প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
গণহত্যায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অগ্রণী ব্যাংকের দুটি লকার থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল পরিমাণ স্বর্ণালংকার, হীরা, মুক্তা ও দামী পাথরকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। শুধু ৮৩২ ভরি স্বর্ণ নয়, তার সঙ্গে পাওয়া গেছে একাধিক সোনার বার, সোনার কয়েন, এবং আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের মূল্যবান পাথর। এসব সম্পদের প্রকৃত মান নির্ধারণে চলছে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানাচ্ছেন, সবকিছুর গুণগত মান নিশ্চিত করতে অন্তত কয়েকদিন সময় লাগবে। এই সময়ের মধ্যেই এসব জব্দকৃত সামগ্রীর প্রকৃত মূল্য ও ধরন সম্পর্কে আরও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যাবে।
অগ্রণী ব্যাংকের দিলকুশা শাখায় শেখ হাসিনার নামে থাকা লকার দুটি ভাঙার পর উদ্ধার হওয়া এসব সম্পদ এখন রাষ্ট্রীয় জিম্মায় ব্যাংকের নিরাপদ ভল্টে সিলগালা অবস্থায় রাখা হয়েছে। লকারে উদ্ধার হওয়া বিপুল সম্পদ এখন রাজধানীর প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে শুরু করে ব্যাংকপাড়া, অফিস-আদালত, এমনকি সাধারণ মানুষের আলোচনার মূল বিষয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়েও এ নিয়ে চলছে তুমুল বিতর্ক। অনেকে বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, বছরের পর বছর জনসমক্ষে ‘আমি রিক্ত, সাধারণ মানুষের মতোই জীবনযাপন করি’—এমন বক্তব্য দেওয়া একজন নেত্রীর লকারে এত বিপুল সম্পদ কীভাবে জমা হলো?
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, টানা সাড়ে ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনার বক্তব্য ও বাস্তবতার মধ্যে কতটা ব্যবধান ছিল, তা এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সাধারণ জীবনযাপনের দাবি করলেও তার নামে থাকা লকারে যে পরিমাণ স্বর্ণ ও মূল্যবান পাথর পাওয়া গেছে, তা যে কোনো সাধারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে। তার ভাষায়, “শতবার শুনেছি তার মুখে ‘আছে শুধু ভালোবাসা দিয়ে গেলাম তাই’। কিন্তু আজ যা দেখছি, তা দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।”
অগ্রণী ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “আমাদের ব্যাংকের নাম এখন দেশের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। একজন ব্যক্তি কত সম্পদ প্রয়োজন মনে করেন—এ প্রশ্ন মানুষ এখন নতুন করে তুলছে। এমনকি অনেকেই বলছেন, এ ঘটনা ক্ষমতার অপব্যবহারের জীবন্ত নজির।”
তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে যে সব উপহার পেয়েছিলেন, সেগুলোর বড় অংশই তিনি ব্যক্তিগত লকারে রেখেছিলেন। অথচ রাষ্ট্রীয় উপহার ব্যক্তিগত লকারে রাখা আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ। এসব উপহার রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও তিনি তা লঙ্ঘন করেছেন বলে মনে করছেন তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। রাষ্ট্রের সম্পদ ব্যক্তিগত লকারে রেখে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে শেখ হাসিনার নামে থাকা পূবালী ব্যাংকের সেনা কল্যাণ ভবন শাখার লকারটিও ভাঙা হয়। সেখানে শুধু একটি খালি পাটের বস্তা পাওয়া গেছে। এই ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে রহস্য তৈরি হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগেই লকারে থাকা সব মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে নিয়েছিলেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—গত বছরের ডিসেম্বর মাসে যখন সিআইসি সব ব্যাংক থেকে তার হিসাব, এফডিআর, ভল্ট ও লকারের তথ্য চেয়েছিল, তখন পূবালী ব্যাংক ওই লকারের তথ্য গোপন করেছিল। পরে সেই কারণে ব্যাংকের এমডিকে শোকজও করা হয়।
