প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ অব্যাহতভাবে বাড়ছে এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ। এই ঋণ বৃদ্ধির ধারা দেশের ব্যাংকিং খাত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য বড় সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
গত বছরের ডিসেম্বর মাসের তুলনায়, মাত্র নয় মাসে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ, মাত্র এক বছরের মধ্যে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণের মতো বেড়েছে। এই ঋণের বেড়ে যাওয়া তথ্য বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বুধবার প্রকাশ করা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, খেলাপি ঋণের এই বৃদ্ধির পেছনে বিভিন্ন অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক কারণ কাজ করছে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি শুধু ব্যাংকের সুরক্ষা ও ঋণের স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না, বরং এটি সাধারণ মানুষ ও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করছে। উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোকে আর্থিক ঝুঁকিতে ফেলে, যার ফলে নতুন ঋণ প্রদান কমে যেতে পারে এবং বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের গতিশীলতা হ্রাস পেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা আরও উল্লেখ করেন, দেশের ব্যবসায়িক খাতের কিছু অংশে ঋণের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও ফেরতের প্রতিশ্রুতি পূরণে অভাব রয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এতটা দুর্বল যে তারা সময়মতো ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না, যার ফলে খেলাপি ঋণ দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া, ঋণ বিতরণের প্রক্রিয়ায় তদারকির অভাব এবং কিছু ক্ষেত্রে অনিয়মও এই বৃদ্ধির পেছনের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঋণের এই হ্রাসপ্রাপ্তি বা স্থিতিশীলতা আনার জন্য ব্যাংকগুলোকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। খেলাপি ঋণ কমানোর জন্য পুনঃঋণ প্রদান নীতিমালা, ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক সক্ষমতা যাচাই এবং তদারকি বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যাংকিং খাতের স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণ ফেরত পাওয়ার হার বাড়ানো সম্ভব, যা খেলাপি ঋণ কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন যে, খেলাপি ঋণের এই উচ্চ পর্যায় যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। উচ্চ খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মার্জিন কমিয়ে দিচ্ছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য ঋণপ্রদানের ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে। এছাড়া, সাধারণ জনগণও ব্যাংকিং সেবার প্রতি আস্থা হারাতে পারে, যা অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে ধীর করে দেয়।
অর্থনীতিবিদরা আরও বলেন, খেলাপি ঋণ শুধু ব্যাংকিং খাতের সমস্যা নয়, এটি সমগ্র অর্থনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে জড়িত। দেশের ব্যবসায়িক খাতের উন্নতি ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণের সঠিক ব্যবস্থাপনা সম্ভব। নিয়মিত আর্থিক তদারকি, কর ও অডিট ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ব্যবসায়িক দায়িত্বশীলতার বৃদ্ধির মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে, সরকার ও নীতি নির্ধারকরা খেলাপি ঋণের এই উচ্চতা কমাতে ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে উদ্যোগী হয়েছেন। খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকিং খাতকে আরও স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল করে গড়ে তোলা হচ্ছে। পাশাপাশি, ঋণগ্রহীতাদের আর্থিক শিক্ষা, বাজেট পরিকল্পনা এবং ঋণ পরিশোধের সময়সূচি মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, খেলাপি ঋণের উচ্চ পরিমাণ দেশের অর্থনৈতিক পরিবেশের জন্য সতর্কবার্তা। এটি ব্যাংকিং খাতের উপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং বিনিয়োগ, ব্যবসা ও উৎপাদনশীলতা প্রভাবিত করছে। তাই ব্যাংক ও সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ ও কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য।
সংক্ষেপে বলা যায়, বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি ইতিমধ্যেই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ৩৫.৭৩ শতাংশ। এই ঋণ বৃদ্ধির ফলে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিশীলতা প্রভাবিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় নিয়মিত তদারকি, ঋণ ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা, আর্থিক শিক্ষা এবং দায়িত্বশীল ঋণ প্রদান নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।