দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে চাইলে খাবারে বাড়ান এই উপাদান

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : বৃহস্পতিবার, ২৭ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৭০ বার
দীর্ঘদিন সুস্থ থাকতে চাইলে খাবারে বাড়ান এই উপাদান

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

দৈনন্দিন জীবনে খাবার নিয়ে হিসাব–নিকাশের শেষ নেই। কখনো ক্যালোরি, কখনো কার্বোহাইড্রেট, আবার কখনো প্রোটিন। সুস্থ থাকতে হলে কোন খাবার কতটা প্রয়োজন—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমরা অনেক সময় এমন কিছু বিষয় এড়িয়ে যাই, যা শরীরের জন্য অত্যন্ত জরুরি। ঠিক তেমনই এক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো খাদ্যআঁশ বা ফাইবার। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন শারীরিকভাবে সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় আঁশ বাড়ানোই হতে পারে সহজ, সাশ্রয়ী এবং কার্যকর উপায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্প্রতি হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সার্জন ডা. জেরেমি লন্ডন একটি ভিডিও প্রকাশ করেছেন, যেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেছেন খাদ্যআঁশের উপকারিতা এবং মানুষের বর্তমান খাদ্যাভ্যাসে এর ঘাটতি কিভাবে শরীরকে ধীরে ধীরে ক্ষতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁর মতে, আধুনিক খাদ্যাভ্যাসে প্রক্রিয়াজাত, তেল–মসলা ও অতিরিক্ত চিনি–সমৃদ্ধ খাবারের বিপরীতে আঁশসমৃদ্ধ খাবারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। অথচ সহজলভ্য এবং তুলনামূলক কম দামে পাওয়া এই উপাদানটি শরীরের নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ইতিবাচকভাবে প্রভাব রাখে।

ডা. লন্ডন জানান, প্রথমত খাদ্যআঁশ রক্তে চর্বির মাত্রা কমাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। শরীরে এলডিএল বা খারাপ কোলেস্টেরল জমে গেলে ধমনী শক্ত হয়ে যায়, রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয় এবং হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। ওটস, ডাল কিংবা ইসবগুলে থাকা দ্রবণীয় আঁশ শরীরের ভেতর অতিরিক্ত কোলেস্টেরল শোষণ করে তা বের করে দিতে সাহায্য করে। পাশাপাশি ইনসুলিন প্রতিরোধ কমিয়ে ডায়াবেটিসের সম্ভাবনাও হ্রাস করে। দীর্ঘমেয়াদে আঁশসমৃদ্ধ খাদ্য গ্রহণ হৃদপিণ্ডকে সুস্থ রাখতে কার্যকর ভূমিকা পালন করে—এ বিষয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রায় ঐক্যমত্য রয়েছে।

তিনি আরও জানান, ভালো হজমের জন্য আঁশ অত্যন্ত প্রয়োজন। নিয়মিত আঁশ খেলে মলের ভর বাড়ে, ফলে মলত্যাগ সহজ হয় এবং কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা কমে যায়। যাদের হজমের সমস্যা দীর্ঘদিন ধরে চলছে, তাদের জন্য খাদ্যআঁশ একটি প্রাকৃতিক সহায়ক উপাদান হিসেবে কাজ করে। অন্ত্রে খাদ্যের গতি ঠিক থাকে, ফলে শরীরে ক্ষতিকর উপাদান জমে থাকার সুযোগ কমে। এতে ডাইভার্টিকুলার রোগ ও কোলন–সংক্রান্ত জটিলতার ঝুঁকিও কমে। চিকিৎসকরা জানান, আঁশের এই ভূমিকা স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

খাদ্যআঁশ শুধু হজমেই সাহায্য করে না; এটি শরীরের মাইক্রোবায়োম বা অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ খাদ্য উৎস। অন্ত্রের এসব ব্যাকটেরিয়া মানবদেহে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে, প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বিপাকক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে চালাতে সাহায্য করে। আঁশ থেকে উৎপন্ন শর্ট-চেইন ফ্যাটি অ্যাসিড শরীরের প্রদাহ কমিয়ে দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি কমায়। ডা. লন্ডন বলেন, গাট হেলথ বা অন্ত্রের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সঙ্গে আমাদের মেজাজ, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এমনকি অনেক ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যও সম্পর্কিত। ফলে খাদ্যআঁশের ঘাটতি ধীরে ধীরে বহু ধরনের শারীরিক সমস্যা ডেকে আনতে পারে।

এর পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণেও খাদ্যআঁশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আঁশযুক্ত খাবার পেট ভরিয়ে রাখে, দীর্ঘসময় ক্ষুধা লাগতে দেয় না এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমায়। এর ফলে শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমার সুযোগ কমে যায়। বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, যাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় বেশি আঁশ থাকে, তাদের ওজন অন্যান্যদের তুলনায় স্থিতিশীল থাকে এবং স্থূলতার ঝুঁকি তুলনামূলক কম দেখা যায়। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জীবনযাত্রায় ব্যস্ততা ও ফাস্টফুড–নির্ভরতায় ভরসা করা মানুষের মধ্যে সহজ উপায়ে সুস্থতার জন্য আঁশ হতে পারে কার্যকর সঙ্গী।

প্রশ্ন ওঠে, প্রতিদিন কতটা আঁশ প্রয়োজন? ডা. লন্ডনের মতে, নারীদের প্রতিদিন অন্তত ২৫ গ্রাম এবং পুরুষদের অন্তত ৩৮ গ্রাম খাদ্যআঁশ গ্রহণ করা উচিত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ মানুষই সেই পরিমাণ আঁশ গ্রহণ করেন না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে থাকে। বিশেষ করে নগরজীবনে ব্যস্ত কর্মসূচির কারণে অনেকেই তাড়াহুড়ো করে সাদা রুটি, ভাজাপোড়া কিংবা প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভর করেন—যা শরীরকে প্রয়োজনীয় আঁশ দিতে ব্যর্থ হয়।

খাদ্যতালিকায় সহজেই আঁশ বাড়ানো সম্ভব, শুধু কিছু ছোট পরিবর্তন করলেই। সকালের নাস্তার টেবিলে সাদা রুটির বদলে সম্পূর্ণ গমের রুটি বা ওটস রাখা যায়। ভাত, স্যুপ বা সালাদের সঙ্গে কিছুটা মসুর ডাল, ছোলা বা মুগডাল যুক্ত করলে খাবারের স্বাদ যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে আঁশের পরিমাণ। নাস্তার সময় চিপস বা ভাজা খাবারের পরিবর্তে বাদাম, ফল বা বিভিন্ন বীজ খাওয়া যেতে পারে। দই, সালাদ বা সিরিয়ালে চিয়া, ফ্ল্যাক্স বা কুমড়োর বীজ ছিটিয়ে দিলে তা হজমে সহায়ক হওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আঁশ সরবরাহ করে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আঁশ ঠিকভাবে কাজ করতে পর্যাপ্ত পানি অপরিহার্য। পানি ছাড়া আঁশ হজমপ্রক্রিয়ায় উল্টো জটিলতা তৈরি করতে পারে।

পুষ্টিবিদদের মতে, খাদ্যআঁশের গুরুত্ব কেবল শরীরের ভেতরের প্রক্রিয়া নিয়েই নয়, মানুষের সামগ্রিক জীবনযাত্রার মান উন্নত করতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিয়মিত আঁশ গ্রহণ করলে শক্তি ধরে রাখা সহজ হয়, ঘুমের মান উন্নত হয় এবং নানা শারীরিক দুর্বলতা কমে আসে। এমনকি মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমাতেও গাট হেলথ বা অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো থাকার ভূমিকা রয়েছে।

খাদ্যআঁশের প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞরা বারবার জোর দিচ্ছেন একটি কারণেই—এটি এমন একটি উপাদান, যা শরীরকে প্রাকৃতিকভাবে সুস্থ রাখে, কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছাড়াই নানা গুরুত্বপূর্ণ রোগের ঝুঁকি কমাতে পারে। আধুনিক চিকিৎসা ও পুষ্টিবিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে খাদ্যতালিকায় অপর্যাপ্ত আঁশকে অনেক রোগের কেন্দ্রীয় ঝুঁকিগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাই প্রতিদিনের খাবারে একটু সচেতনতা আর কিছুটা পরিবর্তন এনে দীর্ঘ সময় সুস্থ থাকার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।

সুস্থ জীবন শেষে অর্জন নয়—এটি প্রতিদিনের চর্চার ফল। আর সেই চর্চায় খাদ্যআঁশকে যুক্ত করা হতে পারে সবচেয়ে সহজ, কিন্তু অত্যন্ত কার্যকর একটি পদক্ষেপ।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত