প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যপুস্তকে বড় ধরনের পরিবর্তন এনে নতুন শিক্ষাবর্ষে রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ও বহু বিতর্কিত অধ্যায়গুলো নতুনভাবে পুনর্বিন্যাস করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড—এনসিটিবি। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ব্যবস্থার রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে সমালোচনার মুখে থাকা এই সংস্থাটি এবার সাহসী ও ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ নিয়ে ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ের রাজনৈতিক উত্থান-পতনকে তুলনামূলকভাবে খোলা ও বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিতে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। নতুন সংযোজিত বিষয়বস্তুগুলোর মধ্যে রয়েছে ’৭৫ সালের বাকশাল শাসনব্যবস্থা, শেখ হাসিনা সরকারের স্বৈরাচারী শাসনের বিতর্ক, ২০১৪ ও ২০১৮ সালের বিতর্কিত নির্বাচন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ফ্যাসিস্ট কাঠামোর পতন এবং হাসিনার পালিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নানা আলোচিত ঘটনা।
শিক্ষাবোর্ডের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এ বছরের পরিবর্তনটি অন্যান্য বছরের তুলনায় বিশেষভাবে বিস্তৃত, কারণ এতে সরাসরি রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতা, শাসন ব্যূহের রাজনৈতিক অপব্যবহার, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ক্ষয় এবং জনআন্দোলনের ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে। ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে সংযোজিত “স্বাধীন বাংলাদেশে গণ-অভ্যুত্থান” নামে নতুন অধ্যায়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। এই অধ্যায়ে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার জুলাই বিপ্লবের ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছে নতুন দৃষ্টিভঙ্গিতে।
বিশেষ আলোচনার জন্ম দিয়েছে একটি পরিবর্তন—অষ্টম শ্রেণির বাংলা সাহিত্য কণিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণ। এটি পাঠ্যবই থেকে সরানো নিয়ে ইতিমধ্যেই বহু পর্যায়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়েছে। তবে এনসিটিবির কর্মকর্তারা বলছেন, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত নয়; বরং পাঠ্যবইয়ের ভারসাম্য ও নতুন কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে করা হয়েছে। যদিও অনেক শিক্ষাবিদ মনে করছেন, এটি হঠাৎ করা সিদ্ধান্ত নয় এবং ভবিষ্যতে এর রাজনৈতিক ব্যাখ্যা নিয়ে আরও বিতর্ক দেখা দিতে পারে।
পাঠ্যবইয়ে নতুন করে স্থান পেয়েছে বাকশাল বা বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ গঠনের ইতিহাস। শেখ মুজিব সরকারের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ঘটনাকে এবার তুলনামূলকভাবে নিরপেক্ষ এবং বিশ্লেষণধর্মীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অধ্যায়টি পাঠ্যবইয়ে আংশিক বা পরোক্ষভাবে আসলেও এবার প্রথমবারের মতো সরাসরি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার সঙ্গে যুক্ত করে বাকশালের আলোচনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাকশালের মাধ্যমে সংবাদপত্র স্বাধীনতার অবসান, প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর অতিরিক্ত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও বিরোধী মত দমনের কারণে দেশ রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখে পড়ে।
আরও বেশি বিস্ময় সৃষ্টি করেছে শেখ হাসিনা সরকারের ২০০৯–২০২৪ সময়কালের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সুনির্দিষ্ট আলোচনা। নবম-দশম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয় বইয়ে লেখা হয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচন পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী, তারপর স্বৈরাচারী এবং শেষ পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী শাসনে পরিণত হন। রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন, মানবাধিকার লঙ্ঘন, বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর দলে অনুগত কাঠামো চাপিয়ে দেওয়া এবং ব্যাপক দুর্নীতির বিস্তার—সবকিছু এবার পাঠ্যবইয়ে বিস্তারিতভাবে স্থান পেয়েছে।
বইয়ে আরও বলা হয়েছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, যাতে ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের হাতে কেন্দ্রীভূত রাখা যায়। ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচন, ২০১৮ সালের আগের রাতে ব্যালট বাক্স পূর্ণ করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা এবং ২০২৪ সালের “প্রহসনের নির্বাচন”—এগুলোকে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে সত্য-ভিত্তিক আলোচনা তৈরির উদ্দেশ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
দুর্নীতির প্রসঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে সরকার পরিচালনার ব্যর্থতার গভীর চিত্র। বছরে ১৬ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচারের তথ্য, ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতি ও লুটপাট, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভিত্তি দুর্বল হওয়া এবং একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর হাতে রাষ্ট্রীয় সম্পদ আটকে যাওয়ার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়েছে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিভিন্ন গবেষণার ভিত্তিতে। বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে দুর্নীতি ছিল সুসংগঠিত এবং পরিকল্পিত, যার প্রভাবে দেশের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে।
পাঠ্যবইয়ে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার জুলাই গণআন্দোলনকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলা, ১৬ জুলাই রংপুরের রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামের শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরামসহ কয়েকজনের শহীদ হওয়া, তারপর সারাদেশে তীব্র বিক্ষোভ—সবই তুলে ধরা হয়েছে গভীর মানবিক বর্ণনায়।
লেখা হয়েছে, আন্দোলন দমাতে সরকারের বেপরোয়া বলপ্রয়োগের ফলে শত শত নিরস্ত্র ছাত্র-জনতা নিহত হন। কিন্তু সরকারের দমনযজ্ঞ যত ভয়াবহ হয়েছে, জনতার প্রতিরোধ তত শক্তিশালী হয়েছে। এবং শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটে। হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ কাঠামোর সহযোগীরা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নেন—এই ঘটনাও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করা হয়েছে।
এনসিটিবির একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত বছর বিতর্কিত কিছু অধ্যায় এবং ভুল তথ্য নিয়ে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল। এ বছরের বই তৈরি করতে তাই উচ্চপর্যায়ের কমিটির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা, যাচাই-বাছাই এবং বিভিন্ন তথ্যসূত্র পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে।
এনসিটিবির শিক্ষা ও সম্পাদনা বিভাগের প্রধান সম্পাদক মুহাম্মদ ফাতিহুল কাদীর জানিয়েছেন, দেশের শাসনতান্ত্রিক ইতিহাসকে বিকৃত না করে পাঠ্যবইয়ে তুলে ধরাই ছিল এ বছরের প্রধান লক্ষ্য। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যেন ইতিহাস শিখে, বোঝে এবং বিশ্লেষণ করতে পারে—সে উদ্দেশ্যেই নতুন অধ্যায়গুলো লেখা হয়েছে। যদিও বইগুলো অনলাইনে এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না, তবে আগামী বছরের শুরুর আগেই সব স্কুলে পাঠানো হবে।
এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক রিয়াদ চৌধুরী বলেছেন, পরিবর্তন বড় এবং চ্যালেঞ্জও বড়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই সময়মতো তুলে দিতে তারা প্রস্তুত।
নতুন পাঠ্যবইয়ের এসব পরিবর্তন এরইমধ্যে শিক্ষাঙ্গন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার ঝড় তুলেছে। কেউ বলছেন, এটি ইতিহাসের সত্য পুনরুদ্ধার। কেউ বলছেন, এটি নতুন রাজনৈতিক প্রভাবের সূচনা। কিন্তু যাই হোক, এ কথা স্পষ্ট—বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এটি এক বড় পরিবর্তন, যা আগামী প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে।