প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইসলামের ইতিহাসে নবুওয়াতের সূচনালগ্ন থেকে যে কঠিন পথপরিক্রমা শুরু হয়েছিল, তা আজও মানুষের হৃদয়ে এক গভীর প্রশান্তির সঞ্চার করে। নবী মুহাম্মদ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে রিসালতপ্রাপ্ত হওয়ার পর তিন বছর গোপনে ইসলাম প্রচার করেন। এই তিন বছর ছিল পরীক্ষা, ধৈর্য, সংকল্প ও ত্যাগে পরিপূর্ণ এক অধ্যায়। তিনি নীরবে মানুষের কাছে গিয়ে একত্ববাদ ও ন্যায়ের দাওয়াত পৌঁছে দিতেন। মক্কার কাফেররা তখনই তার বিরুদ্ধাচরণ শুরু করে, তাকে কটুক্তি, অবজ্ঞা ও নানা কষ্টের সম্মুখীন করে। তবুও নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো দুর্বল হননি। বরং তিনি নরম স্বভাব, ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে দাওয়াত চালিয়ে গেছেন।
ইসলাম গ্রহণের ইতিহাস শুরু হয় নবীজির পরিবারের ভেতর থেকেই। সর্বপ্রথম তাঁর বিশ্বস্ত সঙ্গী, জীবনের প্রতিটি সংকটে যিনি তাঁর পাশে নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই উম্মুল মুমিনিন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার মাধ্যমেই ইসলাম গৃহীত হয়। তিনি শুধু স্ত্রীই নন, বরং নবীজির সহযোদ্ধা, সাহসদাত্রী ও প্রথম বিশ্বাসী। তাঁর ঈমান ইসলামি ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর ওপর শান্তি অবতীর্ণ হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। খাদিজা রা. নবুওয়াতের প্রথম মুহূর্ত থেকে নবীজির পাশে থেকে তাঁর দাওয়াত ও সংগ্রামকে আরও দৃঢ় করে তোলেন।
তারপর আসে যায়েদ ইবন হারিসা রা.-এর নাম। তিনি ছিলেন নবীজির প্রিয় দাস, যাকে নবীজি পরবর্তীতে স্বাধীনতা প্রদান করেন এবং দত্তকপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনিও প্রথম দিনই দ্বিধাহীনভাবে নবীজির প্রতি ঈমান আনেন। নবীজির চাচাতো ভাই আলি ইবন আবু তালিব রা., যিনি তখন অতি কিশোর, তার ছোট বয়স থেকেই নবীজির স্নেহ ও লালনে বড় হয়েছিলেন। তিনিও প্রথম দিন ইসলামের দীক্ষা গ্রহণ করেন। তার এই অল্প বয়সে ঈমান গ্রহণ ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।
নবুওয়াতের গোপন দাওয়াতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আবু বকর সিদ্দিক রাদিয়াল্লাহু আনহার ভূমিকা। তিনি ছিলেন নবীজির অন্তরঙ্গ বন্ধু, সত্যনিষ্ঠ, বিনয়ী ও দানশীল স্বভাবের মানুষ। তাঁর সদাচরণ, দানশীলতা, নরম স্বভাব এবং বিশ্বাসযোগ্যতা মক্কার মানুষের হৃদয় জয় করেছিল। সেই প্রভাবের কারণেই তিনি দাওয়াতের কাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি যাদের চরিত্রবান ও বুদ্ধিমান মনে করতেন, তাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পেশ করতেন। তাঁর প্রচেষ্টায় উসমান ইবন আফফান রা., জুবায়ের ইবন আওয়াম রা., আব্দুর রহমান ইবনে আওফ রা., সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস রা. এবং তালহা ইবনে উবায়দুল্লাহ রা. ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে এরা সবাই ইসলামের ইতিহাসে অমর স্থান লাভ করেন এবং অনেকেই আশারা মুবারাশা অর্থাৎ দুনিয়াতে জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত হন।
গোপন পর্যায়ে আরও অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করেন। তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিলাল ইবন রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু, যিনি ছিলেন মক্কার একজন হাবশি দাস। কঠোর নির্যাতন থাকা সত্ত্বেও তিনি যে ঈমানের দৃঢ়তা প্রদর্শন করেছিলেন, তা আজও মমত্ব ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়। তার ধৈর্যের সামনে অত্যাচারের শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছিল, আর তার হৃদয় থেকে বের হওয়া “আহাদ, আহাদ”—একত্ববাদের অমর ধ্বনি—ইতিহাস হয়ে আজও প্রতিধ্বনিত হয়।
