ঢাবিতে আইবিএর পরীক্ষা দিয়ে শুরু হলো ভর্তিযুদ্ধ

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪০ বার
ঢাবি বিজ্ঞান ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষা ২৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন শিক্ষাবর্ষের সবচেয়ে প্রতীক্ষিত সময় আবারও উপস্থিত হয়েছে। হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন, পরিশ্রম আর পরিবার-সমাজের প্রত্যাশাকে ঘিরে শুরু হয়েছে ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি পরীক্ষা। সেই ভর্তিযুদ্ধের সূচনা হলো আজ শুক্রবার, আইবিএর ভর্তি পরীক্ষা দিয়ে। রাজধানীর বিভিন্ন কেন্দ্র ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস আজ সকাল থেকেই হয়ে উঠেছে উৎসবমুখর, একই সঙ্গে উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা ও আত্মবিশ্বাসের মিশ্রণে ভরপুর এক প্রাণচঞ্চল পরিবেশে।

আজ সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয় বহুল আকাঙ্ক্ষিত ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউট—আইবিএ’র ভর্তি পরীক্ষা। পরীক্ষার আগেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল প্রবেশপত্র, নির্দেশনাবলী ও আসনবিন্যাস। এসব তথ্য হাতে নিয়ে পরীক্ষার্থীদের অনেকে ভোর থেকেই পৌঁছে যান কেন্দ্রের সামনে। কেউ পরিবারের সঙ্গে, কেউ আবার বন্ধুদের সঙ্গী করে। সবার চোখেমুখে একই রকম লক্ষ্য—স্বপ্নের সূচনা।

আইবিএ ঢাবির সবচেয়ে প্রতিযোগিতাপূর্ণ ইউনিটগুলোর একটি। মাত্র ১২০টি আসনের বিপরীতে এ বছর আবেদন করেছে ১১ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। এমন প্রতিযোগিতায় কে কার অবস্থানে থাকবেন, তা নির্ধারণ করে দেবে আজকের পরীক্ষা। তবুও পরীক্ষার্থীরা জানায়, প্রস্তুতির শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা নিজেদের সেরাটুকুই দেয়ার চেষ্টা করেছেন। পরীক্ষার হলে প্রবেশের আগে অনেকেই শেষ মুহূর্তের আলোচনা, দোয়া ও আত্মবিশ্বাসের বার্তা নিয়ে একে অপরকে অনুপ্রাণিত করতে দেখা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, এ বছর মোট পাঁচটি ইউনিটে প্রায় ৬ হাজার ১২৫টি আসনে ভর্তি নেয়া হবে। আবেদন প্রক্রিয়া শুরু হয় ২৯ অক্টোবর, শেষ হয় ১৯ নভেম্বর রাত ১১টা ৫৯ মিনিটে। অনলাইনে আবেদন ও ফি প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া এ বছর ছিল আরও স্বয়ংক্রিয় ও সহজতর। এতে পরীক্ষার্থীদের ঝামেলা কমলেও প্রতিযোগিতার মাত্রা বেড়েছে বহুগুণ। অনেকেই বলছেন, অনলাইন সুবিধা বাড়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও আবেদন বেড়েছে, যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মানুষের আস্থা ও আগ্রহের প্রতিফলন।

আইবিএ ইউনিটের পরীক্ষা শেষ হলেও ভর্তি পরীক্ষা শেষ হতে এখনও সময় বাকি। আগামীকাল শনিবার ২৯ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হবে চারুকলা ইউনিটের সাধারণ জ্ঞান ও অঙ্কন পরীক্ষা, যা বরাবরের মতোই আলাদা প্রস্তুতির দাবি রাখে। এ ইউনিটে ভর্তি হতে হলে সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি শিল্পকলার বিভিন্ন শাখা সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি। ফলে আজকের পরীক্ষা শেষ করে অনেকে আবার রাতেই চারুকলার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত হয়ে পড়বেন।

৬ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে ব্যবসায় শিক্ষা ইউনিটের পরীক্ষা। ব্যবসায় ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পড়তে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য এই ইউনিটটি অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। অন্যদিকে কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা ১৩ ডিসেম্বর এবং বিজ্ঞান ইউনিটের পরীক্ষা ২০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হবে। ঢাবিতে ভর্তি পরীক্ষা ধাপে ধাপে হওয়ায় প্রতিটি ইউনিটের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও মনোযোগ আলাদা সময় নিয়ে পরিচালিত হয়। এতে চাপ কিছুটা কমলেও প্রতিযোগিতা থাকে যথারীতি তীব্র।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা, কেন্দ্রের ভেতর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, জালিয়াতি প্রতিরোধ—সবকিছু নিশ্চিত করতে এবার আরও বাড়ানো হয়েছে প্রযুক্তিগত নজরদারি। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে ছিল বিশেষ নিরাপত্তা টিম, মেটাল ডিটেক্টর, ডিজিটাল মনিটরিং, এমনকি সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড সনাক্তে বাড়তি তৎপরতাও। দায়িত্বে থাকা শিক্ষক ও কর্মীদের মধ্যেও ছিল দায়িত্বশীল উপস্থাপনা, যাতে কোনোভাবেই পরীক্ষার মান বা সুষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন না ওঠে।

