প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।
বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে। চিকিৎসাধীন রয়েছেন টানা তিন দিন ধরে রাজধানীর একই হাসপাতালের সিসিইউতে। কিন্তু দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণেও তার শারীরিক অবস্থার বিশেষ কোনো উন্নতির খবর মেলেনি। চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ ও বয়সজনিত জটিলতা মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন।
শনিবার সকালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক বিবৃতিতে দেশের সর্বস্তরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতভেদ ভুলে দেশব্যাপী যেভাবে মানুষ তার মায়ের রোগমুক্তির জন্য দোয়া করছেন, তা তাদের পরিবারের জন্য অশেষ প্রেরণা। তার বক্তব্যে আবেগের ছায়া স্পষ্ট ছিল, বিশেষ করে যখন তিনি উল্লেখ করেন—এমন সংকটময় মুহূর্তে যেকোনো সন্তানের মতো তারও মায়ের পাশে থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতার কারণেই তা সম্ভব হচ্ছে না।
তারেক রহমান বলেন, বিদেশি ও দেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল টিম সর্বোচ্চ পেশাদারিত্ব ও আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছেন। কিছু বন্ধুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র খালেদা জিয়ার উন্নত চিকিৎসার বিষয়ে আগ্রহ এবং সম্ভাব্য সহযোগিতা দেওয়ার ইচ্ছাও জানিয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর।
বিএনপি মহলেও চলছে উদ্বেগ। শুক্রবার গভীর রাতে খালেদা জিয়ার খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস। সিসিইউতে প্রবেশ করে তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য দূরত্ব বজায় রেখে খালেদা জিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। পরে সাংবাদিকদের তিনি জানান, খালেদা জিয়া তাদের চিনতে পেরেছেন, সালামের জবাবও দিয়েছেন। যদিও এটি স্বস্তির একটি লক্ষণ হতে পারে, কিন্তু সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতিকে তিনি ‘স্থিতিশীল নয়’ বলেই বর্ণনা করেন।
চিকিৎসা সূত্র জানায়, প্রায় ৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া বহুদিন ধরেই বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন। ২৩ নভেম্বর ফুসফুসে সংক্রমণ ও হৃৎপিণ্ডের জটিলতা বেড়ে গেলে তাকে দ্রুত হাসপাতালে আনা হয়। এরপর থেকেই সিসিইউতে তার নিবিড় চিকিৎসা চলছে। প্রতিদিনই বিশেষজ্ঞরা তার অবস্থা পর্যালোচনা করছেন, তবে নতুন করে কোনো আশাব্যঞ্জক বার্তা পাওয়া যায়নি।
হাসপাতাল এলাকায় প্রতিদিনই দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ভিড় দেখা যায়। তবে এ ভিড়ের কারণে চিকিৎসা ব্যবস্থা ব্যাহত হতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে বিএনপির পক্ষ থেকে সবাইকে মানবিক কারণে ভিড় না করার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবুও দূর-দূরান্ত থেকে আগত অনেকে হাসপাতালের বাইরে দাঁড়িয়ে দোয়া করে অপেক্ষা করছেন।
এদিকে, খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের হালচাল জানতে হাসপাতালে যান এনসিপির তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল। তাসনিম জারা, নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী ও হাসনাত আব্দুল্লাহ হাসপাতালে উপস্থিত চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজখবর নেন। তারা খালেদা জিয়ার দ্রুত সুস্থতার কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা করেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে নানা আলোচনা। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে নেতাকর্মীরা অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনা করে পোস্ট দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন—তিনি দেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ সময়ের একটি বড় অধ্যায়ের প্রতীক। তাই তার শারীরিক অবনতি দেশের রাজনৈতিক আবহে বড়সড় প্রভাব ফেলছে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতির পরিবর্তন হতে সময় লাগতে পারে। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থায় সামান্য উন্নতি হলেও তা স্থিতিশীল নয়; বরং প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসা দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে, কিন্তু তার বয়স, পূর্বের গুরুতর রোগের ইতিহাস এবং সাম্প্রতিক জটিলতা চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলেছে।
পরিবার, সহকর্মী, সমর্থক—সবাই এখন অপেক্ষায় আছেন ইতিবাচক কোনো খবরের। দেশের বিভিন্ন মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় তার সুস্থতার জন্য দোয়া করাও অব্যাহত রয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের দ্বন্দ্ব ভুলে মানবিক আবেগে অনেকেই তাকে দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠার কামনা জানাচ্ছেন।
বর্তমানে পুরো দেশেই এক ধরনের প্রত্যাশা—খালেদা জিয়া সুস্থ হয়ে উঠুন। তারেক রহমানও আশা প্রকাশ করেছেন, রাজনৈতিক বাস্তবতা অনুকূলে এলেই তাদের পরিবার পুনরায় একত্র হতে পারবেন এবং এই দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটবে।