প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
দেশের ব্যাংকিং খাতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও ব্যয়সংকোচন নীতি গ্রহণ করেছে। তারই অংশ হিসেবে একীভূত হতে যাওয়া পাঁচ বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ভাতার ২০ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এসব ব্যাংকের প্রশাসকদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ. মনসুর এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। গুরুতর তারল্য ঘাটতি, নিয়ন্ত্রণহীন ঋণ খেলাপি এবং বছরের পর বছর ধরে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে চরম আর্থিক ঝুঁকিতে থাকা ব্যাংকগুলোর দীর্ঘদিনের দুরবস্থাকে সামনে রেখে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক এবং এক্সিম ব্যাংক — মোট পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক পরিস্থিতি এতটাই নাজুক যে কর্মীদের বেতন থেকে শুরু করে আমানতকারীদের জরুরি অর্থপ্রাপ্তিও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছিল না। ব্যাংকগুলোর আর্থিক চিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, দীর্ঘ সময়ের বিশৃঙ্খলা ও অনিয়মের ফলে তাদের সম্পদ-দায় ভারসাম্য চরমভাবে ভেঙে পড়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণের মাত্রা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যা দেশের ব্যাংকিং খাতে আগে কখনো দেখা যায়নি।
বৈঠকে উপস্থিত প্রশাসকরা কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জানান, বর্তমানে পাঁচ ব্যাংকে আমানতকারীর সংখ্যা প্রায় ৭৫ লাখ। কিন্তু এসব আমানতকারীর জমার বিপরীতে ব্যাংকগুলো দিতে পারছে না প্রয়োজনীয় অর্থ। ব্যাংকগুলোর মোট জমা অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা হলেও ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকায়। এর মধ্যে ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা খেলাপি অবস্থায় রয়েছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৭৬ শতাংশ। কোনো স্বাভাবিক ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পরিস্থিতি কল্পনাতীত। বিশেষ করে ইউনিয়ন ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ৯৮ শতাংশে পৌঁছানো বিষয়টিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক অত্যন্ত উদ্বেগজনক হিসেবে দেখছে। ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে খেলাপির হার ৯৭ শতাংশ, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকে ৯৫ শতাংশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকে ৬২.৩০ শতাংশ এবং এক্সিম ব্যাংকে ৪৮.২০ শতাংশ।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো নিজেরাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে চরম আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। বৈঠকে প্রশাসকরা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা চান। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতির গভীরতা বিশ্লেষণ করে এবং অগ্রাধিকার বিবেচনায় জরুরি ভিত্তিতে মাত্র ৩২৫ কোটি টাকা অনুমোদন করে। এই অর্থ মূলত আমানতকারীদের জরুরি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা এবং কর্মীদের প্রাথমিক বেতন-ভাতা প্রদানে ব্যবহার করা হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই তহবিল নতুন গঠিত ব্যাংকের মূলধন বরাদ্দ থেকে সমন্বয় করা হবে এবং এটি কোনোভাবেই অতিরিক্ত সহায়তা নয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ সর্বাগ্রে বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি জানান, গভর্নর স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়েছেন, বেতন-ভাতা ২০ শতাংশ কমানোর বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর করতে হবে। ব্যাংকগুলো চরম সংকটে থাকায় নিজেদের আয়ের ওপর নির্ভর করে পরিচালনা ব্যয় সামাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। তাই বেতন-ভাতা কমানো ছাড়া বিকল্প ছিল না। তবে এই সিদ্ধান্ত সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর প্রায় ১৫ হাজার কর্মীর জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে। অনেক কর্মী দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক নিরাপত্তাহীনতার ভেতর দিয়ে পার হচ্ছেন, যার ওপর নতুন করে সংকোচন নীতি চাপ সৃষ্টি করেছে।
এখন দেশে এই পাঁচ ব্যাংকের অধীনে রয়েছে ৭৬০টি শাখা, ৬৯৮টি উপশাখা, ৫১১টি এজেন্ট ব্যাংকিং আউটলেট এবং ৯৭৫টি এটিএম বুথ। এত বড় নেটওয়ার্ক নিয়ে চলমান আর্থিক সংকট ও অপারেশনাল দুরবস্থা থামানো এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে এসব ব্যাংক গ্রাহক-সেবায় ব্যাপক ভূমিকা রাখলেও তাদের নিজস্ব আর্থিক শৃঙ্খলা ভেঙে পড়ায় সারাদেশে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
গত সরকারের আমলে বিভিন্ন প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততায় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও লুটপাটের কারণে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের স্বচ্ছতার অভাবে ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে দেউলিয়া হওয়ার পথে গিয়েছিল। আমানতকারীরা প্রয়োজনীয় টাকা তুলতে গেলে বহুবার হেনস্তার শিকার হয়েছেন। নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় এসে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়। চলতি মাসের শুরুতেই পাঁচ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেওয়া হয় এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা পদত্যাগ করেন। সব ব্যাংকের দায়িত্ব এখন বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়োজিত প্রশাসকদের ওপর, যারা একীভূত করার পুরো প্রক্রিয়া তত্ত্বাবধান করছেন।
পাঁচটি দুর্বল ব্যাংককে একীভূত করে পরিচালনা করতে ইতোমধ্যে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ নামে একটি নতুন রাষ্ট্রায়ত্ত শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের প্রাথমিক লাইসেন্স অনুমোদন পেয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই নতুন ব্যাংকের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা মূলধন জোগানের প্রস্তাব দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসেবে নতুন ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট খোলা হলে অর্থ মন্ত্রণালয় ওই বরাদ্দ ছাড় করবে। এতে ব্যাংকের দুরবস্থা কাটিয়ে ওঠা এবং ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফেরানোর কাজ শুরু হবে বলে ধারণা করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের এই উদ্যোগ সময়োপযোগী হলেও একীভূতকরণের পুরো প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল। কারণ পাঁচ ব্যাংকের সম্পদ, দায়, শাখা নেটওয়ার্ক, কর্মীসংখ্যা এবং গ্রাহকের আলাদা আলাদা চাহিদা রয়েছে। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো খেলাপি ঋণ আদায় এবং দুর্নীতির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ। তা ছাড়া কর্মীদের বেতন কমানোর সিদ্ধান্ত স্বল্পমেয়াদে ব্যয় নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক সংগঠন পুনর্গঠনই হবে প্রধান সমাধান।
এখনো গ্রাহকদের মধ্যে শঙ্কা থাকলেও বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, আমানতকারীদের টাকা নিরাপদ রাখতে সব ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। নতুন ব্যাংক চালুর পর একীভূত হওয়া সব ব্যাংকের শাখায় গ্রাহকেরা আগের মতোই লেনদেন করতে পারবেন। আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং ব্যাংকিং খাতকে টেকসই অবস্থানে নিতে কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতের সর্বশেষ বড় সংকটের এই পরিস্থিতিতে বেতনভাতা কমানোর সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে একটি কঠিন পদক্ষেপ। তবে কর্তৃপক্ষ মনে করছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা এবং গ্রাহকদের আস্থা ফেরাতে এর বিকল্প নেই। আগামী কয়েক সপ্তাহে একীভূতকরণ প্রক্রিয়া কতটা এগোয় এবং ব্যাংকগুলো কীভাবে তারল্য সংকট কাটিয়ে ওঠে, দেশের ব্যাংকিং খাত এখন সেই দিকেই নজর রাখছে।