ব্রয়লার মুরগির মাংসে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৬৯ বার
ব্রয়লার মুরগির মাংসে রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া, স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

বাংলাদেশের পোলট্রি শিল্প গত তিন দশকে একটি শক্তিশালী প্রোটিন সরবরাহকারী খাত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এক সময় গ্রামের উঠোনেই সীমাবদ্ধ হাঁস-মুরগি পালন এখন হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যিক শিল্পে পরিণত হয়েছে। মানুষের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে ব্রয়লার মুরগির অবদান অনস্বীকার্য। তবে এ শিল্পের অগ্রগতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এক বড় সংকট, যা দ্রুত জটিল রূপ নিচ্ছে। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা তাদের সাম্প্রতিক গবেষণায় এই উদ্বেগজনক সত্যকে তুলে ধরেছেন।

গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, মুরগির শরীরে ‘মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়া’ বা সুপারবাগের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে। এটি মানুষের জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ধীরে ধীরে কমিয়ে দিচ্ছে। শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে পোলট্রি খাত পরিবেশের জন্যও হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠেছে। খামারে দ্রুত বৃদ্ধি, রোগ প্রতিরোধ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির নামে অপ্রয়োজনীয় ও নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে মুরগির মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যাচ্ছে, যা খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।

মানবদেহে অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়া একেবারেই মানুষের শরীরের ভুল নয়। বরং প্রাণী, ফিড, কৃষি পরিবেশ ও খাদ্য উৎসে থাকা অণুজীবের অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী বিবর্তনই প্রধান কারণ। এভাবে তৈরি হওয়া প্রতিরোধী জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে সংক্রমণ ঘটায় এবং চিকিৎসা জটিল হয়ে ওঠে।

সম্প্রতি প্রকাশিত ‘এশিয়ান-অস্ট্রালাশিয়ান জার্নাল অব ফুড সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি’-তে বাকৃবির ফার্মাকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে করা এক বিস্তৃত পর্যালোচনা গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় ২০১৭ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দেশীয় পোলট্রি খাতের নানা গবেষণাপত্র বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণায় উঠে এসেছে, পোলট্রি খামার থেকে সংগৃহীত ‘ই. কোলাই’ ব্যাকটেরিয়ার ৭৫ শতাংশেরও বেশি মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট। বিশেষত মুরগির অন্ত্রে ‘এমসিআর-১’ জিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিক কোলিস্টিনকে অকার্যকর করে।

খুচরা বাজারে সংগৃহীত ব্রয়লার মাংসের নমুনা বিশ্লেষণে নিয়মিতভাবে বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ ধরা পড়েছে। বিশেষ করে ফ্লুরোকুইনোলোন ও টেট্রাসাইক্লিনের মাত্রা সহনীয় সীমার চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে। এ কারণে মানুষের শরীরে নিয়মিত অল্পমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক প্রবেশ করলে অ্যালার্জি, কিডনি ও লিভারের বিষক্রিয়া, অন্ত্রের মাইক্রোবায়োমের ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে পারে। ধীরে ধীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গিয়ে শরীর নানা জটিল রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।

দেশের ব্রয়লার মুরগির ৭০–৮০ শতাংশই ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামারিদের উৎপাদন। কিন্তু অধিকাংশ খামারি ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ না নিয়ে ফিড ডিলার বা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধি থেকে ‘সুরক্ষা ডোজ’ হিসেবে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ান। এতে সিপ্রোফ্লক্সাসিন, এনরোফ্লক্সাসিন, টেট্রাসাইক্লিনসহ বিভিন্ন ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মাংসে অনাকাঙ্ক্ষিত ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যায়।

ব্রয়লার মুরগি পুরো জীবনচক্রে ১.৫–২ কেজি বর্জ্য উৎপন্ন করে। দেশে বছরে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ব্রয়লার উৎপাদিত হওয়ায় বিশাল পরিমাণ বর্জ্য অপরিশোধিত অবস্থায় জমি ও জলাশয়ে ফেলা হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানি ও নদীনালায় নাইট্রেট, ফসফরাস দূষণ, ভূগর্ভস্থ পানির মান নষ্ট হওয়া এবং অ্যামোনিয়া গ্যাস নিঃসরণের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যা মানুষের পাশাপাশি পরিবেশ ও প্রতিবেশের জন্যও মারাত্মক হুমকি।

অধ্যাপক শফিকুল ইসলাম বলেন, “পোলট্রি শিল্প দেশের প্রোটিনের চাহিদা পূরণে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহার এই অর্জনকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। আমরা ‘ওয়ান হেলথ’ ধারণার মাধ্যমে মানুষ, প্রাণী ও পরিবেশের স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে বিবেচনা না করলে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব হবে না। একটি ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষেত্র বাকি দুটিকেও ঝুঁকিতে ফেলে।”

ড. শফিকুল বলেন, অ্যান্টিবায়োটিকের বিকল্প হিসেবে প্রোবায়োটিক, প্রিবায়োটিক এবং কার্যকর ভেষজ উপাদান ব্যবহারের সুযোগ বাড়াতে হবে। খামারে বায়োসিকিউরিটি জোরদার করা, নিয়মিত টিকাদান নিশ্চিত করা এবং নিরাপদ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত জরুরি। খামারিদের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সচেতন করা এবং বাজারে ওষুধের অবাধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি গবেষণায় উদ্ভাবিত টেকসই প্রযুক্তি খামারে ছড়িয়ে দিয়ে ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ ও টেকসইভাবে উৎপাদিত মুরগির মাংস নিশ্চিত করা সম্ভব।

দেশের rapidly growing poultry industry-এর সঙ্গে যুক্ত এই স্বাস্থ্যঝুঁকিকে উপেক্ষা করা মোটেও সম্ভব নয়। মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা এবং পরিবেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে খামার এবং বাজার ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ, সচেতনতা এবং গবেষণার ফলাফল বাস্তবায়ন জরুরি। নইলে এই সুপরিচিত শিল্পই মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ভয়াবহ হুমকিতে পরিণত হতে পারে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত