প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি বৃহস্পতিবার (২৭ নভেম্বর) রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক টেলিভিশন ভাষণে জানিয়েছেন, সম্প্রতি ১২ দিনের যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে এবং তারা প্রত্যাশিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ‘খালি হাতে ফিরে গেছে’। খামেনি বলেন, এই যুদ্ধ ইরানের বিরুদ্ধে ২০ বছরের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়েছিল। মূল উদ্দেশ্য ছিল ইরানি জনগণকে উত্তেজিত করে তাদের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামানো, তবে পরিকল্পনা উল্টো দিকে গিয়েছে। যুদ্ধের এই পরিস্থিতি ইরানকে শক্তিশালী করেছে এবং দেশের ভেতরে এক সর্বজনীন ঐক্য তৈরি হয়েছে।
ভাষণে খামেনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই যুদ্ধে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে আধুনিক আক্রমণাত্মক ও প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্র ব্যবহার সত্ত্বেও তারা তাদের লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বরং এই যুদ্ধ ইরানের জনগণকে আরও ঐক্যবদ্ধ করেছে এবং দেশের নেতৃত্বের প্রতি আস্থা বাড়িয়েছে। তবে খামেনি স্বীকার করেছেন, ইরানও কিছু ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। যুদ্ধের স্বাভাবিক নিয়মে দেশটি মূল্যবান জীবন হারিয়েছে, কিন্তু ইসলামী প্রজাতন্ত্রের দৃঢ় সংকল্প ও প্রতিরোধশীল শক্তি এ যুদ্ধের মাপকাঠিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী হয়েছে।
খামেনি বিশেষভাবে গাজায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই ঘটনায় ইসরাইলের বিরুদ্ধে বিশ্বের মানুষের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সম্মানহানির শিকার হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, যা ইসরাইলকে মাত্র এক রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং বিশ্বব্যাপী নিন্দিত এক শক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে। খামেনি বলেন, আজ বিশ্বের সবচেয়ে ঘৃণ্য ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর পাশাপাশি সবচেয়ে নিন্দিত রাষ্ট্রব্যবস্থা হলো সেই দখলদার সত্তা, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে তারা একই ঘৃণার অংশীদার হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের উসকানি ও আর্থিক-সামরিক সহায়তা ছাড়া এই ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ সম্ভব হতো না। এ প্রসঙ্গে খামেনি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতির দাবিকেও উল্লেখ করেন, যে তিনি তিন দিনে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, বাস্তবে তার উল্টো ২৮ দফা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি লেবানন, সিরিয়া, পশ্চিম তীর এবং গাজার অবস্থা উল্লেখ করে বলেন, এই অঞ্চলে ইসরাইলি হামলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন আন্তর্জাতিক অপরাধের প্রমাণ।
ভাষণে খামেনি ইরানের প্রতিরোধ সংস্কৃতির উপর জোর দেন। তিনি বলেন, ইরান শুধু নিজের জন্য নয়, বরং বিশ্বব্যাপী বিশেষ করে ফিলিস্তিন ও গাজার জনগণকে প্রেরণা দিয়েছে। পাশাপাশি তিনি ইরান সরকারের ওপর জনগণের সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান। খামেনি বলেন, দেশ পরিচালনা করা কঠিন দায়িত্ব, তবে সরকার ইতোমধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং শীঘ্রই এ পদক্ষেপের ফল জনগণ দেখতে পাবে।
একই সঙ্গে খামেনি দেশের স্বেচ্ছাসেবী বাহিনী বাসিজের ধারাবাহিক শক্তিবৃদ্ধির গুরুত্বের ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বাসিজকে ‘ঐশী অনুপ্রেরণায় সজ্জিত, আত্মবিশ্বাসী ও দেশপ্রেমিক একটি মূল্যবান জাতীয় আন্দোলন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। বিশেষ করে চতুর্থ প্রজন্মের বাসিজ, অর্থাৎ দেশের কিশোর-কিশোরীরা দেশ ও সমাজের কল্যাণে কাজ ও প্রচেষ্টার জন্য প্রস্তুত। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বাসিজ আন্দোলন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে অব্যাহত, বিকশিত এবং শক্তিশালী হতে হবে।
খামেনি আরও বলেন, দেশের গড়ে ওঠা প্রতিরোধের সংস্কৃতি শুধু প্রতিরক্ষা বা সামরিক ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রযুক্তি, চিকিৎসা, শিল্প, গবেষণা, শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনেও দেশের সম্মান বজায় রাখে। তিনি উল্লেখ করেন, এসব ক্ষেত্রে যারা অবদান রাখছেন, তারা বাসিজের মূল ভাবনার ধারক। এর মাধ্যমে দেশের প্রতিরোধশীল শক্তি ও সক্ষমতা শুধু সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে সর্বস্তরের উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত।
ভাষণের শেষ পর্যায়ে খামেনি ইরানি জনগণের প্রতি চারটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখা, প্রেসিডেন্ট ও সরকারের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখা, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে অপচয় পরিহার করা এবং দোয়া, তওবা ও আল্লাহর প্রতি আস্থা বৃদ্ধি—এই চারটি কাজ দেশের উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। খামেনি জানান, অপচয় কমানো গেলে দেশের অর্থনীতি আরও শক্তিশালী হবে এবং দেশের কল্যাণমূলক অগ্রগতি ত্বরান্বিত হবে।
এই বক্তৃতার মাধ্যমে খামেনি ইরান ও আন্তর্জাতিক মহলের কাছে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন যে, ১২ দিনের যুদ্ধে ইরান শুধুমাত্র টেকসই প্রতিরোধ দেখিয়েছে না, বরং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের অবস্থান ও শক্তি প্রদর্শন করেছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলকে ব্যর্থ বলে অভিহিত করেছেন এবং ইরানিদের মধ্যে দেশপ্রেম ও ঐক্যবদ্ধতার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেছেন। একই সঙ্গে বাসিজ বাহিনী এবং দেশের তরুণ প্রজন্মকে দেশের প্রতিরোধ শক্তি ও উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তুলে ধরেছেন।
এভাবে খামেনির ভাষণ আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে ইরানের অবস্থান ও সাম্প্রতিক যুদ্ধের ফলাফল ব্যাখ্যা করে। তার বক্তব্যে প্রতিফলিত হয় যে, ১২ দিনের এই যুদ্ধ কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক লড়াই নয়, বরং ইরানকে আন্তর্জাতিক মহলে দৃঢ় ও ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।