত্তেজনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের চালানো সাম্প্রতিক সামরিক হামলার পর। ওই হামলায় ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। যদিও তেহরান হামলার মাত্রা বা ক্ষয়ক্ষতির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু প্রকাশ করেনি, তবে দেশটির ভেতরে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এ ঘটনাকে ঘিরে বৈশ্বিক অঙ্গনে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা দিলেও সবচেয়ে দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে রাশিয়া। দেশটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে— ইরানের পরমাণু ইস্যুতে সামরিক হামলা বা চাপ নয়, প্রয়োজন শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধান।
রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মারিয়া জাখারোভা মস্কোতে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে উত্তেজনা প্রশমন ছাড়া কোনো দেশ লাভবান হবে না। তার ভাষায়, “এই সংকটের সমাধান শুধু রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পথেই সম্ভব। রাশিয়া সেই পথেই অটল আছে।” তিনি আরও বলেন, যে কোনো সামরিক পদক্ষেপ পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তাকে আরও অস্থিতিশীল ও জটিল করে তুলবে।
জাখারোভার বক্তব্যে স্পষ্ট ছিল, ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ যেমন বাড়ছে, তেমনই পাল্টা প্রতিক্রিয়ার ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে হওয়া ফোনালাপেও এই ইস্যুটি গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। রুশ সংবাদ সংস্থা তাস জানিয়েছে, ওই আলাপচারিতায় ইরান তার উদ্বেগ জানিয়েছে এবং রাশিয়া কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে।
মারিয়া জাখারোভা বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা— আইএইএ— যেসব স্থাপনাকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করে থাকে, সেগুলোতে সামরিক হামলা ‘অগ্রহণযোগ্য’। তিনি উল্লেখ করেন, ইরানের উপর চালানো মার্কিন হামলা শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাই হুমকিতে ফেলেনি, বরং আন্তর্জাতিক অ-বিস্তার চুক্তি এনপিটি’র ভিত্তিকেও দুর্বল করেছে। তার ভাষায়, “এ ধরনের হামলা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি এক ধরনের অসম্মান।”
রাশিয়ার মতে, ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা বা সামরিক হামলার হুমকি দেওয়া— এসব কোনো সমাধান নয়। বরং এসবের ফলে ইরানসহ সমগ্র অঞ্চল আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে। জাখারোভা বলেন, ইরান এখনো আলোচনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং সংলাপের মাধ্যমেই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে চাইছে। কিন্তু যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে আলোচনায় ফেরার আগে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে নিশ্চয়তা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ইরানের পরমাণু স্থাপনাগুলোকে ভবিষ্যতে আর কখনো টার্গেট করা হবে না— এমন ‘গুরুতর নিশ্চয়তা’ দিতে হবে পশ্চিমা দেশগুলোকে। এর আগে তেহরানের পক্ষ থেকেও এমন দাবি তোলা হয়েছে। ইরান বারবার বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আত্মরক্ষা’ নামে চালানো এই হামলা আসলে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন এবং তা ভবিষ্যতে আরও বড় সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাশিয়ার এ বক্তব্য বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মস্কো মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের অন্যতম কৌশলগত সহযোগী। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার টানাপোড়েন এবং ইসরাইলের সঙ্গে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কও কূটনৈতিক অবস্থানকে প্রভাবিত করছে। এ ছাড়া সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইসরাইল-হামাস যুদ্ধ পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে যে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে, পরমাণু ইস্যুটি সেই অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
মস্কোর মতে, পশ্চিমা দেশগুলো যদি সত্যিই শান্তি চায়, তবে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ভাষা পরিত্যাগ করে কূটনৈতিক আলোচনা পুনরুদ্ধার করতে হবে। জাখারোভা বলেন, “নিষেধাজ্ঞার ভাষা বাদ দিয়ে সংলাপ শুরু করতে হবে। পারস্পরিক সম্মান ও সমান মর্যাদার ভিত্তিতে আলোচনা ছাড়া এই ইস্যুর সমাধান দৃষ্টিগোচর নয়।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে রাশিয়ার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি, যা জেসিপিওএ নামে পরিচিত, যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহার এবং ইরানের প্রতিক্রিয়া— দুই পক্ষের মধ্যেই অবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ফলে পারমাণবিক ইস্যু এখন শুধু প্রযুক্তি বা নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং বৈশ্বিক কূটনীতির বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে।
রাশিয়া বলছে, এই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার একমাত্র পথ হলো আলোচনার টেবিলে ফেরা। আর সেই আলোচনায় সব পক্ষকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছে মস্কো। দেশটির মতে, একতরফা চাপ বা সামরিক প্রদর্শন কোনো পক্ষকেই এগিয়ে নেবে না; বরং নতুন সংঘাতের জন্ম দেবে। জাখারোভা শেষ পর্যন্ত তার বক্তব্যে জোর দিয়ে বলেন, “রাশিয়া শান্তি চায়। পরমাণু ইস্যুতে সহিংসতার নয়, সংলাপের পথেই সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব।”
মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার এই সময়ে রাশিয়ার এমন অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, সেটি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল, ইরানসহ বিভিন্ন পক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। আপাতত কূটনৈতিক বার্তা স্পষ্ট— সামরিক হামলা নয়, আলাপ-আলোচনার পথেই রয়েছে ভবিষ্যতের সমাধান।