শেখ হাসিনার আয়কর নথিতে মাত্র ১৩ লাখ টাকার স্বর্ণালংকার থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনি হলফনামায়ও তিনি স্বর্ণের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করেননি। অথচ অগ্রণী ব্যাংকের লকারে পাওয়া স্বর্ণালংকারের বাজারমূল্যই প্রায় ১৭ কোটি টাকা। এর সঙ্গে যুক্ত হবে হীরা, মুক্তা, পান্না, রুবিসহ দামী পাথরগুলোর মূল্য। ফলে স্পষ্টতই দেখা যাচ্ছে—তিনি তার কর নথিতে বিপুল পরিমাণ সম্পদ গোপন করেছেন। এনবিআর সূত্র বলছে, এই অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে।
গত মঙ্গলবার দুপুর ১২টা থেকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে লকার ভাঙার অভিযান চলে। এতে অংশ নেন দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় গোয়েন্দা সেল এবং সিআইসির উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। লকার ভাঙা সংক্রান্ত আইনগত বাধা দূর হবার পরে তারা অভিযান শুরু করেন। উল্লেখ্য, লকারের দুটি চাবি থাকে—একটি ব্যাংকের কাছে, আরেকটি মালিকের কাছে। যেহেতু শেখ হাসিনা গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যান, তার উপস্থিতি ছাড়া লকার খোলা সম্ভব হয়নি। তাই আদালতের অনুমতি নিয়ে লকার ভাঙার পথেই যেতে হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখন অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন—দেড় দশক ধরে রাষ্ট্র পরিচালনার নামে কীভাবে এত বিপুল সম্পদ জমা হলো? দুর্নীতি, কমিশন, সুবিধাবাণিজ্য, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার অপব্যবহার—এসব অভিযোগ অনেকদিন ধরেই ছিল। কিন্তু লকার ভেঙে উদ্ধার করা স্বর্ণ ও পাথরের পরিমাণ সেই অভিযোগগুলোকে আরও শক্ত ভিত্তি দিয়েছে। এমনকি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর যে সব দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসছে, তা দেশের জনগণকে আরও বিস্মিত করছে।
অনেকে বলছেন, এ ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার অপব্যবহারের অন্যতম বড় উদাহরণ হয়ে থাকবে। দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রাম যখন চরমে, তখন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের লকারে এত বিপুল সম্পদ থাকা—এটি জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। দেশের অর্থনীতি ধসে পড়ার সময় যিনি বারবার বলতেন “আমি কিছু নেই”—তার লকার থেকে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণ-হীরা পাওয়া সত্যিই বিস্ময়কর।
এখন তদন্তকারী সংস্থাগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো—এসব সম্পদের উৎস খুঁজে বের করা এবং আইনি প্রক্রিয়ায় এগুলোকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে বাজেয়াপ্ত করা। আইনি বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি প্রমাণিত হয় যে এসব সম্পদ অবৈধভাবে অর্জিত এবং কর নথিতে গোপন রাখা হয়েছে, তবে এটি দুর্নীতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদ আত্মসাৎ এবং কর ফাঁকির গুরুতর মামলায় রূপ নেবে।
দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রতিটি পরিবর্তনের মুহূর্তে সত্য বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু এবার বেরিয়ে আসা তথ্য সমাজে তীব্র নৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মানুষ এখন প্রশ্ন তুলছে—কীভাবে একজন রাষ্ট্রপ্রধান এত বিপুল সম্পদের মালিক হতে পারেন, অথচ দেশের সাধারণ মানুষকে বছরের পর বছর দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও আর্থিক সংকটের মধ্যে রেখেছেন?
তদন্ত চলমান। লকারে থাকা মূল্যবান পাথরগুলোর মান ও বাজারমূল্য নির্ধারণের পর আরও চমকপ্রদ তথ্য আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকেই। আপাতত দেশের মানুষের চোখ এখন অগ্রণী ব্যাংকের সেই লকার থেকে পাওয়া স্বর্ণ-হীরা উদ্ধার—এ ঘটনার পরবর্তী কোনো আপডেটের দিকে।