প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে দেশ যখন ধাপে ধাপে এগোচ্ছে, তখন আর্থিক ক্ষেত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি থেকে রক্ষা করতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বুধবার দেশজুড়ে সব ব্যাংকের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের কাছে একটি বিশেষ সার্কুলারের মাধ্যমে জানানো হয়েছে, নির্বাচনের আগে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিদেশে ভ্রমণ করতে পারবেন না। এই নির্দেশনা ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা হয়েছে এবং তা অবিলম্বে কার্যকর হবে।
সার্কুলারের লক্ষ্য হলো নির্বাচনের সময় আর্থিক ব্যবস্থাপনায় যে কোনো ধরনের অস্থিরতা, দুর্বৃত্তি বা অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব এড়ানো। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই পদক্ষেপ মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নেয়া হয়েছে। কারণ নির্বাচনের সময় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যেকোনো ধরনের বৈদেশিক লেনদেন, পুঁজির সরবরাহ বা আর্থিক পরিকল্পনায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও জনগণের জীবিকায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারে বলা হয়েছে, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এবং অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া বিদেশ যাত্রা থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকিং খাতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যাতে নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত, নীতি নির্ধারণ এবং লেনদেন পর্যবেক্ষণ থেকে দূরে না থাকেন। এ সিদ্ধান্তের আওতায় সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও অন্তর্ভুক্ত থাকবেন, তবে তাদের ক্ষেত্রে প্রয়োজনে বিশেষ অনুমতি ভিত্তিক ছাড় দেওয়া যেতে পারে।
এই পদক্ষেপ নিয়েছে এমন সময়ে যখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পরিবেশে বিশেষ নজরদারি প্রয়োজন। বিশ্লেষকরা বলছেন, “নির্বাচনের সময় দেশের ব্যাংকিং সেক্টরে কোনো ধরনের বিচ্যুতি বা অনিয়ম যাতে না ঘটে, সে জন্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিয়ন্ত্রণ রাখা জরুরি।” কারণ ব্যাংকিং খাত দেশের অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিদেশে অবস্থানরত কোনো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দেশের নীতি, আর্থিক পরিস্থিতি বা জরুরি সিদ্ধান্তের সময় তৎপর থাকতে পারবে না, যা বিপদ ডেকে আনতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা। সার্কুলারে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, দেশের ব্যাংকগুলোর চেয়ারম্যান ও এমডিরা এই নির্দেশনা মেনে চলবেন এবং ব্যাংকিং কার্যক্রমের স্বাভাবিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করবেন। এতে ব্যাংকের ভেতরের ব্যবস্থাপনা ঝুঁকি হ্রাস পাবে এবং নির্বাচনের সময়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, “নির্বাচনের সময় ব্যাংক কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হলে সম্ভাব্য আর্থিক অপব্যবহার, অনিয়ম এবং দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। এটি একটি প্রাথমিক ও সতর্কতামূলক পদক্ষেপ, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত।” পাশাপাশি তারা উল্লেখ করেন, এর ফলে দেশের জনগণও নির্বাচনকালীন সময়ে ব্যাংকিং সেবা এবং আর্থিক লেনদেনে অপ্রত্যাশিত ব্যাঘাতের সম্মুখীন হবে না।
এ বিষয়ে ব্যাংক কর্মকর্তারা বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। একাধিক ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এ ধরনের পদক্ষেপ আমাদের দায়িত্ববোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। নির্বাচনের সময় আমাদের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। বিদেশ ভ্রমণ বন্ধ থাকায় আমরা পুরো মনোযোগ দিতে পারব। তবে এই নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ এবং প্রয়োজনীয়তা নির্বাচন শেষ পর্যন্ত বজায় থাকবে কি না, তা আমাদের জানা প্রয়োজন।”
সার্কুলারে আরও বলা হয়েছে, এটি কোনো শাস্তিমূলক বা বৈষম্যমূলক পদক্ষেপ নয়। বরং এটি একটি প্রশাসনিক নির্দেশনা, যা দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নির্বাচনী স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ কেবল সরকারের ভাবমূর্তির জন্য নয়, বরং দেশের সাধারণ জনগণ এবং ব্যাংকিং সিস্টেমের জন্যও একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
এর পাশাপাশি, সার্কুলারের মাধ্যমে ব্যাংক কর্মকর্তাদেরকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যে, জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কোনো বিদেশি লেনদেন বা আর্থিক কাজে তাদের অংশগ্রহণ সীমিত করা হবে। অর্থাৎ নির্বাচনের সময় সব ধরনের আর্থিক পরিকল্পনা এবং পুঁজির পরিচালনা মূল দেশে অনুষ্ঠিত হবে। এতে আন্তর্জাতিক লেনদেনে কোনো ধরনের অনিয়ম বা সিস্টেম ব্যাঘাত হওয়া এড়ানো সম্ভব।
দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত দেশের জন্য একটি ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। নির্বাচনের সময় ব্যাংকিং খাতে বিদেশী সংযোগ বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে যে কোনো ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, তা এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে হ্রাস করা সম্ভব। এক বিশ্লেষক মন্তব্য করেছেন, “নির্বাচনকালীন সময়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং স্বচ্ছতা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাংক কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখা হলে আর্থিক ক্ষতি ও অনিয়ম প্রতিরোধ করা সহজ হবে।”
অতএব, দেশের ব্যাংকিং সেক্টর এবং সাধারণ জনগণের জন্য এটি একটি সতর্কতামূলক পদক্ষেপ, যা নির্বাচনের সময়ে দেশের আর্থিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এছাড়াও এটি দেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, নির্বাচন এবং আর্থিক নীতিনির্ধারণের মধ্যে সংহতি বজায় রাখবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এই পদক্ষেপ নিশ্চিত করেছে যে, নির্বাচনকালীন সময়ে কোনো ব্যাংক কর্মকর্তা দেশের বাইরে অবস্থান করে গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক বিষয় ও নীতি নির্ধারণে অনুপস্থিত থাকবেন না। এটি একটি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ, যা দেশের অর্থনীতি ও জনগণের স্বার্থ রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।