প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, তা কেবল একটি সরকারের পতন নয়—বরং একটি দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান এবং নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার উদয়। শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর পাঁচ দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার দেশটি আজ এক নতুন অধ্যায়ের মুখোমুখি। দেড় দশক ধরে প্রতিষ্ঠিত একদলীয় মনোভাব, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকীর্ণতার জায়গা এখন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক গণতান্ত্রিক আবহে পরিবর্তিত হচ্ছে। নাগরিকেরা এখন এমন একটি বাংলাদেশ কল্পনা করছে—যেখানে আর কখনও স্বৈরতন্ত্র ফিরে আসবে না, আর মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ হবে রাষ্ট্রের ভিত্তি।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে বিচারের রায় ঘোষিত হয়েছে, অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে তা শুধু এক শাসকের পরিণতি নয়; বরং আওয়ামী লীগের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়েরও একটি দৃশ্যমান ইতি। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের পতন, সংগঠনগত দুর্বলতা এবং জনসমর্থনের বিচ্ছিন্নতা আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে প্রায় নিশ্চিহ্ন অবস্থায় দাঁড় করিয়েছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনীতিতে তাই নতুন শক্তি ও নতুন ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব স্বাভাবিকভাবেই ত্বরান্বিত হয়েছে।
অভ্যুত্থানের প্রধান প্রেরণা ছিলেন তরুণরা—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিত অসংখ্য শিক্ষার্থী, তরুণ কর্মী এবং পেশাজীবী। তাদের মধ্য থেকেই উঠে এসেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। যদিও দলের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এখনো দৃঢ় হয়নি এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজন কিছুটা দেখা যাচ্ছে, তবুও এনসিপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী অনেকেই। নাহিদ, আখতার ও হাসনাত—অভ্যুত্থানের পরিচিত তিন মুখ—এখনও তরুণদের অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন। তারা যদি জনসংযোগ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে পুনরায় সক্রিয় হতে পারেন, তাহলে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে এনসিপি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বেও এসেছে নতুন রক্ত। দেড় দশকের দমন-পীড়নে প্রবীণ নেতৃত্বের একাংশ রাজনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন; অনেকেই কারাবাস, অসুস্থতা বা আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় রাজনীতির মঞ্চ থেকে দূরে সরে গেছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনও ছিল নিষ্ঠুরতার শিকার—মিথ্যা মামলায় কারাবাস, শারীরিক অবনতি ও দীর্ঘদিন চিকিৎসাবঞ্চিত থাকার পর তিনি কার্যত রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়াতে বাধ্য হন। তবে হাসিনার পতনের পর তিনি স্বাধীন পরিবেশে ফিরলেও সক্রিয় রাজনীতিতে আর ফিরতে পারেননি। অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, তার সংগ্রামী জীবন তরুণ নেতাদের জন্য একটি বড় শিক্ষা—গণতান্ত্রিক রাজনীতি কখনোই ব্যক্তির নিরাপত্তা ও অধিকার থেকে আলাদা নয়।
জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে এসেছে সম্পূর্ণ নতুন প্রজন্ম। ইসলামী ছাত্রশিবিরের তরুণ নেতৃত্ব এখন দলের শীর্ষপদে উঠে এসেছে। বিএনপিও প্রার্থী মনোনয়নে তরুণদের অগ্রাধিকার দিচ্ছে। এর ফলে দেশের রাজনীতিতে এক নতুন প্রজন্মমূলক ভারসাম্য তৈরির ইঙ্গিত মিলছে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বাম রাজনীতির ক্ষেত্রে। আওয়ামী লীগের প্রক্সি হিসেবে পরিচিত কিছু বাম দল এবং সংগঠন—যারা গত দেড় দশক সাংস্কৃতিক রাজনীতির নামে সরকারি স্বার্থ রক্ষায় যুক্ত ছিল—তারা আজ প্রায় অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। জনমানুষের চোখে এদের অবস্থান আজ আওয়ামী লীগের সমতুল্য অগ্রহণযোগ্য। বিএনপির নীতিনির্ধারণী জায়গায় কিছু বাম বুদ্ধিজীবীর প্রভাব দেখা গেলেও সাধারণভাবে জনগণ মনে করছে—বাম ধারার বেশিরভাগ অংশই অতীতে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষায় ভূমিকা রেখেছে।
