প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ক্ষমতার শিখরে থাকা অবস্থায় সর্বদা জনগণের সেবাকে নিজের কাজ হিসেবে ঘোষণা করা শেখ হাসিনার এককথার প্রতিশ্রুতি। “নিঃস্ব আমি, রিক্ত আমি” বলে তিনি বলতেন, নিজের কোনো ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নেই, সবই জনগণের কল্যাণে নিবেদিত। তবে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর একের পর এক তথ্য প্রকাশ পেতে থাকে, যা জনসাধারণের বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করছে। বর্তমানে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নামে থাকা অগ্রণী ব্যাংকের দুটি লকার ভেঙে পাওয়া গেছে ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার।
এই সংবাদে নতুন মাত্রা এসেছে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল (সিআইসি)-এর জারি করা রিপোর্টের মাধ্যমে। মঙ্গলবার রাজধানীর দিলকুশায় অবস্থিত অগ্রণী ব্যাংকের প্রধান শাখায় দুটি লকার জব্দ করা হয়। এনবিআরের এক কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, গত ১৭ সেপ্টেম্বর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সিআইসি লকার দুটি জব্দ করেছিল। তবে হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ায় আইনগত বাধার কারণে লকার ভাঙা সম্ভব হয়নি। আদালতের অনুমতি শেষে অবশেষে ভল্ট দুটি খোলা হয়। এতে ৭৫১ এবং ৭৫৩ নম্বর ভল্টে ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকার পাওয়া যায়। উদ্ধারকৃত স্বর্ণের বাজারদর বর্তমানে প্রায় ১৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে সিআইসির কর্মকর্তা আরও জানান, অগ্রণী ব্যাংকের লকারে শুধু স্বর্ণালংকার নয়, বেশ কিছু উপহারসামগ্রীও পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় তোশাখানায় জমা না দিয়ে এসব ব্যক্তিগত লকারে রাখা হয়েছিল, যা আইনের লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই ঘটনায় হাসিনার বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়েরের সম্ভাবনাও রয়েছে।
এটি প্রথমবার নয়। চলতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর, রাজধানীর মতিঝিলের সেনা কল্যাণ ভবনে অবস্থিত পূবালী ব্যাংকের করপোরেট শাখায় হাসিনার নামে থাকা ১২৮ নম্বর লকার জব্দ করা হয়েছিল। এই লকারে কোনো স্বর্ণ পাওয়া যায়নি, তবে ব্যাংক হিসাব চেক করার সময় দেখা গেছে, হাসিনার দুটি হিসাব রয়েছে। একটি হিসাবের এফডিআর ১২ লাখ টাকা, আরেকটি হিসাব থেকে ৪৪ লাখ টাকা পাওয়া গেছে।
শুধু তাই নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সরকারি সম্পদের অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে ১০ কাঠা সরকারি জমি বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগ ওঠেছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। এই প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় শেখ রেহানাসহ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। আদালত রায় ঘোষণা করার দিন ধার্য করা হয়েছে আগামী ১ ডিসেম্বর।
অপরাধ ও অনিয়মের এই তথ্যগুলো প্রকাশ হওয়ার পর রাজনৈতিক মহলে ও জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ক্ষমতার শীর্ষে অবস্থানরত একজন ব্যক্তির ব্যাংকের গোপন লকারে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণালংকার রাখা, সরকারি উপহারসামগ্রী ব্যক্তিগতভাবে সঞ্চয় করা এবং সরকারি জমি জালিয়াতির মাধ্যমে অর্জনের মতো অভিযোগ দেশের ইতিহাসে বিরল। এর মাধ্যমে শুধু আর্থিক কেলেঙ্কারিই নয়, নৈতিক ও মানবিক প্রশ্নও উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “ক্ষমতার অপব্যবহার থেকে এই ধরনের ধন সঞ্চয় একটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ। এটি দেশের সরকারি ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার অভাবকে প্রমাণ করে।” পাশাপাশি তারা যোগ করেছেন, “যখন একজন রাষ্ট্রনেতা জনগণের জন্য নিজের নিঃস্বতা ও স্বচ্ছতা দাবি করে, তখন এমন ধরণের ঘটনা জনবিশ্বাসকে চরমভাবে আঘাত করে।”
জনগণের প্রতিক্রিয়াও সমানভাবে তীব্র। অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে একজন প্রধানমন্ত্রী সরকারি সম্পদ ও উপহারকে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করতে পারেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের তথ্য প্রমাণিত হলে তা কেবল ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, এটি দেশের সরকারি ব্যবস্থাপনার নৈতিকতার জন্যও হুমকি হিসেবে দেখা দেয়।
এদিকে, আদালতের নিকট আগত এই মামলার প্রক্রিয়া প্রমাণের ভিত্তিতে চালানো হচ্ছে। আদালত নিশ্চিত করেছে, সিআইসির তদন্তের ফলাফল এবং ব্যাংক লকারের তথ্য বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। দেশের জনগণ এই মামলার ফলাফলের দিকে আগ্রহী। কারণ এটি শুধুমাত্র অর্থের বিষয় নয়, সরকারের নৈতিক দায়বদ্ধতার একটি পর্যালোচনার প্রতিফলন।
শিক্ষাবিদ ও সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের ঘটনা যুব সমাজের জন্য বড় শিক্ষণীয় বার্তা বহন করে। ক্ষমতা ও দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্যহীনতা সমাজের নৈতিক মানকে ক্ষুণ্ণ করে। তারা আরো বলেন, “যখন ক্ষমতাধারী ব্যক্তি স্বচ্ছতার বার্তা দেয়, কিন্তু ব্যক্তিগত লোভ ও দৌরাত্ম্যের জন্য সরকারি সম্পদের অপব্যবহার করে, তখন সমাজের বিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।”
এই ঘটনায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও মন্তব্য করেছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এটিকে প্রশাসনিক দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের নিদর্শন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। তারা আশা প্রকাশ করেছেন, বিচার প্রক্রিয়া ন্যায়সঙ্গত হবে এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, ক্ষমতা শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থ পূরণের জন্য নয়, বরং দেশের মানুষের কল্যাণ ও সরকারের নৈতিক দায়িত্ব পালনে ব্যবহার করা উচিত। সারা দেশের মানুষের নজর এখন আদালতের রায়ের দিকে। তারা আশা করছে, স্বচ্ছতা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা হবে এবং ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে।
শেষ পর্যন্ত, ক্ষমতার শীর্ষে থাকা অবস্থায় জনগণকে নিঃস্বতার প্রতিশ্রুতি দেয়া এবং পরবর্তীতে তার বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযোগ উঠে আসা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। শেখ হাসিনার ব্যাংক লকারে ৮৩২ ভরি স্বর্ণালংকারের ঘটনা শুধু একটি আর্থিক কেলেঙ্কারি নয়, এটি দেশের নৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।