পুলিশের সিসি ক্যামেরার ১০ কোটি টাকা — বিশ্বাস ভেঙেছে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৮০ বার
পুলিশের সিসি ক্যামেরার ১০ কোটি টাকা — বিশ্বাস ভেঙেছে

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

কেরানীগঞ্জ উপজেলায় অপরাধ দমনের জন্য ‘সিসি ক্যামেরা’ স্থাপনের নামে দেওয়া ১০ কোটি টাকার কাজে এতদিন কোনো কার্যকর অগ্রগতি দেখা যায়নি। বরং অভিযোগ উঠেছে, পুরো অনুদান অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে — অভিযুক্ত হিসেবে উঠে এসেছে ঢাকার জেলা পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান-র নাম।

২০২৩ সালের ১০ নভেম্বর, ২০০টি সিসি ক্যামেরা বসানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে এই অর্থ দেয়া হয়েছিল। অনুদান সরবরাহকারী হিসেবে ছিল বসুন্ধরা গ্রুপ; চেক হস্তান্তর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তখনকার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান, স্থানীয় রাজনৈতিক ও পুলিশ উচ্চপদস্থরা। সে সময় বলা হয়, কেরানীগঞ্জের ৫টি ইউনিয়নের ২১টি গুরুত্বপূর্ণ রাস্তার মুখ সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হবে, এবং অপরাধ দমনে তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।

কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, সেই অনুদান পাওয়ার পর থেকে কখনোই কোনো ক্যামেরা বসার কাজ আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। এর পরিবর্তে ওই ১০ কোটি টাকার কোনো নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বা রিপোর্ট সাধারণ মানুষের কাছে প্রকাশ পায়নি। অনেকেই এখন বলছেন, পুরো অর্থটাই লোপাট হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ পুলিশের একাধিক সাবেক কর্মকর্তা, যারা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, নিশ্চিত করেছেন যে—চেক গ্রহণের পরই ‘ঢাকা জেলা সিসি ক্যামেরা স্থাপন’ প্রকল্পের নামে দুটি আলাদা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। একটি ছিল সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (SIBL) এবং অন্যটি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক। এই দুই অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় আট কোটি টাকা উত্তোলন করে এফডিআর (Fixed Deposit Receipt) করা হয়। আর ২০২৪ সালের মধ্যে মাত্র ২২ লাখ টাকারই খরচ দেখানো হয়েছে — যার মধ্যে ১৪ লাখ টাকা এসেছে এফডিআর মুনাফা থেকে এবং বাকী ৮ লাখ টাকা ছিল সিসি ক্যামেরা ফান্ড থেকে। বাকী অংশ কোথায় গেছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

২০২৫ সালের মধ্যেই, গত কয়েক মাস ধরে, “অভিযোগ” এবং “অভিযোগ” — এই আবর্তে নাম এসেছে বর্তমান পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামানের। বলা হচ্ছে, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর ওই টাকা তার ব্যক্তিগত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করেছেন। তার বিরুদ্ধে নাকি রেকার রশিদ ছাপানো, ঘুষ-লুট, বদলিবাণিজ্যের মতো গুরুতর অভিযোগও আছে।

একাধিক পুরনো সূত্র জানায়, আনিসুজ্জামান তার পুলিশের ক্যাডার পেয়ে ছিলেন সেইভাবে যে, তার পেছনে রয়েছে গোপনযোগী প্রক্রিয়া। ২০০৬ সালে তিনি পুলিশের ক্যাডারে জায়গা পান—বরísাপেক্ষক প্রভাবশালী কোনো মধ্যস্থতার মাধ্যমে। তারপর থেকে বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন, এবং সর্বশেষ ঢাকা জেলার দায়িত্ব পেয়ে অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগের একদিকে যেমন রয়েছে অর্থ আত্মসাত ও দলিলভুল আরেকদিকে রয়েছে পুলিশের সততা ও জবাবদিহিতার গুরুতর সংকট। এক পুলিশ কর্মকর্তা জানায়, ক্ষমতায় এসে ‘বদলিবাণিজ্য’ কেন্দ্র করে যারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিনের দায়িত্ব পেয়েছেন — তারা অনেকেই এখন প্রশ্নের মুখে। এমনকি এমন অভিযোগও উঠেছে যে, প্রিজাইডিং অফিসার, পোলিং অফিসার, সহকারী অফিসারদের নিয়োগ, বদলি, দায়িত্ব বণ্টন — সবই হয় “টাকার বিনিময়ে।” এর মাধ্যমে আশঙ্কা করা হচ্ছে, সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা, আইন-শৃঙ্খলা এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের প্রতিফলন হচ্ছে না।

