শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গ টানলেন জুনায়েদ আল হাবিব

একটি বাংলাদেশ ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০২৫
  • ৪৩ বার
শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গ টানলেন জুনায়েদ আল হাবিব

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫। একটি বাংলাদেশ ডেস্ক । একটি বাংলাদেশ অনলাইন।

হেফাজতে ইসলামের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সহসভাপতি ও খতিবে বাঙ্গাল হিসেবে পরিচিত মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব সম্প্রতি এক ধর্মীয় সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তীব্র সমালোচনা করেন সেই সময়কার রাজনৈতিক নেতৃত্বের। তাঁর বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় নতুন করে আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। শুক্রবার রাত ১১টার দিকে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ পুরান বাজারে ৭ দিনব্যাপী পবিত্র তাফসিরুল কোরআন মহাসম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে তিনি এসব মন্তব্য করেন।

সমাবেশে উপস্থিত হাজারো মানুষ এবং অনলাইনে প্রচারিত ভিডিও থেকে জানা যায়, জুনায়েদ আল হাবিব তাঁর বক্তব্যে অতীত রাজনৈতিক সহিংসতা, আলেম সমাজের ওপর নিপীড়ন এবং ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ককে কেন্দ্র করে তৎকালীন সরকারকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “শাপলা চত্বরে গুলি করে আলেম সমাজকে দমিয়ে রাখার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু আলেম-ওলামারা জেল, নির্যাতন ও প্রতিকূলতার মধ্যেও দমে যায়নি। যারা মনে করেছিল আলেম সমাজকে ভয় দেখিয়ে থামানো যাবে, তারা নিজেরাই বাংলাদেশে টিকতে পারেনি।”

বক্তৃতার এক পর্যায়ে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে কঠোর ভাষায় সমালোচনামূলক বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, “আপনি যে অপরাধ করেছেন, তার বিচার হবে। জেলখানায় নয়, শাপলা চত্বরে বিচার হবে—এ কথা আমি মানুষের অনুভূতির জায়গা থেকে বলছি।” তাঁর এই বক্তব্যটিই সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। অনেকে তা রাজনৈতিক প্রতিবাদের ভাষা বলে উল্লেখ করেছেন, আবার অনেকে মনে করছেন, এমন আক্রমণাত্মক মন্তব্য সামাজিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।

ধর্মীয় সমাবেশে তিনি আলেম সমাজের দীর্ঘদিনের অভিযোগগুলোও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “গত ১৫ বছর আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযান চালানো হয়েছে তা ইতিহাসে বিরল। দেশে মাদ্রাসাগুলোকে সন্ত্রাসী তৈরির কারখানা বলা হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষায় বাধা সৃষ্টি করা হয়েছে, বিভিন্ন সময় গোপনে–প্রকাশ্যে সিলেবাস পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে। এমনকি চামড়ার বাজারকে অস্থিতিশীল করে ধর্মীয় শিক্ষার অর্থনীতি দুর্বল করার অপচেষ্টা হয়েছে।”

জুনায়েদ আল হাবিবের বক্তব্যে অতীত সরকারগুলোর নীতিকে কেন্দ্র করে অসন্তোষের দীর্ঘদিনের ইতিহাসও উঠে আসে। তাঁর দাবি, “দেশবাসী ইসলামকে আগে রেখেছে, দলকে নয়। তাই কেউ ইসলামকে ধ্বংস করতে চাইলে তার পতন অবশ্যম্ভাবী।” তিনি আরও বলেন, “ধর্মীয় মূল্যবোধকে দুর্বল করে যুবসমাজকে ইসলামের জ্ঞান থেকে দূরে সরানোর নানা ষড়যন্ত্র হয়েছে, কিন্তু আলেম সমাজের দৃঢ়তায় সেই ষড়যন্ত্র সফল হয়নি।”

তাফসিরুল কোরআনের এ বৃহৎ আয়োজনটি স্থানীয়ভাবে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হলেও এবারের আয়োজনটি বিশেষভাবে আলোচনায় আসে আলেম সমাজের বর্তমান অবস্থান ও সামাজিক প্রভাব নিয়ে। সমাপনী দিনের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শায়খুল হাদিস আল্লামা মুনীরুদ্দিন। দিনব্যাপী আলোচনার শেষ অংশে কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিষয়ভিত্তিক বক্তব্য রাখেন দেশের বিভিন্ন স্থানের খ্যাতনামা বক্তারা। বক্তাদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা আব্দুর রহমান, মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী, মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজী, মাওলানা যাকারিয়া আহমদ ও মুফতি উবায়দুর রহমান সিরাজী।

পুরো সপ্তাহজুড়ে ধর্মীয় আলোচনার পাশাপাশি সমাজের নৈতিক পথচলা, তরুণ প্রজন্মের শিক্ষা, পরিবার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। আয়োজকরা জানান, প্রতিদিনই বিভিন্ন অঞ্চল থেকে মানুষ এসে আলোচনায় অংশ নেন, বিশেষ করে শেষ দুই দিনে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল কয়েক হাজারের বেশি। উপস্থিত জনতার সাড়া এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ায় আয়োজকরা কৃতজ্ঞতা জানান।

অনুষ্ঠানের শেষ মুহূর্তে তাফসির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ আব্দুল মজিদ বলেন, “মানুষের ভিড় এবং অংশগ্রহণ দেখে মনে হয়েছে, ধর্মীয় জ্ঞান অর্জনের প্রতি মানুষের আগ্রহ আগের চেয়ে আরও বেড়েছে। দেশের মানুষ এখনো কোরআন-হাদিসের ব্যাখ্যা শুনতে পছন্দ করে, ঈমানি আলোচনা শুনতে আসে। এটাই এই অনুষ্ঠানের সফলতা।”

তবে ধর্মীয় সমাবেশে দেওয়া রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে এলাকায় ও অনলাইনে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ মনে করছেন, রাজনৈতিক ঘটনায় ক্ষতবিক্ষত অতীতের একটি পটভূমি থেকে বক্তব্যটি এসেছে, যেখানে আলেম সমাজ নিজেদের নির্যাতিত মনে করে। আবার অন্য পক্ষের বক্তব্য, ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মঞ্চে অতিরিক্ত রাজনীতি পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলতে পারে, যা ধর্মীয় সমাবেশের মূল উদ্দেশ্যকে ছাপিয়ে যায়।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে অতীতের ঘটনাগুলো নিয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়ায় আলেম সমাজ আবার সক্রিয় ভূমিকা নিতে শুরু করেছে। কেউ কেউ বলছেন, এই বক্তব্য আসলে দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ; আবার কেউ মনে করছেন, এটি ভবিষ্যতে রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ানোর ইঙ্গিত।

এদিকে বক্তৃতার কিছু অংশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে ব্যাপক শেয়ার এবং তর্ক-বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। অনেকে সমর্থন জানালেও, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ মন্তব্য করছেন যে, কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে এমন তীব্র ভাষা জাতীয় ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিশেষজ্ঞেরা বলছেন, সমাজে ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দুইধরনের উত্তেজনা যদি একসাথে প্রকাশ পায়, তাহলে তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলতে পারে।

জুনায়েদ আল হাবিবের বক্তব্যের পর স্থানীয় প্রশাসনের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও কঠোর করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও পুরো অনুষ্ঠান শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়, তবু আয়োজক ও প্রশাসন উভয়েই সতর্ক ছিলেন যেন উত্তেজনার কোনো সৃষ্টি না হয়। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর মানুষ স্বাভাবিকভাবে বাড়ি ফিরে যায় এবং এলাকায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি।

সামগ্রিকভাবে, শায়েস্তাগঞ্জের এই ধর্মীয় অনুষ্ঠানে আলেম সমাজের বক্তব্য এবং জনসম্পৃক্ততা একটি বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে ধর্মীয় ব্যাখ্যা ও আধ্যাত্মিকতা, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্মৃতি এবং সমালোচনা—দুটি ক্ষেত্রই একসাথে উঠে এসেছে। বিশেষত অতীত রাজনৈতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে তীব্র ভাষার ব্যবহার দেশে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে, যা আগামী দিনে জনমত এবং রাজনৈতিক আলোচনাকে আরও উসকে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের মন্তব্য।

সংবাদটি শেয়ার করুন

এ সম্পর্কিত আরো খবর

স্বত্ব © ২০২৫ একটি বাংলাদেশ | মোহাম্মাদ আব্দুল্লাহ সিদ্দিক ইবনে আম্বিয়া কর্তৃক সরাসরি যুক্তরাজ্য থেকে প্রকাশিত