এমন জটিল পরিস্থিতিতেই রাজনৈতিক অঙ্গনে এসেছে নতুন মেরূকরণ। এনসিপির নেতৃত্বে ঘোষণা এসেছে একটি তৃতীয় শক্তির জোট গঠনের। একই সময়ে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ইসলামপন্থি আটটি দল একত্রিত হয়েছে, যা বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন। অন্যদিকে বিএনপিও জোটবদ্ধ হয়েছে একাধিক ইসলামপন্থি ও প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দলের সঙ্গে। ফলে নির্বাচনের মাঠে তিনটি প্রধান রাজনৈতিক বলয়ের উদ্ভব হয়েছে—একদিকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ইসলামি জোট, এবং মাঝামাঝি স্থানে এনসিপির নেতৃত্বে নতুন মধ্যম রাজনৈতিক শক্তি।
এই তিন শক্তির তৈরি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা বিএনপিকে আগের মতো একচ্ছত্র অবস্থানে থাকতে দিচ্ছে না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও শুরু থেকেই বলে আসছিলেন—মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশে যে কোনো দলকেই নতুন প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হতে হবে। বাস্তবতা এখন তাই-ই দেখাচ্ছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ আসনে বিএনপির প্রার্থী বাছাই করতে হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুনভাবে। যেমন—ঢাকা-১৪ আসনে গুম হওয়া ব্যারিস্টার আরমানকে জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী ঘোষণা করলে বিএনপি বাধ্য হয় ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা তুলিকে প্রার্থী করতে। একইভাবে মির্জা ফখরুলের আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি দেলাওয়ার হোসেন, যিনি গত সরকার আমলে ব্যাপক নির্যাতনের শিকার ছিলেন। এগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে—তরুণ নেতৃত্ব এখন প্রবীণ নেতাদের সমতুল্য প্রতিযোগী হয়ে উঠেছে।
রাজনীতিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ যে পরিবর্তনটি দৃশ্যমান, তা হলো—দীর্ঘদিন বড় দুই দলের বাইরে থাকা নেতারা এখন সামনে আসছেন, এবং ছোট দলগুলোও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করতে পারছে। এর ফলে একটি বাস্তবসম্মত ও কার্যকর সংসদ গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে—যেখানে সরকারের পাশাপাশি একটি শক্তিশালী বিরোধী দলও থাকবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভোটের রাজনীতিতে ইসলামপন্থি দলের উত্থানও বিশেষ মনোযোগ কাড়ছে। বিএনপি ও জামায়াতের দীর্ঘদিনের মিত্রতা এখন পরিণত হয়েছে সুস্পষ্ট প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। তবুও দুই দলের জোটগুলো নির্বাচনের আগে আসনভিত্তিক সমঝোতায় যেতে পারে—এমন সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশ্লেষকরা। কারণ, অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে রাজনীতির প্রধান চালিকা শক্তি এখন তরুণরা, এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু তাই দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ওপর। যদি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সহিংসতামুক্ত হয়, তাহলে দেশে একঝাঁক তরুণ নেতা জনপ্রতিনিধি হিসেবে উঠে আসবেন—এমনটাই আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি সতর্কবার্তা রয়ে গেছে—রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন কোনোভাবেই সংঘাত বা দমন-পীড়নে পরিণত না হয়। কারণ অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে—বাংলাদেশের জনগণ রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র আর বরদাস্ত করবে না।
নতুন বাংলাদেশ এখন যে পথে এগোচ্ছে, সেখানে সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ নেতৃত্ব এবং স্বাধীন রাজনৈতিক পরিবেশ। আগামী নির্বাচনই নির্ধারণ করবে—এই শক্তি কতটা সুসংগঠিতভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখতে পারে। দেশের মানুষ এখন অপেক্ষায়—নতুন প্রজন্মের নেতারা কি সত্যিই নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব নিতে পারবেন, নাকি পুরোনো রাজনীতির ছকেই আবার আটকে যাবে সবকিছু।