পরীক্ষার আগে ও পরে কিছু মানবিক দৃশ্যও চোখে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে। এক পরীক্ষার্থী জানান, তিনি পরিবারের একমাত্র সন্তান। বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, মা গৃহিণী। পরিবারের সব আশা-ভরসা তার ওপর। তিনি বলেন, “আইবিএতে ভর্তি হওয়া কেবল আমার স্বপ্ন নয়, এটি আমার পরিবারকেও স্বপ্ন দেখতে শেখাবে।” আরেক শিক্ষার্থী জানান, তিনি গ্রামের স্কুল থেকে পড়েছেন। প্রথমবার ঢাবি ক্যাম্পাসে এসে তার মনে হয়েছে, এখানে পড়ার সুযোগ পাওয়া মানেই জীবনের নতুন দরজা খুলে যাওয়া।

পরীক্ষাকেন্দ্রের বাইরে অভিভাবক ও পরিবারের সদস্যরা অপেক্ষা করেন উদ্বেগ আর আশা নিয়ে। কারও হাতে পানির বোতল, কারও হাতে রোদ থেকে বাঁচার ছাতা। বাবা-মায়ের চোখে দেখা যায় সন্তানের জন্য এক গভীর ভালোবাসা ও সাফল্যের আকাঙ্ক্ষা। অনেকের মুখে শোনা যায় দোয়া, আবার কেউ কেউ পরীক্ষার সময়টুকু নীরবে চোখ বন্ধ করে থাকেন। তাদের কাছে এই কয়েক ঘণ্টাই যেন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী মুহূর্ত।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতীক। এখানকার ভর্তি পরীক্ষা তাই কেবল একটি একাডেমিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একধরনের সামাজিক উদযাপনও। পরিবারের সবাই মিলে প্রস্তুতি নেওয়া, আত্মীয়স্বজনের দোয়া পাওয়া, পরীক্ষা শেষে ফলাফল প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এটি এক ধরনের যাত্রা, যা ভবিষ্যৎ গড়ে দেয়। আর আইবিএ পরীক্ষা সেই যাত্রার প্রথম ধাপ হিসেবে বিশেষ গুরুত্ব রাখে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও মনে করেন, ভর্তি পরীক্ষা শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, যুক্তি, বিশ্লেষণক্ষমতা ও মানসিক প্রস্তুতির একটি বাস্তব মূল্যায়ন। তাই শুধু মুখস্থবিদ্যা নয়, বরং সামগ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা যাচাইয়ের ওপর গুরুত্ব দেন তারা। এমনকি আইবিএর ভর্তি পরীক্ষা, যেখানে ইংরেজি দক্ষতা থেকে গণিত—সবকিছুতেই গভীর প্রস্তুতি প্রয়োজন, সেটি শিক্ষার্থীদের আরও দক্ষ হতে উদ্বুদ্ধ করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি যাত্রা আগামী কয়েক সপ্তাহ ধরে চলবে। পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ, মেধাতালিকা, কোটার বিষয়, ভর্তির কাগজপত্র নিয়ে জমজমাট সময় কাটবে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের। কিন্তু আজকের দিনটি বিশেষ, কারণ আইবিএ ইউনিটের পরীক্ষা দিয়েই শুরু হলো এ বছরের বড় প্রতিযোগিতা, যেখানে প্রতিটি শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও পরিবারের প্রত্যাশা মিলেমিশে গড়ে তুলছে নতুন শিক্ষা-অভিযাত্রার পথ।

আজকের পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের সামনে অপেক্ষা করছে আরও কিছু ইউনিট, আরও কিছু চ্যালেঞ্জ। কিন্তু শুরুটা হলো আত্মবিশ্বাসী পায়ে। অনেকেই হয়তো আইবিএতে জায়গা পাবেন, কেউ কেউ পাবেন অন্য ইউনিটে, আবার কেউ নতুন করে পথ খুঁজবেন। কিন্তু প্রত্যেকেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে নিজেদের স্বপ্ন ও ক্ষমতা দিয়ে তৈরি করবেন নতুন গল্প।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত