ভূমিকম্পে বড় ক্ষতির বার্তা, প্রস্তুতির পরামর্শ রিজওয়ানার

একটি বাংলাদেশ অনলাইন
  • আপডেট টাইম : সোমবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২৩ বার
ভূমিকম্পে বড় ক্ষতির বার্তা, প্রস্তুতির পরামর্শ রিজওয়ানার

প্রকাশ: ২৪ নভেম্বর ২০২৫ | নিজস্ব সংবাদদাতা | একটি বাংলাদেশ অনলাইন 

রাজধানীতে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের তীব্রতায় দেশের মানুষ নতুন করে আতঙ্কে পড়লেও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলছেন, আতঙ্ক নয়, এখন সবচেয়ে জরুরি প্রস্তুতি গ্রহণ। তাঁর মতে, ভূমিকম্প বড় ক্ষয়ক্ষতির বার্তা দিয়েছে, তাই প্রস্তুত থাকা ছাড়া উপায় নেই। তিনি বলেন, যত দ্রুত প্রস্তুতির পথে এগোনো যাবে, তত দ্রুত মানুষ স্বাভাবিক নিরাপত্তা অনুভব করবে। সোমবার দুপুরে রাজধানীর রমনার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ ভবনে আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রাজউক।

‘ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে প্রস্তুতি ও করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় উপস্থিত ছিলেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধি, বিশেষজ্ঞ এবং নগর উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পের দৃষ্টান্ত তুলে ধরে শুরুতেই রিজওয়ানা হাসান বলেন, দেশ এমন দুর্যোগ একাধিকবার মোকাবিলা করেছে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়সহ নানা দুর্যোগে বাংলাদেশের মানুষ দৃঢ় সাহস দেখিয়েছে। তাঁর কথা অনুযায়ী, এই শক্তি নতুন করে ভয় কাটিয়ে প্রস্তুত হওয়ার অনুপ্রেরণা দেয়।

তিনি বলেন, বড় বন্যার ধাক্কা সয়ে বাংলাদেশ আবারও খুব দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়েছে। এমন জাতি ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগও মোকাবিলা করতে পারবে। তাঁর বক্তব্যে একটি আশাবাদ স্পষ্ট ছিল। তবে তিনি তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তার দিকেও গুরুত্বারোপ করেন। গত কয়েক বছর ধরে বারবার ভূমিকম্প হচ্ছে। কিন্তু এবারের ভূমিকম্প মানুষের মনে ভিন্ন রকম ভীতি তৈরি করেছে। তিনি বলেন, মানুষ তখনই ভয় কাটাবে, যখন প্রশাসন তাদের দোরগোড়ায় গিয়ে ঝুঁকি মূল্যায়ন করবে এবং বাস্তব পদক্ষেপ নেবে।

রিজওয়ানা হাসান মনে করেন, নগরের ভবনগুলোতে ঝুঁকি আছে কি না তা নিশ্চিত করা এখনই জরুরি। ভবনগুলোর শক্তি, নকশা, নির্মাণমান এবং ব্যবহারিক নিরাপত্তা পরীক্ষা করতে হবে। তার মতে, ব্যক্তিগত সম্পত্তির অজুহাতে এই কাজ থামানো যাবে না। মানুষকে সুরক্ষার জন্য রাজউককে প্রয়োজনে কঠোর হতে হবে। তিনি বলেন, জননিরাপত্তার স্বার্থে রাজউককে বিশেষ ক্ষমতা দেওয়াও যুক্তিযুক্ত হতে পারে। তিনি আরও বলেন, ভবন মালিকদের সহযোগিতা অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সরকারি সংস্থারই দায়িত্ব কঠোরভাবে এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা।

ঢাকার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদামগুলোর কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, পুরান ঢাকা আজও রাসায়নিকের হুমকিতে দাঁড়িয়ে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই বিপজ্জনক কেমিক্যাল রাখা হচ্ছে। অথচ দীর্ঘদিনেও এসব গুদাম স্থানান্তরের কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা রাজি হোক বা না হোক, মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কিছু নেই। তাই দ্রুততম সময়ে স্থায়ীভাবে এসব গুদাম সরিয়ে নেওয়া জরুরি।

সাম্প্রতিক ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর ছোট ছোট আফটার শক যে ঘটেছে, তাকে তিনি স্বস্তির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, বড় বিপদ আপাতত কেটে গেছে। তবে এ ধরনের ঘটনা আবার ঘটতে পারে। তাই প্রস্তুতি ছাড়া উপায় নেই। জনগণের প্রতি তাঁর বার্তা ছিল স্পষ্ট—আতঙ্ক নয়, জ্ঞান ও প্রস্তুতি যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

সভায় অন্য বক্তারাও ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাসে সমন্বিত পরিকল্পনার ওপর জোর দেন। তাঁরা বলেন, নগরের দ্রুত উন্নয়ন হলেও নিরাপত্তার বিষয়টি বহু ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত। ভবন নির্মাণে অনেক সময় নীতি-নিয়ম মানা হয় না। রাজউক ও সিটি করপোরেশনের অনুমোদন না নিয়েই বহু ভবন এখনো নির্মিত হচ্ছে। এসব ভবনের উপকরণ কতটা মানসম্মত, তার ওপর নজরদারি নেই। ফলে ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়। বক্তারা বলেন, এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেরি হলে ক্ষতির মাত্রা কয়েক গুণ বাড়বে।

রাজউকের কর্মকর্তারা বলেন, তারা ভবনের ঝুঁকি চিহ্নিত করার কাজ শুরু করেছেন। কয়েকটি এলাকায় জরিপও চলছে। তবে এই কাজ বড় আকারে চালাতে জনবল বাড়ানো দরকার। রাজউকের চেয়ারম্যানের মতে, মানুষের জীবন রক্ষাই এখন সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। তিনি বলেন, এ জন্য আইনের প্রয়োগও শক্তিশালী করতে হবে।

সেমিনার ঘিরে সাধারণ মানুষের উদ্বেগও আলোচনায় আসে। সাম্প্রতিক ভূমিকম্পে ঢাকার বহু মানুষ আতঙ্কে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। অনেক এলাকায় ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার কথাও শোনা যায়। এগুলোর অনেকই হয়তো পুরোনো অথবা নকশা অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ভয়ের নানা বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এসব গুজব বা ভুল খবর মানুষকে আরও অস্থির করে। তাই সঠিক তথ্য দ্রুত জানানো জরুরি।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, প্রশাসন যদি তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে কাজ করে, তবে মানুষ আস্থা পাবে। তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের তালিকা করা, জরুরি মহড়া চালানো, প্রশিক্ষণ দেওয়া, সচেতনতা বাড়ানো—এসবই এখন সময়ের দাবি। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে কাজ করলে ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরেও বড় ধরনের ক্ষতি অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, দুর্যোগ আগাম জানানো সম্ভব নয়। তবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। প্রস্তুতি নিলে জীবন বাঁচানো যায়।

সভায় বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভূমিকম্পের সময় কী করতে হবে তা সবার জানা উচিত। পরিবার, স্কুল, অফিস—সব জায়গায় নিয়মিত মহড়া হওয়া জরুরি। ভবনের বাসিন্দাদের নিরাপত্তার নিয়ম জানতে হবে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার শিক্ষাটা স্কুল থেকেই শুরু করতে হবে। দেশে এখনো অনেকেই জানেন না ভূমিকম্পের সময় কোথায় আশ্রয় নিতে হয়, কীভাবে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হয়।

সবশেষে রিজওয়ানা হাসান আবারও বলেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্প বড় ক্ষতির সতর্ক সংকেত। তাই তাকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, আমাদের বড় দুর্যোগ মোকাবিলার ইতিহাস আছে। সাহস আছে। অভিজ্ঞতা আছে। এবার দরকার কার্যকর প্রস্তুতি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রশাসন ও জনগণ একসঙ্গে কাজ করলে ভয় কাটবে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত