প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
প্রাচীন ইতিহাসে অমানবিকতা ও ক্ষমতার অহংকারের প্রতীক হিসেবে যেসব নাম উচ্চারিত হয়, তাদের মাঝে ফেরাউন একটি সর্বাধিক আলোচিত নাম। যুগে যুগে অত্যাচারীকে বোঝাতে মানুষ ফেরাউনের দৃষ্টান্ত ব্যবহার করে এসেছে। যদিও সাধারণত ফেরাউনকে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তির নাম মনে করা হয়, প্রকৃতপক্ষে এটি কোনো ব্যক্তিবিশেষের নাম নয়। বরং বহু শতাব্দী ধরে মিসরের প্রাচীন রাজতন্ত্রের শাসকদের উপাধিই ছিল ‘ফেরাউন’ বা ‘ফারাও’। ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে বহু ফেরাউন রাজত্ব করলেও হজরত মুসা (আ.)-এর সময়কার ফেরাউনই সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত।
ইতিহাসবিদদের মধ্যে সেই সমসাময়িক ফেরাউনের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। অনেকের মতে তিনি রামেসিস। কেউ বলেন মারনেপতাহ। আবার কেউ কেউ বলেন তার নাম ছিল ওয়ালিদ ইবনে মাসআব ইবনে রাইয়ান, যে নাকি প্রায় চারশ বছর বয়স লাভ করেছিল। পরিচয় নিয়ে মতভেদ থাকলেও তার চরিত্র ও শাসন নিয়ে কোনো মতভেদ নেই—তিনি ছিলেন ভয়ংকর নির্যাতনকারী, অমানবিক এবং চূড়ান্ত অহংকারী এক শাসক।
ইসলামী বর্ণনায় উঠে আসে মহান আল্লাহ হজরত মুসা (আ.)-কে নবুয়্যত দান করার পর তাকে তাওহিদের দাওয়াত নিয়ে ফেরাউনের দরবারে পাঠিয়েছিলেন। তুয়া উপত্যকায় মুসা (আ.)-এর ওপর ওহি অবতীর্ণ হয়, তাকে মুজিজা প্রদান করা হয় এবং আল্লাহ নির্দেশ দেন ফেরাউনের কাছে গিয়ে তাকে সত্যের পথে আহ্বান জানাতে। কিন্তু ফেরাউন অহংকারে অন্ধ হয়ে নিজেকে প্রভু দাবি করল এবং মুসা (আ.)-এর বার্তা মিথ্যা আখ্যা দিল। সে শুধু বার্তাকে অস্বীকারই করল না, বরং মুসা (আ.)-এর অনুসারী বনি ইসরাইলদের ওপর নির্যাতন বাড়িয়ে দিল। সে ছিল এমন এক শাসক, যে নিজের ক্ষমতাকে অমর ভাবত এবং মানুষের জীবনকে তুচ্ছ জ্ঞান করত।
সময় যতই গড়াল, ফেরাউনের ঔদ্ধত্য ততই বেড়ে গেল। মুসা (আ.) তাকে নানা নিদর্শন দেখালেন, কিন্তু সে সত্য উপলব্ধি করল না। বরং আরও উগ্র হয়ে ওঠে এবং বনি ইসরাইল জাতিকে দমন করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) বনি ইসরাইলদের নিয়ে মিসর ত্যাগে সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু সেদিনও ফেরাউন তার বাহিনী নিয়ে তাদের পেছনে ধাওয়া করল। তার উদ্দেশ্য ছিল বনি ইসরাইল জাতিকে ধ্বংস করা। আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) লোহিত সাগরের পাড়ে পৌঁছালে পানি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায় এবং তাদের জন্য একটি নিরাপদ পথ তৈরি হয়। বনি ইসরাইলরা সেই পথে পার হয়ে গেলেও ফেরাউন ও তার বাহিনী সেই বিভক্ত সাগরের ভেতরেই ধেয়ে আসে তাদের আটকাতে।
কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছায় সাগরের পানি আবার একত্রিত হয়ে যায় এবং ফেরাউন তার বাহিনীসহ সাগরে ডুবে মৃত্যু বরণ করে। কেবলমাত্র তার দেহ সংরক্ষণ করে রাখা হয় ভবিষ্যতের মানুষের জন্য শিক্ষা হিসেবে। কোরআনে এই ঘটনার স্পষ্ট বর্ণনা রয়েছে। সুরা নাজিয়াতের আয়াতে বলা হয়েছে মুসা (আ.)-কে আল্লাহ কিভাবে ফেরাউনের কাছে পাঠিয়েছিলেন এবং ফেরাউন কিভাবে নিজেকে প্রভু দাবি করে সীমালঙ্ঘন করেছিল। আর সুরা ইউনুসে বর্ণিত হয়েছে লোহিত সাগরের মাঝে ফেরাউনের করুণ পরিণতি—যেখানে ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে সে ঈমান আনার দাবি করলেও তার সেই ঘোষণা গ্রহণ করা হয়নি, কারণ তার হৃদয় দীর্ঘদিন অন্যায় ও অহংকারে ভরে গিয়েছিল।
ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল পবিত্র ১০ মহররম বা আশুরার দিনে। মদিনায় হিজরত করার পর নবী মুহাম্মদ (সা.) ইহুদিদের এদিন রোজা রাখতে দেখে কারণ জানতে চান। তারা জানান, এই দিনে আল্লাহ মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেছিলেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। নবীজি (সা.) তখন বলেন, তিনি মুসা (আ.)-এর প্রতি তাদের চেয়ে অধিক নিকটবর্তী এবং এদিন তিনিও রোজা পালন করেন। পরবর্তীতে আশুরার রোজা মুসলমানদের জন্য অত্মোপলব্ধিমূলক ও কৃতজ্ঞতার স্মারক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ফেরাউনের পতনের এই ঘটনা শুধু একটি প্রাচীন কাহিনি নয়, বরং এ মানবসভ্যতার জন্য এক চিরন্তন শিক্ষা। ক্ষমতা, অহংকার, জুলুম—এসবের চরম পরিণতি কখনো শুভ হয় না। ইতিহাস দেখিয়েছে, যতই শক্তিশালী হোক জালেম শাসক, সত্য ও ন্যায়ের কাছে শেষ পর্যন্ত পরাজিত হতে হয় তাকে। ফেরাউনের দেহ আজো সংরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে—মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয় সত্য ও ন্যায়ের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়ার ভয়াবহ পরিণতি।
মানব ইতিহাসের এই ঘটনাটি আজো মানুষের কাছে সতর্ক সংকেত হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। যে কেউ ক্ষমতার মোহে অমানবিক হয়ে ওঠে, যে কেউ নিরীহ মানুষের ওপর জুলুম করে, যে কেউ নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করে—তার পরিণতি যে ফেরাউনের মতোই হতে পারে, তা ইতিহাস বারবার মনে করিয়ে দেয়। এ জন্যই ইসলাম সহ বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মে অহংকার থেকে বেঁচে থাকা, ন্যায় প্রতিষ্ঠা এবং মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফেরাউনের পতনের এই মহাকাব্যিক ঘটনা আজো মানুষের মনে গভীর দাগ কাটে। এটি শুধু অতীতের গল্প নয়, বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের সমাজের জন্যও দিকনির্দেশনা। ক্ষমতাধরদের জন্য সতর্কতা, নিপীড়িতদের জন্য সাহস এবং বিশ্বাসীদের জন্য তাওহিদের প্রতি অবিচল থাকার বার্তা বহন করে এই কাহিনি। তাই যুগ যুগ ধরে আলেম, ইতিহাসবিদ ও চিন্তাবিদরা এই ঘটনার শিক্ষা নিয়ে মানুষকে অহংকার ত্যাগ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়ে আসছেন।
এই গল্প শুধু একটি জাতির মুক্তির কথা বলে না, বরং প্রতিটি মানুষের অন্তরের ভিতর লুকিয়ে থাকা অহংকার ও অন্যায় প্রবণতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের কথাও স্মরণ করিয়ে দেয়। যে মুহূর্তে মানুষ ভাবতে শুরু করে সে-ই সর্বশক্তিমান, সেখানেই তার পতনের ভিত্তি তৈরি হয়ে যায়। আর আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে ন্যায়-সত্যের পথে স্থির থাকা মানুষই শেষ পর্যন্ত পরিত্রাণ লাভ করে।
ফেরাউনের পতনের এই ঘটনা পৃথিবীর কোটি মানুষের জন্য চিরন্তন শিক্ষা হয়ে আজও বেঁচে আছে।