প্রাথমিক ইসলামে দীক্ষিতদের মধ্যে ছিলেন আবু উবায়দাহ আমির ইবনুল জাররাহ রা., যিনি ইসলামের শ্রেষ্ঠ সেনাপতিদের একজন। ছিলেন আরকাম ইবনে আবিল আরকাম রা., যার ঘরটাই পরবর্তীতে ইসলামের প্রথম দাওয়াহ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হয়; মক্কার সাফা পাহাড়ের কাছে তাঁর বাড়িতেই নবীজি বহুদিন গোপনে সাহাবিদের শিক্ষা দিতেন। উসমান বিন মাযউন রা. ও তাঁর দুই ভাই, সাইদ ইবন যায়েদ ও তাঁর স্ত্রী—যিনি ছিলেন ওমর রা.-এর বোন—তারা সবাই গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের প্রত্যেকের ঈমান গ্রহণের পেছনে ছিল ভয়, সামাজিক চাপ, নির্যাতনের আশঙ্কা; তবুও তারা সত্যকে গ্রহণ করেছিলেন নিঃসংকোচে।
প্রাথমিক ইসলামে দীক্ষিতদের মধ্যে কুরাইশ গোত্রের বাইরের ব্যক্তিরাও ছিলেন উল্লেখযোগ্য। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা., যিনি পরবর্তীতে কোরআন তিলাওয়াতের শ্রেষ্ঠ কারীদের একজন হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন, ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এক প্রত্যন্ত সাদামাটা পরিবারের সন্তান হিসেবে। সুহাইব রুমি রা., আম্মার ইবন ইয়াসার রা., তাঁর পিতা ইয়াসার এবং মা সুমাইয়া—যিনি ইসলামের ইতিহাসের প্রথম শহীদ—এরা সবাই ঈমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন অকল্পনীয় নির্যাতনের মাঝেও। সেই সময়ের প্রতিটি বেদনাদায়ক মুহূর্ত আজও ইতিহাসে অশ্রুসিক্ত হয়ে রয়েছে।
প্রথম দিকের মুসলিম নারীর মধ্যেও ছিলেন অনেক সাহসী নারী, যারা নির্যাতনের ভয় না করে সত্যের পথে অটল ছিলেন। উম্মে আইমান বারাকা রা., যার স্নেহে নবীজি বেড়ে উঠেছিলেন; উম্মুল ফজল লুবাবা রা., যিনি আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিবের স্ত্রী; এবং আসমা বিনতে আবু বকর রা., যিনি মক্কার কঠোর বিরোধিতার সময় নবীজির হিজরতের গোপন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তারা প্রত্যেকেই ইসলামের প্রথম দীক্ষিতদের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন।
গবেষণা ও ঐতিহাসিক তথ্যে দেখা যায়, নারীদের ও পুরুষদের মিলিয়ে প্রায় ৩৩০ জন প্রাথমিক পর্যায়ে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। যদিও এই সংখ্যা শতভাগ নির্ভুল নয়, তবুও এটা স্পষ্ট যে মুসলমানদের এই প্রথম দলটি ছিল ঈমান, সাহস ও ত্যাগের প্রতীক। তারা ইসলামের পথচলায় এমন ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন, যা পরবর্তীতে ইসলামের বিস্তারের ভিত্তি রচনা করে দেয়।
ইসলামের প্রথম দীক্ষিতরা শুধু ব্যক্তিগতভাবে ঈমান এনেই থেমে থাকেননি, বরং তারা প্রত্যেকে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পাশে দাঁড়িয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সহযোগিতা করেছেন। তারা জুলুম, অবজ্ঞা, নির্যাতন, সামাজিক বয়কট—সবকিছুই সহ্য করেছেন। কিন্তু কোনো কিছুই তাদের ঈমানকে টলাতে পারেনি। তাদের এই ত্যাগই পরবর্তীতে ইসলামের শক্ত ভিত তৈরি করে, যা ধীরে ধীরে সমগ্র আরব উপদ্বীপ ও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে।
এই ইতিহাস শুধু ইসলামের উত্থানের কাহিনি নয়; এটি মানুষের সংকল্প, নৈতিকতা ও সত্যের প্রতি নিবেদনের অমর দৃষ্টান্ত। প্রথম দীক্ষিতরা দেখিয়ে দিয়েছেন, সত্যের পথে হাঁটতে হলে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, ধৈর্য ধারণ করতে হয়, আর দৃঢ় মনোবল নিয়ে যেকোনো প্রতিকূলতার মোকাবিলা করতে হয়।
আজকের দিনে যখন মানুষ নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়, তখন এই ইতিহাস শিক্ষা দেয়—সত্য ও ন্যায়ের পথে যে মানুষ অটল থাকে, আল্লাহ তাকে কখনো একা ছেড়ে দেন না। নবীজি এবং তাঁর প্রথম অনুসারীরা প্রমাণ করে গেছেন, ঈমানের আলো অন্ধকার ভেদ করে নতুন ভবিষ্যতের পথ খুলে দিতে পারে। তাদের সেই আলো আজও মানবতার পথে দিশা দেখায়।