ব্রাকসুর ভোট ২৪ ডিসেম্বর: শিক্ষার্থীদের দাবিতে তারিখ বদল

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৮১ বার
ব্রাকসুর ভোট ২৪ ডিসেম্বর: শিক্ষার্থীদের দাবিতে তারিখ বদল

প্রকাশ: ২১ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ—ব্রাকসু—নির্বাচন ঘিরে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে না ঘটতেই তৈরি হয়েছিল নতুন বিতর্ক। ১৮ নভেম্বর ঘোষিত তফসিলে ২৯ ডিসেম্বর ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করার পর থেকেই শিক্ষার্থীদের একাংশ এতে আপত্তি জানায়। তাদের যুক্তি ছিল, বড়দিনসহ টানা ছুটির কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান করতে পারবে না, ফলে ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক থাকবে না। এই যুক্তিকে সামনে রেখে শিক্ষার্থীরা সংগঠিত হতে শুরু করে, সংবাদ সম্মেলন থেকে বিক্ষোভ মিছিল—বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানায়। অবশেষে সেই দাবিকেই গুরুত্ব দিয়ে নির্বাচন কমিশন ভোটগ্রহণের তারিখ এগিয়ে এনে ২৪ ডিসেম্বর নির্ধারণ করেছে।

শুক্রবার মধ্যাহ্নে ব্রাকসুর প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রফেসর ড. মো. শাহ্জামান নতুন সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, অংশগ্রহণ ও উদ্দীপনা—একটি ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মূল উপাদান। পূর্বনির্ধারিত তারিখে এ তিনটি বিষয়ের ওপরই অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছিল। বিশেষ করে বড়দিনের ছুটি ২৫ ডিসেম্বর, তার পরই সপ্তাহান্ত—ফলে টানা ছুটিতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী স্বাভাবিকভাবেই বাড়িতে বা নিজ নিজ এলাকায় চলে যাবে। যে পরিস্থিতিতে ২৯ ডিসেম্বর ভোট আয়োজন করলে তা ন্যায্যতা, অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক উৎসবের আবহ—কোথাও পূর্ণতা পেত না। নির্বাচন কমিশন তাই শিক্ষার্থীদের দাবিকে যৌক্তিক বলে স্বীকার করে এবং ভোটগ্রহণের দিন এগিয়ে আনে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে কয়েক দিন ধরে এই বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট উত্তাপ ছিল। শিক্ষার্থীদের ভিড় দেখা গেছে প্রশাসনিক ভবনের সামনে। কেউ কেউ প্ল্যাকার্ড হাতে, কেউ ব্যানারে স্লোগান—সবাই এক কথায় বলছিল, “ছুটিতে নির্বাচন নয়, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে নির্বাচন চাই।” অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনগুলোতে বহুবার দেখা গেছে যে, উপস্থিত শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণই মূল আকর্ষণ। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা চাইছিলেন একটি উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু শিক্ষার্থী জানান, যে দিনগুলোতে ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি, ক্লাব কার্যক্রম কিংবা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হয়, সেসব দিনে বিশ্ববিদ্যালয় যেন আলাদা প্রাণ ফিরে পায়। ঠিক তেমনি একটি নির্বাচনের দিনও হওয়া উচিত উদ্দীপনা, উত্তেজনা ও অংশগ্রহণে ভরপুর। অথচ ২৯ ডিসেম্বর ভোট হলে ক্যাম্পাস প্রায় ফাঁকা থাকার আশঙ্কা ছিল, যা শুধু ভোটের পরিবেশকে নিস্তেজ করে দিত না, বরং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা ও আগ্রহে বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারত।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে, ভোটগ্রহণের দিন পরিবর্তন করা হলেও অন্যান্য কার্যক্রম একই থাকবে। শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে ডোপ টেস্টের ক্ষেত্রে। পূর্বঘোষিত তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন দাখিলের পর তিন দিন সময় পাওয়া যেত ডোপ টেস্টের রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য। তবে নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এত সময় রাখা হচ্ছে না। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়ই প্রার্থীদের ডোপ টেস্ট রিপোর্ট জমা দিতে হবে।

এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, এটি নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কোনো প্রকার জটিলতা সৃষ্টি করবে না। বরং প্রয়োজনীয় শর্ত আগেই পূরণ হয়ে গেলে সমগ্র প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ, সুশৃঙ্খল ও নির্ভুলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে। এছাড়া সময় সংকোচনের কারণে কমিশনের ওপর অতিরিক্ত কোনো চাপও সৃষ্টি হবে না বলে তিনি আশা ব্যক্ত করেন।

ব্রাকসু নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা নতুন কিছু নয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৭ বছর পর আইনে সংশোধন এনে ছাত্র সংসদের বিধান যুক্ত করা হয়। এরপর দুই দফা নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নানা প্রশাসনিক জটিলতা এবং ছাত্র সংগঠনের দাবিদাওয়া মিলিয়ে নির্বাচন আয়োজন বিলম্বিত হয়েছিল বহুবার। ১৮ নভেম্বর রাতের ঘোষণার মধ্য দিয়ে অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান ঘটে। আর তারিখ পরিবর্তন করে ২৪ ডিসেম্বর নির্ধারণ করার মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন শিক্ষার্থীদের বক্তব্যকে প্রাধান্য দিয়েছে—এমনই মত অনেকের।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও প্রশাসনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তারা চাইছেন একটি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করতে। একটি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ শুধু শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র নয়; এটি শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বগুণ, সাংগঠনিক দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের পাঠও শেখায়। তাই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, তার ইতিবাচক দিক হলো—এতে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক চর্চা ও আলোচনার পরিবেশ আরও দৃঢ় হয়েছে।

অনেক শিক্ষার্থী বলেছেন, ব্রাকসু নির্বাচন শুধু ভোটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নেতৃত্বকে তৈরি করার একটি প্ল্যাটফর্ম। যারা আজ প্রার্থী হবে, বিজয়ী হবে কিংবা নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেবে, তারাই আগামী দিনে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে উঠে আসবে। তাই এই নির্বাচন নিয়ে যে সার্বিক আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে, তা বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচক সংকেত।

ক্যাম্পাসে এখন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। পোস্টার, লিফলেট, প্রার্থীদের পরিচিতি সভা—সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হচ্ছে। প্রশাসন জানিয়েছে, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া শান্তিপূর্ণ রাখতে তারা প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও তদারকি জোরদার করবে। নির্বাচন কমিশনও জানিয়েছে, কোনো প্রকার অনিয়ম, প্রভাব বা সংঘর্ষ এড়াতে তারা কঠোর অবস্থানে থাকবে।

সম্প্রতি দেশের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন ঘিরে যে ধরনের সংঘাত, সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা দেখা গেছে, তা যেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে না ঘটে—এমন প্রত্যাশা শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক সবাই প্রকাশ করেছেন। তারা মনে করেন, সচেতনতা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ প্রদর্শন করলেই একটি স্বচ্ছ, সুন্দর ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব।

তারিখ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের আনন্দিত করেছে। অনেকেই বলেছেন, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—এটি নিজেরাই গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। এতে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে যে বিশ্বাসের সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা ভবিষ্যতের নানা সিদ্ধান্তে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, তারিখ পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্রাকসু নির্বাচন এখন আরও গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও প্রাণবন্ত এক উৎসবে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। শিক্ষার্থীরা আশা করছেন, আসন্ন ২৪ ডিসেম্বর তাদের ক্যাম্পাস সাজবে গণতন্ত্রের আলোকিত উৎসবে, যেখানে মত, ভাবনা ও স্বপ্নের মুক্ত বিনিময় ঘটবে।

এই নির্বাচন শুধু একটি তারিখে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আকাঙ্ক্ষা, দাবি, দায়িত্ববোধ ও গণতান্ত্রিক চর্চার নতুন অধ্যায়ের সূচনা।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত