প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর নিম্ন আদালতগুলো বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে দেশের নজর কাড়তে থাকা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক ঘটনায় মুখর হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ নেওয়ার অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে পৃথক তিনটি দুর্নীতি মামলার রায় আজ পড়া শুরু হয়েছে। এই মামলা রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিত্বদের বিরুদ্ধে হওয়ায় এবং দীর্ঘ সময় ধরে বিচার চলায় সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক কৌতূহল ও উত্তেজনা বিরাজ করছে।
ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ আদালতে বিচারক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন দুপুরে রায় পড়া শুরু করেন। রায়ের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগে সকাল থেকে আদালতের সামনে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নেয়। আদালতের ভিতরে এবং বাইরের পরিবেশে সাধারণ মানুষ, সাংবাদিক, আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
এ মামলায় গ্রেপ্তারকৃত একমাত্র আসামি রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশীদ আলমকে বৃহস্পতিবার সকালেই কারাগার থেকে আদালতে আনা হয়। অন্য আসামিরা পলাতক থাকায় তারা নিজ নিজ পক্ষে যুক্তিতর্ক বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পাননি। তবে দুদকের কৌঁসুলি খান মাইনুল হাসান (লিপন) সংবাদমাধ্যমকে জানান, “মেয়ে পুতুলের আবদার মেটাতে রাজউকের প্লট বরাদ্দ নেওয়ার সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। আমরা দলিল-দস্তাবেজ ও সাক্ষীদের প্রমাণের মাধ্যমে তাদের দুর্নীতির চিত্র প্রমাণ করতে পেরেছি। আশা করি শেখ হাসিনাসহ সব আসামি সর্বোচ্চ শাস্তি পাবেন।”
অন্যদিকে, আদালতে হাজির থাকা খুরশীদ আলমের আইনজীবী মো. শাহিনুর ইসলাম দাবি করেন, “আমার মক্কেল এই কার্যক্রমে কোনো ধরনের পদোন্নতি, সুবিধা বা অর্থনৈতিক লাভ পাননি। তিনি একেবারেই নির্দোষ। আশা করছি, আদালত ন্যায়বিচার প্রদান করবেন এবং তাকে খালাস দেবেন।”
প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত অভিযোগের প্রেক্ষিতে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পৃথক ছয়টি মামলা দায়ের করে দুদক। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ (পুতুল), বোন শেখ রেহানা, রেহানার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ান সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকসহ আরও অনেকে আসামি হয়েছেন। এছাড়াও জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কর্মকর্তাও অভিযুক্ত হয়েছেন।
বিচার চলাকালীন চার মাসে মামলায় ৯১ জন সাক্ষী আদালতে হাজির হয়েছেন। সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ পর্যায়ে আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন খুরশীদ আলম। তার আইনজীবীর জেরা শেষে, ২৩ নভেম্বর তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। তবে পলাতক আসামিরা আত্মপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেননি। এরপর দুদক ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শোনার পর বিচারক ২৭ নভেম্বর রায়ের দিন ধার্য করেন।
বিচারকের কাছে অভিযোগে বলা হয়েছে, রাজউকের পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পের ২৭ নম্বর সেক্টরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ১০ কাঠা করে মোট ছয়টি প্লট বরাদ্দ নেওয়া হয়। এই অভিযোগে শুধু হাসিনা পরিবার নয়, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং সাবেক মন্ত্রিসভা সদস্যরাও অভিযুক্ত। এর মধ্যে রয়েছেন সচিব, অতিরিক্ত সচিব, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, সিনিয়র সহকারী সচিব, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান, সাবেক সদস্যরা এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলা এবং আজকের রায় দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে উল্লেখযোগ্যভাবে প্রভাবিত করতে পারে। এটি শুধুমাত্র একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা তার পরিবারের বিষয় নয়; এটি দেশের শীর্ষ পর্যায়ের ক্ষমতার অপব্যবহার ও সরকারের স্বচ্ছতা নিয়ে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।
আদালত প্রাঙ্গণে থাকা সাধারণ নাগরিকরা জানান, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই রায়ের জন্য অপেক্ষা করছি। এটি শুধু বিচার প্রক্রিয়ার অংশ নয়, দেশের স্বচ্ছতা ও ন্যায়ের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।” আদালতের বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন অনেকেই, তারা আশা প্রকাশ করেন যে রায়ের মাধ্যমে দেশের দুর্নীতিবিরোধী মানসিকতা আরও দৃঢ় হবে।
রাজনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে, এই রায় শুধু সাবেক প্রধানমন্ত্রী বা তার পরিবারকে কেন্দ্র করে নয়, বরং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দুর্নীতির প্রমাণীকরণের দিক থেকে ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। বিচারকরা এই মামলায় আইনানুগভাবে কঠোর ন্যায়বিচার প্রদানের ক্ষেত্রে নজরদারি রাখবেন, যা দেশের জনগণের কাছে একটি শক্তিশালী বার্তা হিসেবে ধরা পড়তে পারে।
তবে আইন বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, পলাতক আসামিরা রায়ে সরাসরি উপস্থিত না থাকায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়া সম্ভব হলে আপিলের সুযোগ ও প্রক্রিয়া থাকছে। তাই রায়ের ফলাফল শুধুমাত্র আদালতের বর্তমান সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দেশের বিচার ব্যবস্থার পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রকৃত প্রভাব দেখা যাবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এই মামলার রায় দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। এটি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ববোধ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের সীমা সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি করবে। একদিকে যেখানে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করছেন, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোও রায়ের প্রভাব এবং জনগণের প্রতিক্রিয়ার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছে।
আজকের এই রায়ের মাধ্যমে দেশের নাগরিকরা নজরে রাখতে চাইছেন, যে কোনো পদে থাকুক না কেন, কেউ দুর্নীতির মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা গ্রহণ করলে তার বিরুদ্ধে আইনের প্রয়োগ হতে বাধা নেই। এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সততা ও দায়বদ্ধতার বার্তা বহন করছে।
আদালতের প্রাঙ্গণ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রায় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ জনগণ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আগামী পদক্ষেপ এবং রায়ের প্রভাব নিয়ে সরাসরি মনোযোগ রাখবেন। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এটি শুধু বিচার প্রক্রিয়ার বিষয় নয়, দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এই তিন মামলার রায় পড়ার প্রক্রিয়া চলাকালীন দেশের নাগরিকরা বিচারিক স্বচ্ছতা এবং সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দায়িত্বশীলতার দিকে নজর রাখছেন। আগামীদিনে এই রায়ের প্রভাব রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।