প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষিত বেতন কাঠামোর নতুন দিকনির্দেশনা চূড়ান্ত পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে। জাতীয় বেতন কমিশন দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল প্রণয়নে শেষ প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে চলেছে, যার সুপারিশ আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়ার লক্ষ্য স্থির করা হয়েছে। এই সুপারিশের ভিত্তিতে ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে নবম জাতীয় বেতন স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
জাতীয় বেতন কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি বাদিউল কবিরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের দাবি এবং নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বাদিউল কবির জানান, এই বৈঠক অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। বৈঠকে কমিশন ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সুপারিশ প্রণয়নের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছে এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে গেজেট প্রকাশ করার পরিকল্পনা সম্পন্ন হবে।
নতুন পে-স্কেল প্রণয়নের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যেই কয়েক মাস ধরে চলছিল। গত ২৭ জুলাই জাতীয় বেতন কমিশন গঠন করা হয় এবং এরই মধ্যে তারা সরকারি চাকরিজীবী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, সরকারি সংস্থা ও বিভিন্ন সমিতি থেকে মতামত সংগ্রহ করেছে। অক্টোবরের প্রথম থেকে মধ্যবর্তী সময়ে অনলাইন প্রশ্নমালার মাধ্যমে সর্বসাধারণের মতামত নথিভুক্ত করা হয়েছে। এই ব্যাপক মতামত সংগ্রহ প্রক্রিয়া সরকারি কর্মচারীদের প্রত্যাশা ও দাবি সমূহকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
এছাড়াও, সোমবার (২৪ নভেম্বর) জাতীয় বেতন কমিশনের সম্মেলন কক্ষে সচিবদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে কমিশন নানাভাবে বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত রূপরেখা নির্ধারণের বিষয়ে আলোচনা করেছে। বৈঠকে বেতন গ্রেড কমানো, কর্মচারীদের প্রাপ্য ভাতা ও অনুকূল ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার বিষয়গুলো প্রধান আলোচ্য ছিল। কমিশন চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান বৈঠকে জানিয়েছেন, এই প্রক্রিয়াকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং প্রাসঙ্গিক রিপোর্ট সময়মতো জমা দেওয়ার জন্য কার্যক্রম ত্বরান্বিত করা হয়েছে।
অর্থাৎ, প্রায় তিন বছরের অপেক্ষার পর সরকারি কর্মচারীরা আশা করছেন, তাদের দীর্ঘদিনের বেতন কাঠামোর সংস্কার এবং গ্রেডের সমন্বয় বাস্তব রূপ পাবে। বাদিউল কবির উল্লেখ করেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে শুধু বেতন বৃদ্ধি নয়, বরং সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, চাকরির প্রতি উৎসাহ বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোর নিয়মিত সংস্কার একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নাগরিক সন্তুষ্টি এবং জনবিচার নিশ্চিত করার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। দীর্ঘদিন ধরে নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারি কর্মকর্তারা নানা অনশন, কর্মসূচি এবং দাবি আদায়ের পথ অনুসরণ করেছেন। ফলে এই নতুন পে-স্কেলের চূড়ান্ত সুপারিশ তাদের জন্য একটি বড় প্রত্যাশিত ফলাফল হিসেবে গণ্য হচ্ছে।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সম্প্রতি জানিয়েছেন, ‘আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনের পর নতুন সরকার এ সুপারিশ বাস্তবায়ন করবে’। তবে বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী দাবি আদায় ঐক্য পরিষদ তাদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং সতর্ক করেছেন যে, ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে গেজেট প্রকাশ না হলে কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এই প্রতিশ্রুতিকে কেন্দ্র করে আলোচনার পাশাপাশি উত্তেজনা লক্ষ্য করা গেছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারি খাতে কর্মসংস্থানের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা এবং চাকরিজীবীদের মানসিক প্রণোদনা বৃদ্ধি করা সম্ভব। সরকারি চাকরিজীবীদের অধিকাংশই দীর্ঘদিন ধরে বেতন বৃদ্ধি, ভাতা সমন্বয় এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে আপেক্ষিকভাবে বৈষম্য অনুভব করেছেন। নতুন পে-স্কেল প্রণয়ন এই সমস্যা সমাধানের দিকে বড় একটি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন বেতন কাঠামোতে মূলত বেতন গ্রেড, ভাতা, পেনশন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক সুবিধার একটি সমন্বিত পুনর্গঠন অন্তর্ভুক্ত। এতে কর্মচারীরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে পারবে এবং একই সঙ্গে সরকারি খাত আরও কার্যকর ও সুশৃঙ্খল হবে। এছাড়া, নতুন পে-স্কেল সরকারি বাজেট পরিকল্পনা এবং খাতভিত্তিক বরাদ্দের জন্যও একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা হিসেবে কাজ করবে।
সরকারি কর্মচারীরা আশা করছেন যে, নতুন বেতন স্কেলের গেজেট প্রকাশ হলে তা শুধু তাদের আর্থিক নিরাপত্তা বৃদ্ধি করবে না, বরং দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এছাড়া, সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যমান আর্থিক বৈষম্য ও অনিশ্চয়তা দূর হবে।
সবমিলিয়ে বলা যায়, জাতীয় বেতন কমিশনের নতুন সুপারিশ এবং ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে গেজেট প্রকাশের প্রক্রিয়া দেশের সরকারি খাতের স্থিতিশীলতা, চাকরিজীবীদের জীবনের মান উন্নয়ন এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতাকে নতুন মাত্রা যোগ করবে। এটি শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হবে।