দেশজুড়ে উদ্বেগ: নরসিংদীতে ৫.৫ মাত্রার ভূমিকম্প — বিশেষজ্ঞরা বলছেন ‘এটি হয়তো বড় কিছুর পূর্বাভাস’

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২২ বার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন | ২১ নভেম্বর ২০২৫ |

আজ ২১ নভেম্বর সকালে নরসিংদীর ঘোড়াশালকে কেন্দ্র করে ম্যাগনিচিউড ৫.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্পে কাঁপল বাংলাদেশ। ভূমিকম্পটির সময় দেশের বিভিন্ন স্থানে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, অনেকে বাসাবাড়ি ও অফিস থেকে ছুটে বের হয়ে খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন। ঢাকায়ও ভয়ের সঞ্চার হয়, অনেক উঁচু ভবনে কম্পন বেশ প্রকট ছিল। শুধু বাংলাদেশেই নয়, এ কম্পন অনুভূত হয়েছে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, বিশেষ করে কলকাতায়ও। ফলে এই ভূমিকম্পকে পৃথক একটি ঘটনা হিসেবে নয়, বরং অঞ্চলজুড়ে বিস্তৃত টেকটোনিক অস্থিরতার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ বছরের ২৮ মার্চও বাংলাদেশে হালকা মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়, যার তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৪.৫। তবে সেটির উৎপত্তিস্থল ছিল মায়ানমার। আজকের ভূমিকম্পটি এর থেকে ভিন্ন, কারণ এর কেন্দ্রস্থল বাংলাদেশেই নরসিংদীতে। অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরের কোনো সক্রিয় ফল্ট লাইনে চাপ জমতে থাকলে এ ধরনের মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প দেখা দিতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় বিপদের ইঙ্গিতও হতে পারে।

বিশ্বের ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মানচিত্রে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে বিবেচিত। কারণ দেশটি ভারতীয়, ইউরেশিয়ান এবং বার্মা এই তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে অবস্থিত। এই সংযোগস্থলের প্রতিনিয়ত চাপ ও সরে যাওয়ার ফলে ভূমিকম্প সৃষ্টির ঝুঁকি থাকে সবসময়ই। ভূতাত্ত্বিকদের মতে, বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব অঞ্চল, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও ঢাকার নিচে সক্রিয় ফল্ট লাইন রয়েছে, যেগুলো যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প ঘটাতে পারে।

ইতিহাস বলছে, উপমহাদেশে বড় ভূমিকম্পের পুনরাবৃত্তি ১০০ বছর বা তার কাছাকাছি ব্যবধানে ঘটে থাকে। ১৯১৮ সালে সিলেট-স্রিমঙ্গল এলাকায় রিখটার স্কেলে ৮ মাত্রার একটি ভয়াবহ ভূমিকম্প হয়েছিল। সেই ঘটনার পর ১০০ বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে, আর এখন ২০২৫ ফলে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, একটি বড় আঘাতের সম্ভাবনা সময়ের ব্যবধানে আবার সামনে চলে এসেছে। যদিও ঠিক কখন ভূমিকম্প হবে তা বিজ্ঞান এখনো নির্দিষ্ট করে বলতে পারে না, তবে বিভিন্ন সূচক ও ছোট ছোট ভূকম্পন বৃদ্ধির ধারা বড় কিছুর পূর্বাভাস হতে পারে।

বিগত কয়েক বছরের তথ্যও এই আশঙ্কাকে আরও প্রকট করে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় ছোট মাত্রার ২৮টি ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছিল। ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪১-এ। ২০২৪ সালে আরো বৃদ্ধি পেয়ে ৫৪টি ভূমিকম্প রেকর্ড হয়। এই ক্রমোর্ধ্বগতিকে বিশেষজ্ঞরা ‘টেকটোনিক স্ট্রেসের বৃদ্ধির ইঙ্গিত’ বলে মনে করছেন। বারবার ছোট কম্পন হওয়া মানে মাটির নিচে চাপ জমতে জমতে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু যদি বড় চাপ জমে থাকে, তবে কয়েকটি মাঝারি কম্পন দিয়ে সেটি প্রশমিত নাও হতে পারে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া অনেক পোস্টে উল্লেখ করা হচ্ছে, ভূমিকম্পের ধ্বংসক্ষমতাকে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো উদাহরণ রয়েছে সদ্য ঘটে যাওয়া মায়ানমারের ভয়াবহ ভূমিকম্প যেখানে রিখটার স্কেলে মাত্রা ছিল ৭.৭। সেখানে বহু ভবন ধসে পড়েছে, সেতু ভেঙেছে, রাস্তা উপড়ে গেছে, অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে তাসের ঘরের মতো। বাংলাদেশে যদি এরকম মাত্রার বা তার কাছাকাছি শক্তির কোনও ভূমিকম্প ঘটে, বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন রাজধানী ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহর ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।

ঢাকায় বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ মানুষের বাস। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় যদি ৭ মাত্রা বা তার বেশি ভূমিকম্প হয়, তবে প্রায় ৭২ হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ধার কার্যক্রম কার্যত অসম্ভব হয়ে যাবে। অতীতে সাভারে শুধুমাত্র একটি ভবন ধসে পড়ার ঘটনায় উদ্ধার অভিযান চালাতে লেগেছিল সাত দিন। সে তুলনায় হাজার হাজার ভবন ধসে গেলে পরিস্থিতি কেমন ভয়ঙ্কর হতে পারে তা কল্পনাই শিহরণ জাগায়।

বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সব ধরনের লাইনে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। আগুন লাগা, রাস্তা ধসে যাওয়া, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এসব বিপর্যয় একই সঙ্গে ঘটতে পারে। সিলেট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের নিচেও সক্রিয় ফল্ট লাইন থাকায় সেখানে ঝুঁকি দ্বিগুণ।

সামাজিক প্রতিক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, অনেকেই আতঙ্ক, শঙ্কা, ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করছেন। আবার বহু মানুষ ধর্মীয় অনুভূতি দিয়ে ঘটনাকে ব্যাখ্যা করছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ লিখেছেন, আমরা হয়তো বিপদকে হালকাভাবে নেই, ভূমিকম্প নিয়ে রসিকতা করি, প্রকৃতির সতর্কতা উপেক্ষা করি এ কারণেই মানুষ আরো ভীত-আতঙ্কিত হয়ে পড়ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধর্মীয় আস্থার পাশাপাশি প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি, নিরাপদ ভবন নির্মাণ, উদ্ধারব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং প্রতিটি নাগরিকের ভূমিকম্প সচেতনতা বাড়ানো।

সব মিলিয়ে আজকের নরসিংদীর ভূমিকম্প শুধু একটি ক্ষণস্থায়ী কম্পন নয়, বরং দেশজুড়ে ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হয়ে উঠেছে। দেশের ভূপ্রকৃতিগত বাস্তবতা বৈজ্ঞানিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল তাই প্রয়োজন পরিকল্পিত নগরায়ণ, নির্মাণবিধি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিটি ছোট কম্পনই যেন বার্তা দিচ্ছে “সময় থাকতে সাবধান হও, প্রস্তুতি নাও।”

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত