প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক। একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানীর পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে পৃথক তিনটি মামলায় আদালত রাজউকের সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) মোহাম্মদ খুরশিদ আলমকে এক বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার পাঁচ নম্বর বিশেষ জজ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুনের আদালত এ রায় দেন। সকালে খুরশিদ আলমকে আদালতে হাজির করা হয় এবং উপস্থিত থাকাকালীনই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের রায় ঘোষণা করা হয়।
এই মামলার প্রসঙ্গে আদালতের সূত্রে জানা গেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্লট বরাদ্দ নেওয়া প্রসঙ্গে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিনটি পৃথক মামলায় মোট ২১ বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। খুরশিদ আলম এই তিন মামলার একমাত্র আসামি, যিনি আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং নিজেই রায়ের মুখোমুখি হয়েছেন। অন্য ২২ জন পলাতক থাকায় তারা নিজেদের পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করতে পারেননি এবং আত্মপক্ষ শুনানিতেও অংশ নিতে পারেননি।
দূর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কৌঁসুলি খান মাইনুল হাসান জানিয়েছেন, “রাজউকের প্লট বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় মেয়ে পুতুলের আবদার মেটাতে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আমরা আদালতে দলিল-দস্তাবেজ ও সাক্ষীদের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ উপস্থাপন করেছি। আশা করি, আদালত তাদের সর্বোচ্চ সাজা প্রদান করবেন।”
অন্যদিকে, কারাগারে থাকা একমাত্র আসামি খুরশিদ আলমের আইনজীবী মো. শাহিনুর ইসলাম জানিয়েছেন, “আমার মক্কেল এই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের পদোন্নতি বা বেনিফিট গ্রহণ করেননি। তিনি সরকারি সম্পত্তির বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় কোনো সুবিধা পাননি। তাই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ অপ্রমাণিত। আমরা আশা করি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হলে তাকে খালাস দেওয়া হবে।”
আদালত সূত্রে আরও জানা যায়, রাজউকের পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে পৃথক ছয়টি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, বোন শেখ রেহানা, রেহানার মেয়ে টিউলিপ রিজওয়ান সিদ্দিক, ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ও অপর মেয়ে আজমিনা সিদ্দিকসহ আরও অনেককে আসামি করা হয়েছিল।
শেখ পরিবারের বাইরে ছয় মামলায় অন্যান্য আসামিরা ছিলেন—জাতীয় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব শহীদ উল্লা খন্দকার, অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) কাজী ওয়াছি উদ্দিন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম সরকার, সিনিয়র সহকারী সচিব পুরবী গোলদার, রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান আনিছুর রহমান মিঞা, সাবেক সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) খুরশিদ আলম, সদস্য (প্রশাসন ও অর্থ) কবির আল আসাদ, সদস্য (উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ) তন্ময় দাস, সদস্য (এস্টেট ও ভূমি) নুরুল ইসলাম, সাবেক সদস্য (পরিকল্পনা) মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন, সাবেক মেজর (ইঞ্জিনিয়ার) সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী (অব.), পরিচালক (এস্টেট ও ভূমি-২) শেখ শাহিনুল ইসলাম, উপপরিচালক হাফিজুর রহমান, হাবিবুর রহমান, সাবেক প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক একান্ত সচিব সালাউদ্দিন।
প্লট বরাদ্দ সংক্রান্ত এই মামলায় আদালত দীর্ঘদিন ধরে তদন্ত ও সাক্ষ্যগ্রহণের ভিত্তিতে রায় প্রদান করেছে। সাক্ষ্য গ্রহণের সময় প্রায় ৯১ জন সাক্ষীর বক্তব্য বিবেচনা করা হয়। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের ২২ জন সদস্য পলাতক থাকায় তারা রায়ের সময় আদালতে উপস্থিত ছিলেন না। একমাত্র খুরশিদ আলম উপস্থিত থেকে নিজের বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খুরশিদ আলমের কারাদণ্ড দেশের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও সরকারি সম্পত্তির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। খুরশিদের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণার ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনে সতর্ক হওয়ার বার্তা প্রদান করেছে আদালত।
সাধারণ জনগণও এই রায়ের ব্যাপারে নানা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। অনেকে মনে করছেন, এটি সরকারি সম্পত্তি সংরক্ষণের জন্য এবং দুর্নীতি দমন প্রচেষ্টাকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে কেউ কেউ মনে করছেন, এই রায় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিতর্কিত ও সমালোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।
রাজউকের পূর্বাচল প্রকল্পের প্লট বরাদ্দে সংঘটিত দুর্নীতির রায় প্রকাশের পর রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ জনগণ সরাসরি এই মামলার প্রভাব নিয়ে আলোচনা করছে। কারাগারে থাকা একমাত্র আসামির বিরুদ্ধে আদালত যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা প্রমাণ করছে। অন্যদিকে, পলাতক আসামিদের অনুপস্থিতি এই মামলার রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবকে আরও বিস্তৃত করেছে।
এই মামলার রায় দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে একটি নতুন দিক নির্দেশনার সূচনা করতে পারে। আদালতের এই রায় সাধারণ মানুষকে সরকারি সম্পত্তি রক্ষার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার বার্তা প্রদান করছে এবং সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ববোধ বৃদ্ধি করতে সহায়তা করছে। একই সঙ্গে, আদালতের ন্যায্য সিদ্ধান্ত দেশের জনগণ ও রাজনৈতিক মহলে আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বের বার্তা জারি করেছে।
রাজউক কর্মকর্তাদের দায়িত্বের সীমা ও ক্ষমতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আদালতের এই রায় ভবিষ্যতের জন্য এক শিক্ষণীয় উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। খুরশিদ আলমের কারাদণ্ড, যদিও সীমিত সময়ের জন্য হলেও, সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি নজরদারি এবং নৈতিকতার গুরুত্বকে প্রমাণ করেছে।