প্রকাশ: ২৩ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দুই দশক আগেও সিলেটে ব্যবসা ও বাণিজ্যে নারীদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই সীমিত। দৃশ্যপট এখন বদলে গেছে। আজ সিলেটে হাজারো নারী নিজেদের দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও উদ্যোগ নিয়ে দাঁড় করিয়েছেন ব্যবসা, খুলেছেন কর্মসংস্থানের নতুন পথ। কেউ শুরু করেছেন ঘরে বসে, কেউ গড়ে তুলেছেন প্রতিষ্ঠান, আবার কারও ব্যবসা ছড়িয়ে পড়েছে দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও। যদিও সিলেট বিভাগে কত নারী ব্যবসায় যুক্ত—এ নিয়ে সরকারি কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান নেই, তবে বিভিন্ন সংস্থার হিসেবে সংখ্যা কমপক্ষে ছয় থেকে সাত হাজার।
সিলেট উইমেন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি লুবানা ইয়াসমিন জানান, আগে নারী উদ্যোক্তা মানেই পোশাক, সেলাই, বিউটি পারলার কিংবা টেইলার্সকেন্দ্রিক ব্যবসায় সীমাবদ্ধতা ছিল। এখন সময় বদলেছে। রেস্তোরাঁ, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, ঠিকাদারি, আইটি, অনলাইন সেবা, ফ্রিল্যান্সিং, কুটিরশিল্প, চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রি, ক্যাটারিংসহ প্রায় সব ধরনের ব্যবসায়ই নারীরা নিজেদের অবস্থান শক্ত করছেন। সামাজিক বাধা, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা এবং পুরুষ-শাসিত দৃষ্টিভঙ্গির দেয়াল ভাঙতে ভাঙতে এখন নারীরা সিলেটের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হচ্ছেন বলে মনে করেন তিনি।
এই দৃশ্যপটের উদাহরণ ছড়িয়ে আছে সিলেটের নানা ঘরে। শিবগঞ্জের রায়হানা খানম (রেশমা) তাদের মধ্যে একজন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে তিনি হাতে তৈরি কুরশিকাঁটা পণ্যের ব্যবসা করছেন ‘কুরশিকাঁটা গ্যালারি’ নামে। ছোটবেলায় মায়ের কাছ থেকে সূচিশিল্প শেখা রায়হানা এই দক্ষতাকেই পরিণত করেছেন জীবিকার পথে। শাড়ি, ব্যাগ, নামাজের টুপি, কাপড়ের জুতা, শোপিস, কুশন কভার, টেবিল-ক্লথসহ নানা পণ্য তিনি তৈরি করেন এবং বিক্রি করেন পাইকারিভাবে ও অনলাইনে। শুরুতে তাঁর ব্যবসা ছিল ছোট পরিসরে, তবে সন্তানের পড়ালেখা থেকে সংসারের অনেক খরচই এসেছে এই আয় থেকে। এখন সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত, তবে নিজের আত্মনির্ভরতার স্মৃতিই তাঁকে গর্ব দেয়। তিনি বললেন, সংসার চালাতে একসময় স্বামীর পাশাপাশি তিনিও আয় করতেন, সন্তানদের মানুষ করেছেন—বুঝতে পারলে মনে তৃপ্তি আসে।
করোনার পর অনলাইনে তার ক্রেতা-পণ্যের চাহিদা আরও বেড়েছে। প্রতি মাসে অর্ডার আসে নানা জিনিসের। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে তিনি পাইকারি পণ্য সরবরাহ করেন। ১ ডিসেম্বর নতুন শোরুমও চালু করছেন, যেখানে দেশ থেকে বিদেশ পর্যন্ত অর্ডার আসছে।
নারী উন্নয়নের এই গল্প আরও বড় আকার নেয় শাহি ঈদগাহের উদ্যোক্তা রুনা বেগমের হাতে। তাঁর প্রতিষ্ঠান ‘নকশিকাঁথা’ থেকে প্রতি মাসে সিলেটের বিভিন্ন বিপণিবিতানে হাজার হাজার হাতের কাজের কাঁথা ও বিছানার চাদর সরবরাহ হয়। তাঁর অধীনে প্রায় ৪০০ নারীর কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। সংসারের অভাব দূর করতে ২০০৮ সালে ব্যবসা শুরু করা রুনা এখন সিলেটে সফল উদ্যোক্তাদের একজন। বললেন, আগে কেউ চোখ কুচকে দেখতেন, এখন সম্মান করেন, প্রশংসা করেন। লেগে থাকলে সফল হওয়া যায়—নিজের পথচলাই তার প্রমাণ।
উইমেন চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, এ চেম্বারের সদস্য প্রায় ২৮০ জন, তবে এর বাইরে আরও অনেক নারী উদ্যোক্তা আছেন যারা অনলাইন বা নিজস্ব শোরুমে নিয়মিত ব্যবসা করছেন। বিশেষ করে কোভিডের পর অনলাইন ব্যবসায় নারীদের অংশগ্রহণ অনেক বাড়ে। সবাই যখন স্থবিরতায় থেমে ছিলেন, তখন বহু নারী অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে বেছে নিয়ে ঘরে বসেই ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন। এখন তাদের পণ্য যাচ্ছে সিলেট থেকে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।
এস এস গ্যালারি ক্র্যাফটের মালিক সুইটি সূত্রধর বললেন, অনলাইনে সফলতার আসল চাবিকাঠি হলো বিশ্বস্ততা। যারা মানসম্মত ও সঠিক পণ্য দেন, তাদের ব্র্যান্ড দ্রুত প্রতিষ্ঠিত হয়। এ কারণে এখন সিলেটের শত শত নারী এই পেশায় নিজেদের জায়গা করে নিচ্ছেন।
তবে উদ্যোক্তাদের চাহিদাও আছে। ব্যবসার গতিকে আরও সহজ করতে নারীরা চান সরকারিভাবে বাজারজাতকরণ ও প্রদর্শনী সুযোগ বৃদ্ধি। শহরের বিভিন্ন এলাকায় শুক্রবার ও শনিবার হলিডে মার্কেট চালু হলে নারীরা আরও বেশি পণ্য প্রদর্শন ও বিক্রির সুযোগ পাবেন। প্রশিক্ষণ, ব্যাংক ঋণসহ আনুষ্ঠানিক সহায়তা বাড়লে আরও বহু নারী ব্যবসায়ে যুক্ত হবেন। সুরমা নদীর তীরেও উন্মুক্ত এলাকায় নারীদের পণ্য প্রদর্শনীর স্থায়ী ব্যবস্থা করা গেলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও গতি পাবে—এমন মত দিয়েছেন একাধিক উদ্যোক্তা।
সিলেটের নারীরা আজ শুধু ব্যবসার চিত্র বদলাচ্ছেন না, বদলে দিচ্ছেন অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও সম্মান অর্জনের সংজ্ঞা। একজন নারী ব্যবসায়ী উদ্যোক্তা হিসেবে দাঁড়ালে তার সঙ্গে বাড়ে আরও নারীর কাজের সুযোগ, পরিবার ও সমাজে তৈরি হয় ইতিবাচক পরিবর্তন। আর এই শক্তি প্রতিদিন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে সিলেটের বাজার, শোরুম এবং অনলাইন ব্যবসায়—যেখানে দৃঢ়ভাবে লেখা রয়েছে হাজারো নারীর স্বপ্ন, পরিশ্রম ও সাফল্যের গল্প।