অন্যদিকে, আসাদুজ্জামান, যা এখন রাজশাহী পুলিশ একাডেমিতে কর্মরত, তার যুক্তি ছিল—গত বদলির পর সিসি ক্যামেরা বসানো সম্ভব হয়নি। তিনি দাবি করেছিলেন, পুরো অর্থ এবং প্রক্রিয়া পরবর্তী পুলিশ সুপারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আর পরবর্তী পুলিশ সুপারও তার সময়টা অল্প বলে কাজটি এগাতে পারেননি।

এই অভিযোগের জবাবে আনিসুজ্জামান (বর্তমান সুপার) বলেছেন, বসুন্ধরা গ্রুপের দেওয়া টাকা “কোনোভাবেই” তার ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে যায়নি, এবং তিনি কোনো দুর্নীতি করেননি। তিনি দাবি করেছেন, ক্যামেরা স্থাপনের কাজ শুরু হয়েছিল, কিন্তু “কিছু অনিয়মের কারণে” কাজ বন্ধ রাখার নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। ফলে, প্রকল্প আপাতত স্থগিত। তিনি বলছেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আগে যে ব্যাংকে টাকা ছিল, পরে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে সেটি সরিয়ে অন্য ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়েছে।

কিন্তু পুলিশের অভ্যন্তরীণ বহু সূত্র—যেখানে উপচেপড়া অস্থিরতা, ভুল বদলি, অনিয়ম, রেকার-বাণিজ্য ও স্থানীয় পুলিশের কর্পোরেট গ্রুপগুলোর সঙ্গে মিশ্রণ-সবই তুলে ধরেছে—তাদের দাবি, ক্যামেরা বসানোর ১০ কোটি টাকা কোথায় যাবে, তার দায়বদ্ধতা বা জবাবদিহি কখনোই হয়নি।

এই ঘটনায় সাহিত্য নয়, শুধু নয়; এটি জনদ্রোহী। কেরানীগঞ্জের সাধারণ মানুষ, যারা অনিরাপদ সড়ক, অপরাধ ও চুরি-ডাকাতির শিকার হয়ে দিন কাটাচ্ছেন, তারা ‘সিসি ক্যামেরা’র প্রতিশ্রুতি আর ‘সন্ত্রাসী প্রতিরোধ’— দু’টি পক্ষেই বিশ্বাস করেছিল। কিন্তু এখন, সেই বিশ্বাস ভেঙেছে।

আর এখন প্রশ্ন — এই দৃশ্যমান ব্যর্থতা আর অভিযোগের মুখে, পুলিশ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি যথাযথ তদন্ত শুরু করবে? নাকি এই ১০ কোটি টাকা — যা জনগণের নিরাপত্তার নামে চাওয়া হয়েছিল — সেই অনুদানই হয়ে যাবে ব্যর্থ প্রতিশ্রুতি এবং একটি বিতর্কিত অতীতে?

একটি নিউরূপের প্রতিশ্রুতি পুঁজিভাবে শুরু হয়েছিল। কিন্তু এখন, সে প্রতিশ্রুতি শুধু শব্দ হয়ে গিয়েছে। ১০ কোটি টাকা যেখানে গেছে, তার সঠিক হিসাব, জনগণের সামনে তা উন্মুক্ত হওয়া দিন যত দ্রুত সম্ভব। কারণ একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক পুলিশি ব্যবস্থা না থাকলে, শুধু ক্যামেরা বা প্রতিশ্রুতি দিয়েও অপরাধ দমনের কাজ কখনো সফল হবে না।

এই ঘটনা শুধু কেরানীগঞ্জ-র নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক সামাজিক বিশ্বাস, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের পথে একটি সতর্কবার্তা।

(আপনারা, যদি চান — আমরা এই দুর্নীতি ও অপরাধরোধমূলক ব্যর্থতার পেছনে আর্থিক ও প্রশাসনিক জটিলতা, এবং এর পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাও খুঁজে দেখতে পারি।)

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত