উত্তরায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিকল্প আবাসনের সম্ভাব্যতা যাচাই

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বুধবার, ২৬ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৫৮ বার
উত্তরায় ঢাবি শিক্ষার্থীদের বিকল্প আবাসনের সম্ভাব্যতা যাচাই

প্রকাশ: ২৬ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট যেন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। দেশের সর্বপ্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে প্রতি বছর লক্ষাধিক তরুণ-তরুণী তাদের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে রাজধানীতে আসে। কিন্তু হালের বাস্তবতা হলো—একাডেমিক উন্নয়ন ঘটলেও আবাসন সুবিধা সেই গতিতে এগোয়নি। ফলে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীকে স্বল্প জায়গায় গাদাগাদি করে থাকতে হয়, অনেককে আবার ভাড়া বাসায় থাকার অতিরিক্ত বোঝা বইতে হয়। এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট সমাধানে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যার অংশ হিসেবে সম্প্রতি উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকায় সম্ভাব্য বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা শনাক্ত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল সরেজমিন পরিদর্শনে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তর থেকে জানানো বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন হল নির্মাণ এবং পুরোনো হলসমূহ সংস্কারের কার্যক্রম দ্রুততার সঙ্গে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই কাজ চলাকালীন শিক্ষার্থীদের কোথায় স্থানান্তর করা হবে, তা বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। কারণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ হলই বহু বছর ধরে মেরামতের অপেক্ষায় আছে, এবং যেসব হল সংস্কারের আওতায় আসছে, সেগুলোতে সাময়িকভাবে শিক্ষার্থীদের রাখা সম্ভব নয়। এ অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এমন স্থান খুঁজছে যেখানে নির্মাণ ও সংস্কারের সময় শিক্ষার্থীরা নিরাপদভাবে থাকতে পারবে এবং একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াতও হবে সহজ ও সাশ্রয়ী।

এই সম্ভাবনা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর নেতৃত্বে প্রতিনিধিদল উত্তরা দিয়াবাড়ির আবাসন এলাকা পরিদর্শন করেন। সঙ্গে ছিলেন সেতু বিভাগের সচিব ও বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রউফ, অবসরপ্রাপ্ত সচিব ড. খ ম কবিরুল ইসলামসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন, প্রকৌশল, প্রশাসন ও পরিবহন বিভাগের কর্মকর্তারা। উপস্থিত ছিলেন ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম, এজিএস মহিউদ্দিন খান ও ছাত্র পরিবহন সম্পাদক আসিফ আবদুল্লাহ।

পরিদর্শনের সময় প্রতিনিধিদল প্রথমে এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। উত্তরা দিয়াবাড়ি এখন রাজধানীর অন্যতম পরিকল্পিত অঞ্চলের একটি, যেখানে সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে। চারদিক উন্মুক্ত, নিয়মিত টহল ব্যবস্থা এবং আধুনিক সড়ক কাঠামো থাকার কারণে এটি একটি নিরাপদ আবাসন অঞ্চল হিসেবে বিবেচিত। তবে শিক্ষার্থী সংখ্যা বিপুল হওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে পারা যায় কি না, সে বিষয়েও তারা আলোচনা করেন। বিশেষ করে রাতের বেলায় যাতায়াতের নিরাপত্তা, আলোকায়ন, সিসিটিভি মনিটরিং—এসব বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়।

এরপর প্রতিনিধিদল সম্ভাব্য আবাসন ভবনগুলোর ভেতরে গিয়ে কক্ষ বিন্যাস, বাথরুম ও পানির ব্যবস্থা, জরুরি সিঁড়ি, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, লিফট সুবিধা, খোলা জায়গা, খাবারের দোকান বা মেস করার সম্ভাবনা—এসব বিষয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল শাখার কর্মকর্তারা ভবনগুলোর অবকাঠামোগত মানও মূল্যায়ন করেন, কারণ শিক্ষার্থীদের দীর্ঘমেয়াদি বা অন্তত কয়েক মাস রাখা হবে এমন জায়গায় যেকোনো ধরনের ঝুঁকি এড়ানো জরুরি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যাতায়াত সুবিধা। ঢাবি ক্যাম্পাস থেকে উত্তরা দিয়াবাড়ির দূরত্ব বেশি হলেও মেট্রোরেল চালুর পর এ দূরত্ব আর তেমন বড় সমস্যা নয়। মেট্রোরেলে শিক্ষার্থীরা খুব কম সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছাতে পারবেন—এ বিষয়টি প্রতিনিধিদল ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ম্যানেজার মো. কামরুল হাসান পরিদর্শনকালে জানান, প্রয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ব্যবস্থা এই রুটে সাময়িকভাবে চালু করা যেতে পারে, যাতে যেসব শিক্ষার্থী মেট্রো ব্যবহার করতে পারবেন না বা ব্যস্ত সময়ে চাপ বেশি হলে তারা পরিবহন সুবিধা পান।

ডাকসুর প্রতিনিধিরাও শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিকোণ থেকে মতামত দেন। তাদের মতে, যেকোনো নতুন স্থানে শিক্ষার্থীদের স্থানান্তর করতে হলে নিরাপত্তা ও যাতায়াতের পাশাপাশি সেখানে খাবারের সাশ্রয়ী ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক শিক্ষার্থী সীমিত বাজেটে পড়াশোনা করেন, তাই ব্যয় যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিবেচনায় আনতে হবে। এছাড়া গণপরিবহন সুবিধা, আশেপাশে জরুরি সেবা, চিকিৎসাকেন্দ্র, নিকটস্থ বাজার—এসব বিষয়ও তারা নজরে আনেন।

প্রতিনিধিদলের সদস্যরা পরিদর্শন শেষে বলেন, শিক্ষার্থীদের নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও উপযোগী আবাসন নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রধান দায়িত্বগুলোর একটি। নতুন হল নির্মাণের আগে এবং নির্মাণ চলাকালীন শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তর করা ছাড়া বড় ধরনের অবকাঠামোগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। তাই বিকল্প আবাসন হিসেবে কোন স্থানটি বেশি উপযোগী হবে, তা যাচাই করতেই এই পরিদর্শন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ মনে করছে, উত্তরা দিয়াবাড়ি এলাকার পরিকল্পিত আবাসনগুলো শিক্ষার্থীদের অস্থায়ীভাবে রাখার জন্য সম্ভাব্য একটি সমাধান হতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে সুস্পষ্ট মূল্যায়ন শেষে। নিরাপত্তা, যাতায়াত, ব্যয়, প্রশাসনিক তদারকি, মেস বা ক্যাফেটেরিয়ার ব্যবস্থা, হোস্টেলে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীদের আলাদা আবাসন—সবকিছু বিবেচনা করে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তৈরি করা হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আশা প্রকাশ করেছে, নতুন হল নির্মাণ প্রকল্প দ্রুত শুরু হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট ধীরে ধীরে কমে আসবে। কিন্তু ততদিন বিকল্প ব্যবস্থায় শিক্ষার্থীরা যাতে নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও একাডেমিক পরিবেশ বজায় রাখতে পারেন—এটাই এখন প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।

পরিদর্শন শেষে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানায়, শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তারা আন্তরিকভাবে কাজ করছে, এবং তারা এমন ব্যবস্থা গড়তে চায় যেখানে কোনো শিক্ষার্থী আবাসন সংকটের কারণে পড়াশোনায় পিছিয়ে পড়বে না। পরিদর্শন প্রতিবেদন পর্যালোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত