প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
রাজধানী ঢাকার কর্মচঞ্চল রাস্তায় প্রতিদিন লাখো মানুষের যাতায়াতের প্রধান ভরসা রিকশা। এই রিকশাগুলো টেনে চলা মানুষের জীবন যাপন, সংগ্রাম ও চ্যালেঞ্জগুলো প্রায় সময়ই আড়ালে থেকে যায়। কঠোর পরিশ্রম করা সত্ত্বেও অধিকাংশ রিকশাচালকই বৈষম্য, আর্থিক অনিশ্চয়তা, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও অসচেতনতার কারণে একটি ন্যূনতম জীবনমানেও পৌঁছাতে পারে না। তাদের এই বাস্তবতা বদলাতে এবং জীবনকে কিছুটা হলেও সুশৃঙ্খল ও উন্নত করতে ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়েছে সামাজিক সাহায্য সংস্থা আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে জানা গেছে, ফাউন্ডেশনটি রিকশাচালকদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে বিশেষ এক কর্মশালার আয়োজন করেছে, যা অনুষ্ঠিত হবে আগামী ৫ ডিসেম্বর। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত চলমান এই দিনব্যাপী কর্মসূচি হবে রাজধানীর আফতাবনগরে ফাউন্ডেশনের নিজস্ব অডিটোরিয়ামে, যেখানে প্রায় সাতশো আসনের সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, সমাজের সবচেয়ে পরিশ্রমী অথচ সবচেয়ে অবহেলিত একটি শ্রেণির জন্য এমন উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং মানবিক।
কর্মশালাটির মূল উদ্দেশ্য হলো রিকশাচালকদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে প্রয়োজনীয় সচেতনতা বৃদ্ধি করা। শহরের সড়কে দীর্ঘ সময় কাটানো রিকশাচালকদের জীবনে নিরাপত্তার গুরুত্ব অপরিসীম, কিন্তু বাস্তবে তাদের অনেকেই ট্র্যাফিক আইন কিংবা নিরাপদ চলাচল সম্পর্কে যথাযথভাবে জানেন না। ফলে দুর্ঘটনা ঘটে, আর্থিক ক্ষতি হয়, কখনো কখনো জীবনও হুমকির মুখে পড়ে। এই বাস্তবতা থেকেই প্রশিক্ষণে ট্র্যাফিক আইন ও রাস্তার নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ সেশন রাখা হয়েছে। এতে থাকবেন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞরা, যারা রিকশাচালকদের সহজ ভাষায় নিরাপদ চলাচলের উপায়, সড়কে দায়িত্বশীল আচরণ এবং দুর্ঘটনা এড়ানোর বিভিন্ন কৌশল শেখাবেন।
শুধু রাস্তার নিরাপত্তাই নয়, রিকশাচালকদের শারীরিক স্বাস্থ্যও এই কর্মশালার অন্যতম আলোচ্য বিষয়। দীর্ঘসময় রিকশা চালানোর ফলে তারা কোমর, মেরুদণ্ড, হাঁটু এবং পায়ের বিভিন্ন সমস্যায় ভোগেন। সঠিক যত্ন বা চিকিৎসার অভাবে এসব সমস্যা প্রায়ই দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়। কর্মশালায় জাতীয় হৃদ্রোগ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল আলম সুমন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত ঝুঁকি নিয়ে বিস্তারিত কথা বলবেন। তিনি ব্যাখ্যা করবেন কোন পরিস্থিতিতে কী ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে, কীভাবে ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখতে হবে, কীভাবে নিয়মিত কিছু ব্যায়াম করলে দীর্ঘমেয়াদে উপকার পাওয়া যায় এবং কোন লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। তার বক্তব্য রিকশাচালকদের জন্য বাস্তবসম্মত দিকনির্দেশনা হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এছাড়া কর্মশালায় থাকছে রিকশাচালকদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনের নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা। পারিবারিক দায়িত্ব, আচরণ, নৈতিকতা—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেবেন ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমাদুল্লাহ। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের জন্য আধ্যাত্মিক ও নৈতিক দিকনির্দেশনায় কাজ করছেন। তার মতে, পরিবার সমাজের মূল ভিত্তি, আর পরিবারকে সুশৃঙ্খল ও সুখী রাখতে হলে দায়িত্বশীল আচরণ সবচেয়ে প্রয়োজন। রিকশাচালকদের কাজের সময় দীর্ঘ হলেও তাদের পরিবার–পরিজনদের যথেষ্ট সময় দেওয়া এবং সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালন করা অত্যন্ত জরুরি। তার বক্তব্য এই শ্রেণির মানুষের জীবনে মানবিক সুর ছড়িয়ে দিতে পারে।
