নতুন কুঁড়িতে দেশসেরা শুভমিতা: সুনামগঞ্জের শিশু প্রতিভার দুর্দান্ত সাফল্য

রিপোর্টারের নাম
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২২ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৩২ বার

প্রতিভা কখনওই জায়গার সীমাবদ্ধতায় আটকে থাকে না—এ কথাটির এক উজ্জ্বল উদাহরণ সুনামগঞ্জের শুভমিতা তালুকদার। জন্ম সুনামগঞ্জের মধ্যনগর উপজেলার দূর-দূরান্তের কলুমা গ্রামে হলেও তার কণ্ঠ আজ মুগ্ধ করছে জাতীয় দর্শক-শ্রোতাদের। এবারের নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় ‘খ’ বিভাগে দেশসেরা শিশুশিল্পীর মুকুট জিতে শুভমিতা শুধু নিজেকে নয়, সুনামগঞ্জকেও গর্বিত করেছে। তার সঙ্গে সিলেট বিভাগের আরও পাঁচ শিশুশিল্পী বিভিন্ন বিভাগে পুরস্কার পেয়ে অঞ্চলটিকে আলোয় ভাসিয়েছে। এই ছয় জনের মধ্যে পাঁচজন সুনামগঞ্জ ও একজন মৌলভীবাজারের।

রবীন্দ্রসংগীতে প্রথম, নজরুলসংগীতে দ্বিতীয় এবং দেশাত্মবোধক গানে পঞ্চম স্থান—একই প্রতিযোগিতায় তিনটি স্বীকৃতি শুভমিতার বহুমাত্রিক সংগীতপ্রতিভাকে নতুনভাবে সামনে এনে দিয়েছে। শিশু বয়সেই সংগীতের প্রতি তার মনোযোগ, অনুশীলন আর আবেগ তাকে এই পর্যায়ে তুলে এনেছে।

সুনামগঞ্জের আরেক প্রতিযোগী দিশান রায় দুর্জয় ‘খ’ বিভাগে কৌতুকে প্রথম হয়েছে। কৌতুকে দ্বিতীয় হয়েছে এহসানুল হক এবং তৃতীয় তাসফিয়া মুনতাহা—দুজনেই সুনামগঞ্জের শিশু প্রতিভা। অন্যদিকে ‘ক’ বিভাগে রবীন্দ্রসংগীতে তৃতীয় হয়েছে শুভশ্রী সরকার। মৌলভীবাজারের জেরাল্ড বিশ্বাস কৌতুকে দ্বিতীয় হয়ে অঞ্চলের সাফল্যে যোগ করেছে নতুন মাত্রা। যদিও সিলেট ও হবিগঞ্জ জেলার কেউ এবার পুরস্কার পায়নি, তবুও সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের উজ্জ্বল উপস্থিতি নজর কেড়েছে।

শুভমিতার প্রতিভার গল্প নতুন নয়। জাতীয় শিশু পুরস্কার প্রতিযোগিতা ২০২৩-এ উচ্চাঙ্গ সংগীতে তৃতীয় স্থান এবং ২০২৪ সালের জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে রবীন্দ্রসংগীতে দ্বিতীয় স্থান পেয়ে সে আগেই নিজ যোগ্যতার জানান দিয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই গানের প্রতি তার ভালোবাসা ছিল প্রবল। তার কণ্ঠের সাবলীলতা, আবেগ ও নিষ্ঠা তাকে খুব অল্প বয়সেই জাতীয় মঞ্চে পরিচিত করে তোলে।

২০১২ সালের ১৪ অক্টোবর জন্ম নেওয়া এই কিশোরী বর্তমানে সুনামগঞ্জ উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। রোল নম্বর ০১—যেন শ্রেণি থেকে মঞ্চ, সব জায়গাতেই সে প্রথম হওয়ার গল্প লিখছে। পড়াশোনা ও সংগীত—দুটোই সমান যত্নে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করে শুভমিতা। তার বাবা দ্বীপন কুমার তালুকদার এবং মা শান্তনা সরকার—দুজনই শিক্ষক। পরিবারের শিক্ষামূলক পরিবেশ, সাংস্কৃতিক অনুরাগ ও উৎসাহ তাকে আরও আত্মবিশ্বাসী করেছে। প্লে-গ্রুপ থেকেই তার সংগীতযাত্রা শুরু, আর আজ সেটি জাতিকে গর্ব করার গল্প।

তার সংগীত শিক্ষক সন্তোষ কুমার চন্দ মন্তোষ এবং অনিমেষ বিজয় চৌধুরীর নিবিড় প্রশিক্ষণে শুভমিতার গানের ভিত আরও মজবুত হয়েছে। শিক্ষকরা বিশ্বাস করেন—এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে শুভমিতা একদিন দেশের সেরা কণ্ঠশিল্পীদের একজন হয়ে উঠবে।

নতুন কুঁড়ির আঞ্চলিক বাছাই থেকে জাতীয় মঞ্চ পর্যন্ত শুভমিতার প্রতিভা প্রতিটি ধাপে বিচারকদের দৃষ্টি কেড়েছে। তার পরিবেশিত ‘এক নদী রক্ত পেরিয়ে’, ‘দোলা লাগিল দখিনার বনে বনে’ ও ‘আমারে তুমি অশেষ করেছ’ গানগুলো হাজারো দর্শক-শ্রোতাকে আবেগে ভাসিয়েছে। গত ১৩ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূসের কাছ থেকে ট্রফি ও তিন লাখ টাকার চেক গ্রহণের সময় এক টুকরো স্বপ্ন যেন বাস্তবে রূপ নিল। পুরস্কার হাতে নিয়ে শুভমিতার স্বপ্ন আরও বড় হয়েছে—“একদিন দেশের সংগীতকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়িয়ে দিতে চাই।”

দীর্ঘ ২০ বছর পর নতুন উদ্যমে ফিরেছে নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতা—প্রায় ৩৯ হাজার প্রতিযোগীর অংশগ্রহণে দেশের সবচেয়ে বড় শিশু শিল্প-উৎসব। ৬৪ জেলা, ১৯ অঞ্চল, ১২টি বিভাগ, ২৭৯ জন ফাইনালিস্ট—এত বিশাল প্রতিযোগিতায় শুভমিতা ‘খ’ বিভাগে সেরাদের সেরা হয়েছে; যা নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী অর্জন। ২৯৩ জন দক্ষ বিচারকের কঠোর মূল্যায়নে বাছাই করা এই ফলাফল প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা ও গুরুত্বও তুলে ধরে।

নতুন কুঁড়ি শুধু প্রতিযোগিতা নয়—এটি শিশুশিল্পীদের জন্য শিল্পজীবনের প্রথম পাঠশালা। এখানে দাঁড়িয়ে গান, অভিনয়, আবৃত্তি কিংবা গল্প বলা—সবই তাদের আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলে, তৈরি করে ভবিষ্যতের শিল্পী মানস। সিলেট বিভাগের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে উঠে আসা এই ছয় প্রতিভাবান শিশুর সাফল্য প্রমাণ করে, গ্রাম-শহর নয়—বাস্তব পরিবর্তন ঘটায় পরিশ্রম, স্বপ্ন আর অদম্য অধ্যবসায়।

শুভমিতা, দুর্জয় এবং অন্যদের সাফল্য এখন সিলেট বিভাগের হাজারো শিশুর জন্য অনুপ্রেরণা—যারা হয়তো আজই নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত