হংকংয়ের অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২৮

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শুক্রবার, ২৮ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৬ বার
হংকংয়ের অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১২৮

প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হংকংয়ের একটি আবাসিক কমপ্লেক্সে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে একশ আটাশে। শহরের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এ ঘটনা সবচেয়ে বড় দুর্যোগগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ ঘটনায় এখনো দুই শতাধিক মানুষ নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে কর্তৃপক্ষ। উত্তেজনা, আতঙ্ক ও শোকের আবহে সাধারণ মানুষ, উদ্ধারকর্মী, চিকিৎসাকর্মী এবং প্রশাসন মিলিতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন নিখোঁজদের সন্ধানে এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের ত্রাণ–সহায়তায়।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হংকংয়ের নিরাপত্তা মন্ত্রী ক্রিস টাং শুক্রবার এক সংবাদ সম্মেলনে সর্বশেষ পরিস্থিতি তুলে ধরেন। তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডে নিহতের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে এবং নিখোঁজদের তালিকা বিশাল হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। তাঁর ভাষায়, এটি এমন এক বিপর্যয় যার জন্য কেউই প্রস্তুত ছিল না, এবং যার ক্ষত মুছে যেতে দীর্ঘ সময় লাগবে। তিনি বলেন, দমকল বাহিনী, পুলিশ ও চিকিৎসা বিভাগ সম্মিলিতভাবে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে এবং প্রতিটি নিখোঁজ ব্যক্তিকে খুঁজে বের করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় সময় বুধবার দুপুর ২টা ৫১ মিনিটে হংকংয়ের তাইপো নগরীর ওয়াং ফুক কোর্ট নামের আবাসিক ভবন কমপ্লেক্সে আগুন লাগে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার পর মুহূর্তের মধ্যেই ভবনের একটি অংশ থেকে অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। অনেক বাসিন্দা ঘরে অবস্থান করছিলেন, কেউ কেউ নিচতলার দোকানপাট বা অফিস থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। আগুনের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিল যে কয়েক মিনিটের মধ্যেই গোটা কমপ্লেক্স কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায় এবং চারপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিশুসহ বহু মানুষ ভবনের বিভিন্ন কক্ষে আটকে পড়েন, অনেকেই জরুরি সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত বের হয়ে আসতে চেষ্টা করেন, আবার কেউ কেউ জানালা দিয়ে সাহায্যের জন্য চিৎকার করেন।

ঘটনার সময় হাজারও মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় নেমে আসেন। অনেকেই পরিবারের সদস্য, বন্ধু বা প্রতিবেশীদের খোঁজ করতে করতে কান্নায় ভেঙে পড়েন। একজন বাসিন্দা স্থানীয় একটি টেলিভিশনকে বলেন, আগুনের গন্ধ প্রথমে তাঁরা বুঝতে পারেননি। পরে ধোঁয়া ঘরে ঢুকতে শুরু করলে বের হওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু কোথা দিয়ে বের হবেন তা বুঝে ওঠা কঠিন হয়ে পড়ে। আরেকজন জানান, তিনি জানালা দিয়ে সিগন্যাল দিয়ে সাহায্য চাইছিলেন, পরে উদ্ধারকর্মীরা এসে তাঁকে নিরাপদে বের করে।

হংকং দমকল বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়, তবে আগুনের বিস্তার এতটাই বড় ছিল যে কমপক্ষে দশটি ভবনকে ঘিরে ফেলে আগুনের লেলিহান শিখা। দমকলকর্মীরা প্রথমে ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষকে বের করার চেষ্টা করেন, পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার দিকে মনোযোগ দেন। দীর্ঘ কয়েক ঘণ্টার চেষ্টার পর আগুন বেশিরভাগ অংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। তবে এর মধ্যেই কয়েকটি ভবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ নিখোঁজ হয়ে যান।

উদ্ধারকাজে দিন-রাত সমানভাবে কাজ করছে দমকল ও পুলিশ বাহিনী। ভবনের ধ্বংসাবশেষ, পোড়া ফ্লোর, গলে যাওয়া কাঠামো ও ক্ষতিগ্রস্ত অ্যাপার্টমেন্টগুলো অনুসন্ধান করে সম্ভাব্য জীবিত বা মৃত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। উদ্ধারকর্মীরা জানান, প্রতিটি কক্ষ ও প্রতিটি তলা এমনভাবে অনুসন্ধান করা হচ্ছে যাতে একজন মানুষও বাদ না পড়ে। কিন্তু ভবনের কিছু অংশ এতটাই ক্ষতিগ্রস্ত যে সেগুলোতে প্রবেশ করা দমকলকর্মীদের জন্যও ঝুঁকির।

এ ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের জন্য শহরজুড়ে নয়টি জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রে শত শত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। কেউ নিখোঁজ স্বজনের খোঁজে এসেছেন, কেউ আবার জীবন বাঁচাতে পালিয়ে এসে সব হারানোর শোকে হতবিহ্বল হয়ে আছেন। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খাদ্য, পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা এবং মানসিক সহায়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শহর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজনে আরও আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হবে।

অগ্নিকাণ্ডের কারণ নিয়ে তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ভবনের একটি বিদ্যুৎবহুল স্থানে শর্ট সার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হতে পারে। তবে কর্মকর্তারা বলেছেন, তদন্ত না হওয়া পর্যন্ত কোনোকিছু নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম ঠিকভাবে কাজ করছিল কি না, সেসবও তদন্তের আওতায় আনা হচ্ছে। কারণ অনেক বাসিন্দা অভিযোগ করেছেন, আগুন লাগার পর অ্যালার্ম যথাসময়ে বাজেনি এবং কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়নি।

হংকং শহরে উঁচু ভবনে অগ্নিকাণ্ড খুব অস্বাভাবিক নয়, তবে সাধারণত এগুলো দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয় এবং প্রাণহানি সীমিত থাকে। কিন্তু ওয়াং ফুক কোর্ট কমপ্লেক্সের এই অগ্নিকাণ্ড যে ভয়াবহতার জন্ম দিয়েছে, তা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নজিরবিহীন। শহরের সাধারণ মানুষ শোকাহত, অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিহতদের জন্য সহমর্মিতা প্রকাশ করছেন, আবার অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন ভবনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

ওয়াং ফুক কোর্টের বাসিন্দাদের অনেকেই মধ্যবিত্ত পরিবার। তাঁদের মধ্যে শিশু, প্রবীণ, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী নারী-পুরুষ—বৈচিত্র্যময় মানুষ বসবাস করতেন। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত এসব পরিবারের অনেকেই রাতারাতি সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। অনেকে বলেন, জীবন বাঁচাতে দৌড়ে বের হতে গিয়ে তাঁরা ঘর, পোশাক, নথিপত্র, মূল্যবান জিনিস—সবই পেছনে ফেলে এসেছেন। কারো কারো শোক আরও গভীর, কারণ তাঁরা এক বা একাধিক পরিবারের সদস্য হারিয়েছেন, যাদের এখনও শনাক্ত করা যায়নি।

হংকং সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য বিশেষ তহবিল থেকে জরুরি সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে আহতদের চিকিৎসা ব্যয় সরকার বহন করবে বলে জানা গেছে। কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, যেসব পরিবার ঘরহারা হয়েছে তাদের অস্থায়ী আবাস এবং প্রয়োজনীয় মৌলিক সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।

বিশ্বজুড়ে এ ঘটনার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা হংকংয়ের জনগণকে সমবেদনা জানিয়েছেন। মানবিক সহায়তার প্রস্তাবও এসেছে কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে। তবে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, উদ্ধারকাজ এখনো চলমান এবং তারা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে।

হংকংয়ের এই অগ্নিকাণ্ড আধুনিক নগরায়ণ, উঁচু ভবনের নিরাপত্তা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতিকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখনো বহু মানুষ নিখোঁজ, অসংখ্য পরিবার ভেঙে পড়েছে, এবং শহরজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। আগুনের কারণ, অব্যবস্থাপনা বা সম্ভাব্য গাফিলতি—সবকিছুই তদন্তে বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। কিন্তু এরই মধ্যে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, তা পূরণ হতে দীর্ঘ সময় লাগবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত