প্রকাশ: ২৮ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে রাজধানীজুড়ে শতকোটি টাকার সম্পদের অভিযোগ নতুন করে আলোচনায় এসেছে। শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক বা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নয়, দীর্ঘদিন ধরে নানা সময় উঠে আসা লুটপাট, দুর্নীতি ও সম্পদ গোপন করার কথাও আবার সামনে এসেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সেল—এই দুই সংস্থা গত বছরের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর অনুসন্ধান শুরু করে। সেই তদন্তের নথি, আয়কর রিটার্নের তথ্য এবং নির্বাচনি হলফনামা পর্যালোচনা করে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য, যা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনকে আবারও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা ভারতে চলে যাওয়ার পর থেকেই তার পরিবারের আর্থিক সম্পদ অনুসন্ধানের কাজ দ্রুত গতি পায়। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় শেখ হাসিনা, তার বোন শেখ রেহানা, মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং পরিবারের আরও কয়েক সদস্যের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের খোঁজ মিলেছে। এসব সম্পদের বেশির ভাগই পূর্বে কোনো নথিতে ও আয়কর বিবরণীতে উল্লেখ ছিল না। প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে সরকারে থাকার সময় এসব সম্পদ গড়ে উঠল এবং কীভাবে তা দীর্ঘদিন গোপন রইল।
আইন অনুযায়ী প্রতিটি করদাতাকে সম্পদের বিবরণী জমা দিতে হয়। সেখানে কোনো তথ্য গোপন হলে তা বেআইনি বা অবৈধ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। শেখ হাসিনা তার আয়কর রিটার্নে ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকার স্বর্ণালংকারের কথা উল্লেখ করেন। অপরদিকে শেখ রেহানা দেখান এক লাখ ৫০ হাজার টাকার স্বর্ণালংকার। এখানে শুরু থেকেই অসঙ্গতি ছিল লকারের তথ্য নিয়ে। আয়কর আইনে ব্যাংকে লকার থাকলে তা উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক হলেও রিটার্নে দুই বোনই তা উল্লেখ করেননি। তদন্তকারীরা জানান, লকারে থাকা সম্পদের পরিমাণ রিটার্নে দেখানো অল্প সংখ্যক স্বর্ণালঙ্কারের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজধানীর গুলশান নিকেতন, বারিধারা, গুলশান-১ এবং সেগুনবাগিচা—এই চারটি অঞ্চলে শেখ হাসিনার পরিবারের নামে থাকা সম্পদের তথ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়েছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। গুলশান নিকেতনের ২ নম্বর রোডের ৭২ নম্বর বাড়ির মালিক কাগজে-কলমে শেখ রেহানা হলেও আয়কর নথির তথ্য অনুযায়ী মালিক হিসেবে উল্লেখ রয়েছেন তার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি। এই বাড়ির ভাড়া প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা বলে জানান এলাকাবাসী। আগের সরকারের আমলে এ ভাড়ার টাকা তোলা হতো তাদের ঘনিষ্ঠ একটি ডেভেলপার কোম্পানির মাধ্যমে। সরকার পরিবর্তনের পরও একই পদ্ধতিতে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
বারিধারার কে ব্লকের ১০ নম্বর সড়কের ২০ নম্বর বাড়িটির মালিক নামমাত্রে সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু হলেও প্রকৃত মালিকানা শেখ পরিবারের বলেই জানায় দুদকের একটি সূত্র। আয়কর রিটার্নে এই বাড়িটি সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে উল্লেখ রয়েছে। এর দাম দেখানো হয়েছে সাড়ে ৫ কোটি টাকা। কিন্তু বাজারমূল্য এর প্রায় তিনগুণ বলে জানান স্থানীয় রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীরা। গুলশান-১ এর ৭ নম্বর বাড়িটিও সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের নামে উল্লেখ করা আছে। এছাড়া সেগুনবাগিচার একটি ফ্ল্যাটের মালিকানা রয়েছে শেখ রেহানার। এসব সম্পদের অধিকাংশের বিষয়ে আগে কোনো তথ্য প্রকাশ্যে জানা যায়নি। বরং অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব বাসার নিয়ন্ত্রণ ছিল সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন ব্যক্তির হাতে, যারা শেখ পরিবারের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
দুদকের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আব্দুল মোমেন গত সোমবার হবিগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমির এক গণশুনানিতে বলেন, শেখ হাসিনা বহু গুরুত্বপূর্ণ সম্পদের তথ্য নির্বাচনি হলফনামায় গোপন করেছিলেন। তিনি জানান, ২০০৮ সালে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সময় শেখ হাসিনা মাত্র ৫ দশমিক ২ একর কৃষিজমি দেখিয়েছিলেন, অথচ দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে তার ২৯ একরের মালিকানা। বিষয়টি নিয়ে সে সময় দুদক কাজ করলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে মনোনয়ন বাতিল করা সম্ভব হয়নি।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমা দেওয়া হলফনামার তথ্য বিশ্লেষণ করেও একাধিক বৈপরীত্য বেরিয়ে এসেছে। কৃষি খাত থেকে বার্ষিক ৯ লাখ ৪৬ হাজার টাকা আয়, শেয়ার-বাজার, সঞ্চয়পত্র ও ব্যাংক আমানতে মোট ২৫ লাখ টাকা, চাকরি থেকে ১৬ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, ব্যাংক সুদ ও এফডিআর থেকে ৩২ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং রয়্যালটি হিসেবে ২৩ লাখ টাকার আয় দেখানো হয়েছে। অস্থাবর সম্পদের মধ্যে নগদ ২৮ হাজার ৫৩০ টাকা, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২ কোটি ৩৮ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, সঞ্চয়পত্রে ২৫ লাখ, এফডিআর ৫৫ লাখ, তিনটি মোটরগাড়ি, স্বর্ণালংকার ১৩ লাখ ২৫ হাজার টাকা এবং আসবাবপত্র ৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে ১৫ বিঘা কৃষিজমি, পূর্বাচলের ২৭ নম্বর সেক্টরের ২০৩ নম্বর রোডের ৯ নম্বর প্লট এবং ঢাকায় তিনতলা ভবনসহ ৬ দশমিক ১০ শতাংশ জমি দেখানো হয়েছে। এসবের মোট মূল্য তুলনামূলকভাবে কম দেখানো হয়েছে বলেই মন্তব্য করেছেন विशेषज्ञরা।
তদন্তের পুরো প্রক্রিয়া এখনও চলমান। তবে ইতোমধ্যেই দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে শেখ পরিবারের নামে রাজধানীর বুকে জমে ওঠা এসব বিপুল সম্পদের উৎস কী এবং সেগুলোর কতটা বৈধ। জনমতের সামনে কখনোই এসব প্রশ্নের উত্তর পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা হয়নি। তদন্ত এগোলে হয়তো আরও অনেক তথ্য সামনে আসতে পারে, যা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো রাজনৈতিক ইতিহাসের সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।