ইসলামে শ্রমের মর্যাদা এবং হালাল উপার্জনের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করবেন মিরপুর মসজিদুল জুমা কমপ্লেক্সের খতিব আব্দুল হাই মুহাম্মদ সাইফুল্লাহ। তিনি তুলে ধরবেন—শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই তার প্রাপ্য মজুরি দেওয়ার ইসলামী নির্দেশনা এবং শ্রমকে ইবাদত হিসেবে বিবেচনা করার শিক্ষা। রিকশাচালকদের অনেকেই ধর্মীয় মূল্যবোধে বিশ্বাসী হওয়ায় এসব আলোচনা তাদের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এতে তাদের কাজের প্রতি আত্মমর্যাদা বৃদ্ধি পাবে এবং জীবনের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি হবে বলে আশা করছেন আয়োজকেরা।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা রিকশাচালকদের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বল্প আয়ের কারণে তাদের অনেকেই সঞ্চয় বা ব্যয় ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে খুব বেশি জানেন না। ফলে হাতে টাকা এলেও মাস শেষে হিসাব মেলে না, আর চাহিদা বাড়লেই লোন বা ধারদেনায় জড়িয়ে পড়েন। এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে কীভাবে সামান্য আয়ের মধ্যেও সঞ্চয় গড়া যায়, কীভাবে সংসার পরিচালনা করলে পরিবার ঝুঁকির মুখে না পড়ে—এসব নিয়ে প্রশিক্ষণ দেবেন আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের সেক্রেটারি জেনারেল প্রকৌশলী সাবির আহম্মেদ। তার বক্তব্যের উদ্দেশ্য হলো রিকশাচালকদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দক্ষ করে তোলা, যাতে তারা নিজের ও পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করতে পারেন।
প্রশিক্ষণের শেষে অংশগ্রহণকারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ আয়োজন। প্রত্যেক রিকশাচালককে একটি টি–শার্ট ও শীতের একটি হুডি দেওয়া হবে, যা ঠান্ডার সময় তাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা হবে। এছাড়া জীবনমান উন্নয়ন ও ব্যক্তিগত উন্নতির ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে পারা একজন রিকশাচালককে ওমরাহ করার সুযোগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন। এই বিশেষ পুরস্কার রিকশাচালকদের মধ্যে দারুণ উৎসাহ সৃষ্টি করেছে। অনেকেই মনে করছেন, এটি শুধু একটি ধর্মীয় সফর নয়, বরং তাদের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা ও মূল্যায়নের প্রকাশ।
ফাউন্ডেশনের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, আফতাবনগরের এই সাতশো আসন বিশিষ্ট অডিটোরিয়ামে বছরব্যাপী বিভিন্ন শ্রেণি–পেশার মানুষের জন্য দাওয়াতি ও জীবনমান উন্নয়নমূলক কার্যক্রম আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, ব্যাংকার, আইনজীবী, গণমাধ্যমকর্মী—সমাজের প্রায় সব শ্রেণির মানুষের জন্য আলাদা আলাদা কর্মসূচি থাকবে। এর মাধ্যমে ব্যক্তিগত উন্নয়ন, নৈতিক দিকনির্দেশনা এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হবে।
আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগকে অনেক বিশেষজ্ঞ ও সাধারণ মানুষ সমাজ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি মডেল হিসেবে দেখছেন। কারণ উন্নয়ন শুধু অর্থনৈতিক অবকাঠামো দিয়ে হয় না; হয় মানুষকে সচেতন, দক্ষ এবং আত্মমর্যাদাবান করে গড়ে তোলার মাধ্যমে। রিকশাচালকদের মতো পরিশ্রমী মানুষেরা যদি সঠিক দিকনির্দেশনা পায়, তবে তাদের জীবনই শুধু বদলাবে না—সমগ্র সমাজই উপকৃত হবে।
জীবনের চাকা যেভাবে রিকশার প্যাডেলে ঘুরে সামনে এগিয়ে চলে, ঠিক তেমনি রিকশাচালকদের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে সঠিক প্রশিক্ষণ, সচেতনতা এবং সামান্য সহমর্মিতার মাধ্যমে। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের এই কর্মশালা সেই পরিবর্তনের আরেকটি মূল্যবান পদক্ষেপ হয়ে উঠবে বলেই আশাবাদ সংশ্লিষ্টদের।










